রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশের কয়েকজন কবির রূপময় কাব্যজগতের পর আমরা বর্ণবহুল কবিতার বিস্তার দেখি শামসুর রাহমানের কবিতার জগতে। বিস্ময়কর সফলতা ছিল তাঁর।
শামসুর রাহমানের কাছে জীবন ও কবিতার মাঝখানে কোনো শূন্য স্থান ছিল না। তিনি সবকিছুকে জীবন ও কবিতায় একাকার করে দেখতে চেয়েছেন। নির্যাতিত মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি যেমন খাটি তেমনি বাস্তবতার চিৎকৃত ধ্বনি যে কবিতা নয় তা কবিজীবনের সূচনালগ্নেই তার কাছে সুস্পষ্ট ছিল। তরুণী, রূপসী জীবনের সংলগ্ন উপকরণ হিসেবে যেমন ঠিক ঠিক স্থান দখল করে নিয়েছে তেমনি মানবমুক্তির সংগ্রামী সাহসী যুবা এবং নেতৃত্বের ঋত্বিক মহৎ চরিত্র হয়ে উঠে এসেছিলেন তিনি তাঁর কবিতায় কবিতাকে বিন্দুমাত্র খর্ব না করেই।
শামসুর রাহমানের কবিতার সংখ্যার দিকে তাকালে বলতে হয়, কবিতার জন্যেই তাঁর জন্মগ্রহণ। সময় ও সংখ্যার অনুপাত কষলে আমরা দেখবাে, বাংলা ভাষার প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের পাশাপাশি তাঁর স্থান থাকবে সবসময়।
যে-সব কবিতা তাকে এই আসন দিয়েছিল সে-সবের সোনার মতো রঙ এবং হীরের মতো তাদের দীপ্তি। আসলে শামসুর রাহমান ছিলেন একই সঙ্গে কবি ও চিত্রকর। নতুন স্বপ্নের রাজ্য নির্মাণ করেছেন তিনি। শব্দ ও ছন্দের এমন মিলনকেই বুঝি বলা যায় হরিহর আত্মা। তিনি কবিতার পাঠকের মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করতে চেয়েছিলেন যে কবিতাকে হতে হয় মহৎ, যা শুধু শব্দ ও ছন্দ দিয়ে হয় না। বিষয় দিয়ে উৎকর্ষে পৌঁছতে হয়। তিনি এও জানতেন যে কবিকে হতে হয় সত্যান্বেষী। এই বোধে প্রাজ্ঞ হওয়ার দরুন তাঁর কোনাে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অনড় আনুগত্য ছিল না। খোলা চােখ ও খোলা মন নিয়ে সব বিশ্লেষণ করে বিশ্বমানবতার শক্তিকে বলীয়ান করার কাজকে প্রাধান্য দিতেন তিনি। তবে সবার উপরে নিরন্তর কবিতা লিখে যাওয়াই তার কাছে সত্য ছিল।
শামসুর রাহমানের কবিচারিত্র্যে এর সার্থক রূপায়ণ আমাদের আশ্বস্ত করে। তার পাঠক হিসেবে আমাদের মনে হয় যে কবিকে একই সঙ্গে আদিম ও আধুনিক হতে হয়। কবিতার যে-প্রতিমা তাতে প্ৰাণের প্রতিষ্ঠা এ দাবি করে। শামসুর রাহমান তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছেন। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র কবির কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে 'কৃত্তিবাস”-এর প্রথম সংখ্যায় (শ্রাবণ, ১৩৬০) তাঁর প্রবন্ধে বলেছিলেন, "কাব্যের মহৎ সাধনা…. ব্যক্তি-চিত্রকল্প থেকে লোক-চিত্রকল্পের সাধারণ্যে উত্তরণ। এতে অবশ্য তৃপ্তি আত্ম-প্ৰসাদের নয়, আত্ম-ব্যাপ্তির, আত্ম-ত্যাগের”। অর্থাৎ তিনি চেয়েছেন, "ব্যক্তি-চিত্রকল্প থেকে লোকচিত্রকল্পে”র দিকে ফিরে আসুক বাংলা কবিতা অর্থাৎ কবির আত্মকেন্দ্রিকতার বদলে ঘটুক আত্মবিস্তার। আমরা এই পালাবদলও প্রত্যক্ষ করেছি শামসুর রাহমানের কবিতায়।
নতুনের পরীক্ষা নিরীক্ষায় সফলতা-ব্যর্থতা দুই-ই থাকে। শামসুর রাহমানের বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে নির্দ্বিধায় বলা চলে যে সফলতার শিরোপা বেশি লাভ করেছিলেন তিনি। কবিতাকে সর্বপ্রভায় আলোকিত করার জন্যে একজন কবিব্রতীর যে নতুন পথের যাত্রিক হতে হয় সেই যাত্রাপথেরও পথিকৃতের সফল কাণ্ডারি ছিলেন শামসুর রাহমান।
১৯৭০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত “স্বনির্বাচিত" কাব্যসংগ্রহের ‘সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে কবির ভূমিকা' এই প্রশ্নের উত্তরে শামসুর রাহমানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য;
“যেহেতু সাহিত্য সংস্কৃতির প্রধানতম অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত, তাই সাংস্কৃতিক অগ্রগতির সঙ্গে কবির ভূমিকা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বর্তমানে বিজ্ঞান ও টেকনােলজির প্রভাবে সংস্কৃতির অঙ্গনে নানা পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনকে ধারণ করবে যে-কবির রচনা তাকে হতেই হবে জােগর চৈতন্যের অধিকারী। বুঝি তাই লুই ম্যাকনীস বলেন, আধুনিক কবি হবেন, ‘I would have a poet able bodied, fond of talking, a reader of the newspapers, capable of pity and laughter, informed in economics, appreciative of women, involved in personal relationships, actively interested in politics, susceptible to physical impressions’। ম্যাকনীস-বর্ণিত কবির পক্ষেই সম্ভব নিজস্ব অবদানে নব্য সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা, সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পক্ষে সহায়ক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।”
২৩শে অক্টোবর ছিল এই মহান কবির জন্মবার্ষিকী। বাঙলার এই মহান কবির প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ্য ভালোবাসা।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর সাহিত্য-জীবন শুরু হয় স্কুলের ছাত্র থাকার সময়েই। রুদ্র শুধু কবি তথা সাহিত্যিক ছিলেন না। সাহিত্য-জীবনের পাশাপাশি প্রবাহিত হয়েছে তাঁর সংস্কৃতি-জীবন। রুদ্র যখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েন, তখন তাঁর বয়স আট বছর। সে-সময় ইসমাঈল মেমোরিয়াল হাইস্কুলের বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কবিতা আবৃত্তি করে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু তাঁর বাবা ছিলেন ঐ স্কুলের ব্যবস্থাপনা পরিষদের সভাপতি। তাই বাবা নিজের পুত্রকে প্রথম পুরস্কারটি না-দিয়ে অন্যকে দিলেন। এই বঞ্চনা শিশু-রুদ্রের মনে দারুণভাবে প্রভাব ফেলে। অবশ্য বাবা তাঁকে পুরস্কার বাবদ অনেক বই কিনে দেন। কিন্তু শিশু রুদ্র তা প্রত্যাখ্যান করেন।
বছর দুয়েক পরে রুদ্র ভর্তি হন মোংলার সেন্ট পলস হাইস্কুলে। সেখানে প্রতিটি আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় রুদ্র প্রথম স্থান অধিকার করেন। রুদ্রের বয়স যখন এগারোয় পড়েছে, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে পাঠ্যবইয়ের সমস্ত কবিতাই রুদ্রর মুখস্ত হয়ে যায়। সে-সময় বুদ্ধদেব বসুর কবিতার অনুকরণে একটি কবিতা রচনা করেন। সেই ১৯৬৬ সালে রুদ্রের কবিতা রচনার হাতেখড়ি। কবিতাটি অবশ্য আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। এরপর রুদ্র নিয়মিত কবিতা লিখতেন। কবিতার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলা এবং নাটক করার দিকেও রুদ্ৰ ঝুঁকেছিলেন সেই কিশোর বয়সেই। কিন্তু খেলাধুলার প্রতি বাবার নিষেধাজ্ঞার কারণে রুদ্র আর খেলার দিকে মন দেন নি।
১৯৬৮ সালে রুদ্র তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েন, তখন মামাতো ভাইদের সঙ্গে নিয়ে নানির ট্রাংক থেকে কিছু টাকা চুরি করেন। সকলে বলেছিল সেই টাকা দিয়ে সিনেমা দেখতে যাবে। কিন্তু রুদ্রের সিদ্ধান্তে সেই টাকায় বেশকিছু বই কিনে একটি লাইবেরি গঠন করা হয়। এর নাম দেয়া হয় 'বনফুল লাইব্রেরি’। ১৯৭০ সালে রুদ্র যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন, তখন মামাতো ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে অর্থাৎ বনফুল লাইব্রেরির সদস্যদের নিয়ে একটি নাটক মঞ্চায়ন করেন। নাটকের নাম ‘কালো টাইয়ের ফাঁস’। এ-নাটকে রুদ্র ছাড়াও অভিনয় করেন মোঃ সাইফুল্লাহ, সাব্বির হাসান রুমি, মাহমুদ হাসান ছোটমনি, আছিয়া খাতুন ও আবু জগলুল মঞ্জু। ইতোমধ্যে রুদ্র নিজের লেখা কবিতায় একটি পুরো খাতা ভরে ফেলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়ির অনেক কিছুর সঙ্গে সেই খাতাটি পুড়ে যায়।
রুদ্রের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ সালে দৈনিক ‘আজাদ' পত্রিকায়। রুদ্র তখন ওয়েস্ট এন্ড হাইস্কুলে দশম শ্রেণির ছাত্র। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবিতাটিতে কবির নাম ছাপা হয় নি। কবিতার নাম ছিল ‘আমি ঈশ্বর আমি শয়তান’। প্রথম লেখায় স্বাভাবিকভাবেই অপরিপক্কতার ছাপ রয়েছে। কিন্তু তাঁর জীবনদর্শনের ছায়াপাত ঘটেছে প্রথম কবিতায়ই। রুদ্র এটিকে তার কোনো বইয়ে স্থান না দিলেও প্রথম প্রকাশিত রচনা হিসেবে এর মূল্য রয়েছে।
আমি ঈশ্বর আমি শয়তান
আমায় যদি তুমি বলো ঈশ্বর,
আমি বলব, হ্যাঁ আমি তাই।
আমায় যদি বলো পাপী শয়তান,
আমি বলব, হ্যাঁ আমি তাই-ই।
— কারণ আমার মাঝে যাদের অস্তিত্ব
তার একজন ঈশ্বর; অপরজন শয়তান।
তাই যখন শয়তানের ছবিটি ভাসে
আমার মানব অবয়বে - তখন আমি পাপী
আর যখন সত্যের পূর্ণতায় আমি -
মানবের কল্যানে আমার কর্ম
ঠিক তখনই আমি ঈশ্বর; কারন
সত্য, পুন্য আর মানবতাই ঈশ্বর।

সংগ্রহিত।

আত্মপ্রত্যয় সেইসঙ্গে স্বাজাত্যবোধ জাতীয়তাবাদের ভিত রচনা করে থাকে। এইজন্যে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জাতীয়তাবাদ প্রধান শক্তি হিশেবে প্রেরণা জুগিয়ে চলে। ধূর্জটিপ্ৰসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতে- "Sense of community বা সমাজবোধ নষ্ট হবার পরই শূন্যতা ভরাট করবার জন্যে জাতীয়তার (nationalism) প্রয়োজন হয়। ব্যক্তি যেমন এক, নেশন বা জাতিও তেমনই একটি; ব্যক্তি যেমন লাভের জন্য দুঃসাহসী, জাতিও তেমনই শক্তিপ্ৰসারে অভিলাষী ।" এই যে শক্তিপ্রসারে অভিলাষী কথা এর থেকেই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে জাতীয়তাবাদ কখনো কখনো স্বৈরাচারী হওয়ার পথ সুগম করে দিতে পারে। যেমন ঘটেছিল হিটলারের আমলের জার্মানীর বেলায়। তাই জাতীয়তাবাদীদের জন্যে রবীন্দ্রনাথ সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন এই বলে যে, “এইরূপ উপলব্ধি করিব যে স্বজাতির মধ্য দিয়া সর্বজাতিকে ও সর্বজাতির মধ্য দিয়া স্বজাতিকে সত্যরূপে পাওয়া যায়।” এমনকি তাঁর "Nationalism' প্ৰবন্ধটি বিস্মৃত হওয়া চলবে না জাতীয়তাবাদীদের। কেননা সেখানে আছে : "Nations, who sedulously cultivate moral blindness as the cult of patriotism, will end their existence in a sudden and violent death." আর একটি কথা তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, "যে জাতির মধ্যে বর্ণসংকরতা খুব বেশি ঘটেছে তার মনটা এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যায় না। প্রকৃতিবৈচিত্র্যের সংঘাতে তার মনটা চলনশীল হয়ে থাকে। এই চলনশীলতায় মানুষকে অগ্রসর করে, এ কথা বলাই বাহুল্য।"
কখনো কখনো জাতীয়তাবাদ গোষ্ঠীর সঙ্গে গোষ্ঠীর সংঘর্ষ বাঁধায়, যার ফলে মানবকল্যাণের পরিবর্তে স্বীয় স্বার্থসাধনই বড় হয়ে পড়ে। নিপীড়িত যারা তারা জাতীয়তাবাদকে মুক্তির সরল পথ হিশেবে ধরে নিয়ে একতাবদ্ধ হয়। বিবেকবান নেতৃত্বও এই সঙ্গে দরকার। সুতরাং সার্বিক মুক্তির পথ জাতীয়তাবাদ এক মাত্র পথ নয়।
সব কারণ খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে জাতীয়তাবাদ জটিল একটি বিষয়। জাতিপ্রেম একটি জাতিকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে তাকে পথ দেখাতে পারে, পারে তাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করতে। আবার মোহমুগ্ধ করে এক ধরনের সংকীর্ণতাও এনে দিতে পারে। ক্ষমতার অন্ধতা শুভবােধ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব হলো তার সৃজনশীলতা। এই সৃজনশীলতা বন্ধনমুক্তির ফলেই সম্ভব হয়। তাই ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে হয়। সৃজনশীলতাকে আমরা পেতে পারি সংস্কৃতিতে। সংস্কৃতিই সর্বমানবের মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টি করে। বিশ্বমানুষের রূপ আবিষ্কার করতে করতে এগিয়ে যেতে হবে মানুষকে। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তাই মেলাতে হবে বিশ্বমানুষের স্বরূপকে। এই অম্বিষ্টকে সামনে রেখে জাতীয়তাবাদীদের এগিয়ে যেতে হবে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর চিন্তাবিদ হিশেবে খ্যাতি আছে আমাদের দেশে। যথেষ্ট শ্রম স্বীকার করে জাতীয়তাবাদের মতন জটিল বিষয়কে নিয়ে তিনি কয়েকটি গ্ৰন্থ রচনা করেছেন। আমার কথা গুলো তাঁর সাম্প্রতিক একটি বই “জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগনের মুক্তি” প্রকাশ করেছে সংহতি। প্রায় দশ বছর ধরে তিনি লিখেছেন এই বইটি। বইটির ফ্ল্যাপে বইটি সম্পর্কে লেখা আছে;
“উনিশ শ’ পাঁচ সালের প্রথম বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালের জনগণের মুক্তি গ্রন্থটি প্রচলিত অর্থে ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং ঘটনার তাৎপর্য অনুসন্ধানের বিশিষ্টতায় অনন্য। বাঙালীর জাতীয়তাবাদের বিকাশটি ঘটেছিল এই সময়টুকুর মধ্যে, বিশেষ করে প্রথমবারের বঙ্গভঙ্গের প্রতিরোধ যে তীব্র দেশাত্মবোধের আর আত্মোপলব্ধির সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, তারই হাত ধরে। অন্যদিকে ওই বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়েই বাংলায় আধুনিক সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের ইতিহাসটিরও শুরু। এই হাত ধরাধরি করে চলা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতির আড়ালে, কিভাবে তাদের শ্রমিক বা কৃষক পরিচয়কে ভুলিয়ে ভারতীয় বা পাকিস্তানী, হিন্দু বা মুসলিম পরিচয়কেই সামনে টেনে এনে প্রধান পরিচয় বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, সেটাও বর্তমান গ্রন্থের অন্যতম উপজীব্য।
জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা উভয়ের উত্থানের ওই সময়টুকুতে সমাজের সক্রিয় অংশগুলোর মনস্তত্ব ও আকাঙ্ক্ষাকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন একদিকে তাদের ক্রিয়াকাণ্ড, অন্যদিকে সমকালীন সাহিত্যের সাক্ষ্যসহ নানান উপাদান ব্যবহার করে। এক একটা যুগ এবং তাতে ভূমিকা রাখা সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মনোভাবকে উপলব্ধির জন্য সাহিত্যিক নিদর্শনগুলোর এত গভীর ও বিপুল ব্যবহার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আগে খুব কমই হয়েছে বাংলা ভাষায়।
১৯০৫-৪৭ কালপর্বের ঘটনাবলীর বীজ অনুসন্ধানের প্রয়োজনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন অনায়াসে বিচরণ করেছেন এর আগেকার উনিশ শতকের কখনো কখনো চিহ্নিত করেছেন আমাদের চারপাশের বাস্তবতায়।”
‘বঙ্গভঙ্গ এবং তারপর’ বইটির প্রথম পরিচ্ছেদ। সেখানে লেখক জানাচ্ছেন;
“রাষ্ট্রীয় তৎপরতায় দেশ ভাগ হয়েছে দু’বার, রদ ঘটেছে একবার, উত্থান ঘটেছে নতুন রাষ্ট্রের, তার পতনও হয়েছে, কিন্তু যাদেরকে নিয়ে রাষ্ট্র সেই মানুষেরা কি সুখ, শান্তি ও স্বস্তি পেয়েছে? সন্ধান পেয়েছে কি মুক্তির? পায়নি যে সেটা তো খুবই স্পষ্ট। পেছনের দিকে তাকালে না-পাবার ইতিহাস এবং বঞ্চনার কারণ উভয় সম্পর্কেই ধারণা করা সম্ভব। আর এই পিছনে ফিরে তােকানোটা খুবই প্রয়োজন, সামনের দিকে এগোবার জন্য। আমাদের অতীতের মধ্যে বর্তমানের ব্যাখ্যা আছে, সেখানে নিহিত রয়েছে নিয়ামক শক্তির পরিচয়ও; সে-সম্বন্ধে না জানলে ভবিষ্যতের পদক্ষেপ দুর্বল ও অনিশ্চিত হতে বাধ্য।”
…বাংলাকে ভাগ করার ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহ ছিল প্ৰকাশ্যতই বাঙালীবিরোধী লর্ড কার্জনের। তিনি বসে থাকেন নি, বঙ্গবিভাগের পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পূর্ববঙ্গ সফর করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাবার পথে ট্রেনে বসে কার্জন তৎকালীন ভারত সচিবকে একটি চিঠি লেখেন, যাতে বঙ্গভঙ্গের পেছনে আসল ইচ্ছাটা তিনি বেশ পরিষ্কারভাবেই বলেছেন; বলারই কথা, কেননা এ চিঠি শত্রুপক্ষের হাতে পড়তে পারে এমন কোনো আশঙ্কাই তার মনে ছিল না । সময় ১৭ই ফেব্রুয়ারী, ১৯০৪। কার্জন যা লিখছেন বাংলা অনুবাদ করলে তা এই রকমের দাড়ায়;
“বাঙালীরা, নিজেদেরকে যারা একটি জাতি বলে ভাবতে পছন্দ করে, এবং যারা এমন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যখন ইংরেজদেরকে বিদায় করে দিয়ে কলকাতার গভর্নমেন্ট হাউজে একজন বাঙালী বাবুকে অধিষ্ঠিত করবে, তারা অবশ্যই তাদের ওই স্বপ্ন বাস্তবায়নে হস্তক্ষেপ ঘটাতে পারে এমন যে কোনো প্রতিবন্ধকের ব্যাপারে তীব্ৰ অসন্তোষ প্ৰকাশ করবে। আমরা যদি তাদের হৈচৈ-এর কাছে নতি স্বীকার করার মতো দুর্বলতা প্ৰকাশ করি, তাহলে আগামীতে বাংলাকে কখনোই খণ্ডিত বা দুর্বল করতে পারবো না, এবং ভারতের পূর্ব পার্শ্বে আপনি এমন একটি শক্তিকে সংযুক্ত ও দৃঢ় করবেন যেটি ইতিমধ্যেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে তা ক্রমবর্ধমান গোলযোগের নিশ্চিত উৎস হয়ে দাড়াবে।”
জাতীয়তাবাদে ধর্মের প্রবেশ সম্পর্কে তিনি লিখছেন;
“...নেতৃত্ব যাদের হাতে ছিল তাদের অধিকাংশই ধর্মের প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তাকে মানতেন। কারণ ছিল একাধিক। প্রথমত, ধর্ম ছিল তাদের সংস্কৃতি, অভ্যাস ও অনুভূতির অংশ। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের পক্ষে সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবে তাে বটেই, ব্যক্তিগতভাবেও ধর্মের বাইরে যাওয়া কঠিন, যে জন্য ইহজাগতিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এখানে খুবই দ্বিধাগ্রস্ত। যেমন ধরা যাক, বাংলাদেশের কথা। এর প্রতিষ্ঠা ঘটেছে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে; কিন্তু সেখানে তাকে স্থির রাখা যায় নি। ধর্ম যে কেবল হৃদয়ের ব্যাপার তা নয়, বিশ্বাসের বস্তুও, এমন কি বললে অন্যায় হবে না, অনেক ক্ষেত্রেই তা স্নায়বিক ব্যবস্থারও অন্তৰ্গত হয়ে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ধর্ম হচ্ছে মানুষের জন্য আশ্রয়। যারা পরাজিত হয়েছে তাদের জন্য তো বিশেষভাবেই। রাজনৈতিক আন্দোলনে ধর্মকে ব্যবহার করলে আন্দোলনকারীরা ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা, ভরসা, সাহস ইত্যাদি পান। মনে করবার সুযোগ ঘটে যে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের পেছনে অদৃশ্য শক্তির সমর্থন আছে, যে জন্য সরকার যতই পীড়ন করুক না কেন পীড়নকারীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তৃতীয় একটি কারণও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে এই যে, ধর্মের ভাষায় কথা বললে সেটা মানুষের কাছে সহজে গিয়ে পৌছায়, দ্রুত আবেদন সৃষ্টি করে, মানুষ অনুপ্রাণিত হয়, তারা সাড়া দেয়, কাছে আসে, ঐক্য গড়ে তোলে। লৌকিক ভাষার তুলনায় ধর্মীয় ভাষা সব সময়েই সরল ও সহজবোধ্য; সে-ভাষা শিক্ষিত মানুষ যেমন বোঝে, অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষেরও তেমনি বোধগম্য হয়। ধমীয় উপমা, রূপক, কাহিনী, বক্তব্যকে একাধারে সহজ, পরিচিত ও আবেগ-সমৃদ্ধ করে তোলে।
স্বদেশী আন্দোলনের নেতারা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত মানুষ, তাঁদের মধ্যে কেউ এমন কি বাংলায় লিখতে ও বলতে অভ্যস্ত পর্যন্ত ছিলেন না, অন্যরাও যে ধরনের বাংলা ভাষা ব্যবহার করতেন সাধারণ মানুষের জন্য তা যে অত্যন্ত সহজবোধ্য হবে এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারতেন না। অন্যদিকে ধর্মের ভাষায় কথা বলার সময় তাঁরা নিজেরা যেমন অনুপ্রানিত বোধ করতেন, ধর্মের শ্রোতাদেরকেও তেমনি উদ্ধৃদ্ধ করতে পারতেন। ব্যাপার আরো একটি ছিল। সেটা এই যে, ধর্ম তাদেরকে আত্মপরিচয় লাভে সাহায্য করতো। শাসক ইংরেজ কেবল বিদেশী নয়, সে বিধর্মীও, এই বোধটা জাতীয়তাবাদের জন্য যে উদ্দীপক শক্তি ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইংরেজী ভাষার ব্যবহার করা না-করা দিয়ে দুই পক্ষের ব্যবধানকে স্পষ্ট করায় অসুবিধা ছিল; কারণ ইংরেজী ভাষা কেবল শাসক শ্রেণী নয়, আন্দােলনকারীরাও ব্যবহার করতেন। কিন্তু ধর্মের দিক দিয়ে দুই পক্ষ ছিল একেবারেই দুই জগতের, এক পক্ষ খ্রিস্টান, বিপরীত পক্ষ হিন্দু, দুইয়ের ভেতর মিলনের কোনো ক্ষেত্র নেই।
এসব কারণে দেশপ্রেমিক আন্দোলনের পরিচ্ছন্ন স্রোতের ভেতর সাম্প্ৰদায়িকতার বিপজ্জনক আবিলতা চলে এলো। ধর্ম পরিচয়ের চিহ্ন হিসাবে থাকা এক কথা, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। ধাৰ্মিক মানুষ মৌলবাদী হতে পারেন, মৌলবাদের ভেতর সাম্প্রদায়িকতা উপাদান থাকে নিশ্চয়ই, কিন্তু ধমীয় মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতা তো এক বস্তু তা নয়, দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা জিনিসটা মৌলবাদের তুলনাতে অধিক পরিমাণে রাজনৈতিক। এর সঙ্গে ক্ষমতা ও সম্পত্তির প্রশ্ন অঙ্গাঙ্গী জড়িত।”
তিনি আরও লিখছেন; “দুই ধর্মের দুই মৌলবাদী পাশাপাশি বসবাস করতে পারেন, তাদের মধ্যে সম্প্রীতি থাকাও অসম্ভব নয়, ভূদেবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-৯৪) তাঁর লেখাতে এ ধরনের সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। কিন্তু দু’জন যদি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন, বিশেষ করে একপক্ষ যদি অপর পক্ষের সম্পত্তি (সেটা স্থাবর অস্থাবর যে ধরনেরই হােক) এবং বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা দখল করতে উদ্যত হয়, এবং সেই উদ্যোগকে শক্তিশালী করবার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে তখন সাম্পপ্রদায়িকতা দেখা দেয়।
এদেশে ধর্মবিশ্বাস প্রাচীন ব্যাপার; হিন্দু মুসলমান এখানে যুগ যুগ ধরে প্রতিবেশী হিসাবে বসবাস করেছে। তারা একই আকাশের রোদ-বৃষ্টি-জ্যোৎস্না ভোগ-উপভোগ করেছে, চাষ করেছে মিলেমিশে, একই বাজারহাটে কেনাবেচা, করতে তাদের অসুবিধা হয় নি। শোকে দুঃখে পরস্পরকে সাহায্য করেছে, পরস্পরের উৎসবে, এমন কি ধমীয় অনুষ্ঠানেও অনায়াসে যোগ দিয়েছে, মন্দিরের ঘণ্টা মিশে গেছে আজানের ধ্বনির সাথে, কোনো গোলযোগ বাধে নি। কিন্তু বিপদ ঘটলো তখনই যখন ধর্ম চলে এলো রাজনীতিতে, অর্থাৎ যুক্ত হয়ে গেলো ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদির সঙ্গে। যে-লড়াইটা হবার কথা ছিল বাঙালী হিন্দু-মুসলমানের সঙ্গে ঔপনিবেশিক ইংরেজের, সে লড়াইয়ের ভেতরে প্রবেশ করলো ভ্রাতৃঘাতী হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষ।
১৮১৭ সালে যখন হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সে-কলেজে মুসলমানের যে প্রবেশাধিকার থাকবে না। এটা ধরেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা নিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। কেননা ওই সম্পপ্রদায়ের ছেলেরা তখনো পড়তে আসবার মতো সামৰ্থ্য অর্জন করে নি। কিন্তু পরে ১৮৫৪ সালে হিন্দু কলেজ যখন সরকারী কলেজ হয়েছে, নাম নিয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের তখন সেই কলেজে যদি মুসলমান ছাত্রদের জন্য নিষিদ্ধ থাকতাে তাহলে সমস্যার সৃষ্টি হতো, কেননা ততদিনে মুসলমান ছাত্ররা কলকাতায় আনাগোনা শুরু করে দিয়েছে।
বাংলায় মুসলমানরা যে সংখ্যায় অধিক এ সত্যও প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু কেবল সংখ্যায় অধিক হবার ব্যাপার নয়, তারা যে শিক্ষিত এবং আত্মসচেতন হয়ে উঠতে থাকলো তাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত মধ্যবিত্ত এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের উঠতি মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হবে এমনটা বােঝা গেলো। আশঙ্কা করা গেলো যে, হিন্দু ও মুসলমান এই নাম বিশেষ্য থাকবে না, পরিণত হবে বিশেষণে; দুই সম্প্রদায়ই নিজ নিজ ক্ষমতা প্রকাশে আগ্রহী ও তৎপর হয়ে উঠবে। ১৯০৫এর পরে সেই দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। তাতে শাসক ইংরেজ তার নিজের স্বার্থেই উস্কানি দিয়েছে, সোৎসাহে।
স্বদেশী আন্দোলনের সাফল্য যদি বলি বঙ্গভঙ্গ রদ করায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে এটাও মানতে হবে যে, ওই আন্দোলনের ব্যর্থতা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার অগ্রযাত্রার পথকে প্রশস্ত করে দেওয়ায়। আমরা ১৯০৫ সালের কথা ভাবছি। স্মরণ করা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ওই বছরই রাশিয়াতে লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবী অভু্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে, যে-চেষ্টাকে বলা হয় ১৯১৭ সালের বিপ্লবের চূড়ান্ত মহড়া। সেই বিপ্লবী প্রচেষ্টার ঢেউ পরের কথা, তেমন একটা খবরও স্বদেশী আন্দোলনের লোকদের কাছে পরিষ্কারভাবে এসেছিল কিনা সন্দেহ। ভারতে তখন বরঞ্চ এই তথ্য নিয়ে এক ধরনের সন্তুষ্টি ছিল যে ওই বছরই যুদ্ধে জাপানের কাছে রুশ বাহিনীর পরাজয় ঘটেছে।
রুশদের পরাজয়কে কেউ কেউ প্রাচ্যের কাছে পশ্চিমের পরাজয় হিসেবে দেখেছেন। রুশ দেশের সঙ্গে ভারতীয় পরিস্থিতির অবশ্য মৌলিক পার্থক্য ছিল। এক, রুশ দেশ ছিল স্বাধীন, ভারত পরাধীন। দুই, রুশদের কাছে জ্বারতন্ত্র স্বৈরাচারী ছিল ঠিকই, কিন্তু ওই শাসক ভারতীয় শাসকদের মতো শক্ত ও সুকৌশলী ছিল না। আর সবচেয়ে বড় সত্য যেটা সেটা হলো রুশ বিপ্লবীদের সামনে ছিল শ্রেণীর প্রশ্ন, ভারতীয়দের সামনে প্রধান হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রশ্ন। স্বাধীনতার প্রশ্নের মীমাংসা না করে অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসকদেরকে না হটিয়ে শ্রেণী সংগ্রামকে অর্থাৎ সামাজিক বিপ্লবের বিষয়টিকে সামনে আনা সম্ভব ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ঘটনা এই যে, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্ৰাম করার ক্ষেত্রেই ভারতীয়দের জন্য সাম্প্রদায়িক বিভাজনটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল মস্ত বড় এক অন্তরায়। স্বদেশী আন্দোলনের মতো সাম্প্রদায়িকতাও বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি, ছড়িয়ে পড়েছে সারা ভারতে, ইতি এবং নেতি ভ্ৰমণ করেছে এক সঙ্গেই।”
বইটি পড়তে পড়তে যতই এগুচ্ছি ততই ভাবছি দেশের ঐতিহ্য কিংবা ইতিহাস খোঁজার আরেক প্রচেষ্টা হতে পারে নিজের শেকড়ের সন্ধানে অনুসন্ধান।

কাজী নজরুল ইসলাম দুর্বার বেগে এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন জরা ও জীর্ণকে। আমাদের ম্রিয়মাণ মনের অঙ্গনকে সজীব করে তুললেন তাঁর তরতাজা সতেজ সব গান ও কবিতা দিয়ে। নতুনের বার্তাবাহক নতুন মানুষ তিনি যিনি কোনো বন্ধন মানেন না। বেড়া ভাঙার গান গেয়েছেন তিনি। মনুষ্যত্বের জয়গান তার কণ্ঠে। তিনি তো জয় করবেনই জাতির নবীনতার প্রত্যাশীদের। হলোও তাই। সেই আমলের বাংলার তরুণ-সমাজের মুকুটহীন সম্রাট হয়ে গেলেন নজরুল। সংস্কৃতির অঙ্গনের নতুন কাণ্ডারী তিনি। এ ইতিহাস আমাদের জানা।
নজরুলের শ্রেষ্ঠ কীর্তিই হচ্ছে তাঁর গান। বাংলা গানকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথের মতন তিনিও বাংলা গানে বিশ্বসুরের মূর্তি স্থাপন করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার গানের সুর চয়ন করে বাংলা গানের সুরের সঙ্গে একাকার করে দিয়েছেন তিনি। সুরের জগতে এ এক বিপ্লব। ১৯৪৪ সালে বুদ্ধদেব বসু ’কবিতা' পত্রিকার বিশেষ নজরুল সংখ্যা প্ৰকাশ করেন । ‘কবিতা’ পত্রিকার তখন দশম বর্ষ চলছে। বাংলা পত্রিকার সর্বপ্রথম নজরুল সংখ্যা। এই সংখ্যায় বুদ্ধদেব বসু তার প্ৰবন্ধে বলেন, ‘গানের ক্ষেত্রে নজরুল নিজেকে সবচেয়ে বেশি করে দিতে পেরেছেন। তাঁর সমগ্র রচনাবলীর মধ্যে স্থায়িত্বের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তার গানের। বীর্যব্যঞ্জক গানে- চলতি ভাষায় যাকে স্বদেশি গান বলে- রবীন্দ্ৰনাথ ও দ্বিজেন্দ্রলালের পরই তাঁর স্থান, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু' উৎকর্ষের শিখরস্পর্শী।’. ... ‘নজরুলের সমস্ত গানের মধ্যে যেগুলি ভালো সেগুলি সযত্নে বাছাই করে নিয়ে একটি বই বের করলে সেটাই হবে নজরুল-প্রতিভার শ্রেষ্ঠ পরিচয়- সেখানে আমরা যার দেখা পাবো তিনি সত্যিকার কবি, তাঁর মন সংবেদনশীল, সূক্ষ্ম-কোমল, আবেগপ্রবণ উদ্দীপনা পূর্ণ। সে-কবি শুধুই বীররসের নন, আদিরসের পথে তাঁর স্বচ্ছন্দ আনাগোনা, এমনকি হাস্যরসের ক্ষেত্রেও প্রবেশ নিষিদ্ধ নয় তাঁর।’ ... ‘কালের কণ্ঠে গানের মালা তিনি পরিয়ে দিয়েছেন। সে মালা ছোটো কিন্তু অক্ষয়। আর কবিতাতেও তাঁর আসন নিঃশংসয়, কেননা কবিতায় তাঁর আছে শক্তি, আছে স্বচ্ছন্দ, আছে সচ্ছলতা, আর এগুলিই কবিতার আদিগুণ।’
‘কবিতা' পত্রিকার উক্ত সংখ্যায় নজরুলের বন্ধু সাবিত্রীপ্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় এক প্রবন্ধে বলেন, "নজরুলের নিজের রচিত প্ৰথম গান যা সে বন্ধুদের প্রথম শুনিয়েছিল সেটা বোধহয় ‘ওরে আমার পলাতকা’ - তারপর বাঙলা দেশে নজরুল গানের পুষ্পবৃষ্টি করে গেছে। সে নিজে একজন বিশিষ্ট সুরজ্ঞ ছিল, তাই তার গানে সে এমন পরিপূর্ণ প্রাণসঞ্চার করতে পেরেছে। একদিন নজরুলের গানে বাঙলা দেশ আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল তার নব নব সুরের মাধুর্যে ও মূৰ্ছনায়।"
তাই এখনো নিজের অজান্তেই গুনগুনিয়ে উঠি, অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে। প্রদীপ-শিখা-সম কপিছে প্ৰাণ মাম তোমারে, সুন্দর, বন্দিতে।

কবিতার নজরুল

কাজী নজরুল ইসলাম মানুষের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর আসল লক্ষ্যই ছিল মনুষ্যত্বের প্রতিষ্ঠা। এই জন্য তিনি মানুষকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। রেনেসাঁস আন্দোলন থেকে পাঠগ্রহণ করেছেন বলেই জাতি-ধর্মনির্বিশেষে ঐতিহ্যের মিলনসাধনের চেষ্টা তাকে করতে দেখা যায়। তাঁর এই কাজ জরাজীর্ণ সমাজকে নতুন জীবনদান করার কাজ। প্ৰাণবান জাতির স্বপ্ন তিনি আমাদের দেখিয়েছেন। এখানে তিনি তুলনারহিত।
সঙ্কীর্ণ গণ্ডি ভেঙে তিনি বাংলা কবিতাকে নতুন প্রান্তরে নিয়ে এলেন। নবীন কবিকণ্ঠ খুঁজে পেল নতুন দিশা। জীবনবাদী কবিতায় বাংলা সাহিত্য হয়ে উঠল মুখর। রবীন্দ্ৰপ্ৰভাব এড়িয়ে নতুন ধরনের কবিতা লেখার ভাবনায় যারা ভাবিত তাদের অন্যতম পুরোধা হয়ে উঠলেন কবি নজরুল। গানে ও কবিতায় বৈচিত্র্যের সমারোহ এনে নতুন প্রাণসঞ্চার করাই তখনকার তার নেতৃত্ব।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তৎকালীন তরুণ বুধমণ্ডলীর একজন নিবেদিতপ্রাণ সদস্য। নজরুলের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ করেছিলেন। তাই ‘কল্লোল যুগ’ গ্রন্থে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের জবানী তিনি তুলে ধরেছেন। এইভাবে;
...সন্দেহ কি, শুধু ‘বিদ্রোহী'র কবি নয়, কবি-বিদ্রোহী। তার কণ্ঠস্বরে প্রাণবন্ত প্রবল পৌরুষ, হৃদস্পন্দী আনন্দের উত্তালতা। গ্রীস্মের রুক্ষ আকাশে যেন মনোহর ঝড় হঠাত ছুটি পেয়েছে। কর্কশের মাঝে মধুরের অবতারণা। নিজের অলক্ষ্যে কখন ঘরের ভিতরে ঢুকে পড়েছে নৃপেন। সমস্ত কুন্ঠার কালিমা নজরুলের গানে মুছে গেছে। ... নজরুলের চোখ পড়ল নবীন বন্ধুতার। ...নজরুল বললে, ‘ধূমকেতু’ নামে এক সাপ্তাহিক বের করছি। আপনি আসুন আমার সঙ্গে। আমি মহাকালের তৃতীয় নয়ন, আপনি ত্রিশূল। আসুন, দেশের ঘুম ভাঙাই, ভয় ভাঙাই।
নৃপেন উৎসাহে ফুটতে লাগল। বললে, এমন শুভকাজে দেবতার কাছে আশীৰ্বাদ ভিক্ষা করবেন না? তিনি কি চাইবেন মুখ তুলে। তবু নজরুল শেষমূহুর্তে তাঁকে টেলিগ্ৰাম করে দিল। রবীন্দ্রনাথ কবে কাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাছাড়া, এ নজরুল, যার কবিতায় পেয়েছেন তিনি তপ্ত প্ৰাণের নতুন সজীবতা। শুধু নামে আর টেলিগ্রামেই তিনি বুঝতে পারলেন ‘ধূমকেতু’র মর্মকথা কি। যৌবনকে ‘চিরজীবী’ আখ্যা দিয়ে ‘বলাকা’য় তিনি আধ-মরাদের ঘা মেরে বাঁচাতে বলেছিলেন, সেটাতে রাজনীতি ছিল না, কিন্তু, এবার 'ধূমকেতু’কে তিনি যা লিখে পাঠালেন তা স্পষ্ট রাজনীতি, প্রত্যক্ষ গণজাগরণের সংকেত।
নবজাগরণের চারণকবি নজরুল । তাই রাজনৈতিক ও সামাজিক সকল বিষয়ে তার ছিল সজাগ দৃষ্টি। শিল্পবােধ কোথাও কোথাও খর্ব হলেও কবিতা যে জীবনসংগ্রামের হাতিয়ার হতে পারে সে-বোধ বাংলা কবিতার পাঠকেরা তীব্রভাবে পেয়েছে তারই কবিতার মাধ্যমে। পরাধীনতার গ্লানি থকে দেশ ও জাতিকে মুক্ত করার যে দৃপ্ত উচ্চারণ তাঁর, তা বাংলা ভাষার অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। রবীন্দ্রনাথের পর নজরুল ইসলামই সবচেয়ে বেশি যৌবনবন্দনা করেছেন আর মানুষের অন্ধবিশ্বাস এবং সমাজের অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। এ যেন তারুণ্যকে নতুন করে আবিষ্কার করা। তাঁর কণ্ঠে তাই উচ্চারিত হয়েছে "আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ”। এই উচ্চারণ যেমন তারুণ্যের তেমনি আত্মমহিমা-বোধের। এই আত্মমহিমা-বোধ ব্যতিরেকে ইন্টেলেকচুয়াল হওয়া যায় না। তাই তারুণ্যের সঙ্গে মনীষার খুব মিল। নজরুলের চরিত্রে এই দুই সত্তার মিলন ঘটেছিল বলেই এত বেশি সচেতনতা ও স্পর্ধা তার কবিতায় আমরা পাই । নজরুল আমাদের কাছে যৌবনের প্রতীক।

অসাম্প্রদায়িক নজরুল

এই পবিত্র বাংলাদেশ
বাঙালির আমাদের
দিয়া 'প্ৰহারেণ ধনঞ্জয়'
তাড়াব আমরা, করি না ভয়,
যত পরদেশী দাসু ডাকাত
‘রামা’দের ‘গামা’দের।
বাঙলা বাঙালির হোক।
বাঙলার জয় হোক।
বাঙালির জয় হোক।
জীবন অনেক ঘটনা-অঘটনে ভরা। ১৯০৫ সনে বঙ্গভঙ্গের বেদনায় আহত রবীন্দ্রনাথ জাতির অন্তরে বাউল সুরে ডাক পাঠিয়েছিলেন। “আমার সোনার বাঙলা আমি তােমায় ভালবাসি” বলে। অনতিপরবর্তীকালে পরদেশী (বৃটিশ) শাসন আর সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিপক্ষে সবচেয়ে উচ্চ রোলে জাতিকে ডাক দিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ৷৷ ১৩২৯ বঙ্গাব্দে তিনি লিখলেন :
সর্বপ্রথম, "ধূমকেতু” ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়।
স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার, সমস্ত থাকবে ভারতবাসীদের হাতে। … যারা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এদেশে মােড়লী করে দেশকে শ্মাশানভূমিতে পরিণত করছেন, তাদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুটলি বেঁধে সাগর পারে পাড়ি দিতে হবে।
এই সঙ্গে বাঙলা ও বাঙালি নিয়ে ভাবিত কবি লিখেছেন :
বাঙালি যেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়ে বলতে পারবে “বাঙালির বাঙলা” সেদিন তারা অসাধ্য সাদন করবে। সেদিন একা বাঙালিই ভারতকে স্বাধীন করতে পারবে। বাঙালির মত জ্ঞান-শক্তি ও প্রেম শক্তি এশিয়ায় কেন, বুঝি পৃথিবীতে কোন জাতির নেই। কিন্তু কর্মশক্তি একেবারে নেই বলেই তাদের এই দিব্যশক্তি তমসাচ্ছন্ন হয়ে আছে।
আজো তমসাচ্ছন্ন জাতির কর্মশক্তির উদ্বোধন ঘটাতে “বাঙলার শ্যাম শ্মশানের মায়ানিদ্রিত ভূমে অগ্রদূত তূর্যবাদক” কবি যা কিছু লিখেছিলেন তা-ই বাঙালি জাতির শ্ৰেষ্ঠ সারাৎসার এবং জাতীয়মুক্তির উজ্জ্বলতম দিকনির্দেশনা। এই কবি অন্তরেবাহিরে সর্বব্যাপ্ত করে ডাক দিয়েছিলেন জাতিকে । লিখেছিলেন বিদ্রোহের গান, গান, শ্রমিকের গান, ধীবরদের গান, ছাত্রদলের গান। বাহিরের এই সাংগঠনিক হাতিয়ার হাতে যারা মুক্তির আলোকবর্তিকা জ্বালবেন তাদের উদ্দেশে বৃটিশ শাসকের উস্কে দেয়া শোষণ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ডামাডোল ছাপিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন;
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি
ও' মুখ হইতে কেতাব-গ্ৰন্থ নাও জোর করে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে!
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! মূর্খরা সব শোনাে,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।
জাতীয় ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মধ্যযুগীয় পরিপ্রেক্ষিত থেকে বাঙালি কবি চন্ডিদাস যেমনটি উচ্চারণ করেছিলেন ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ তেমনি বাঙলাভূমের একালের কবি আরেকবার উচ্চারণ করলেন;
গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।
… তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাৰে সখা খুলে দেখ নিজ প্ৰাণ।
...এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মধুরা,, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ পয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা-ভবন,
মসজিদ এই, মন্দির এই, গীর্জা এই হৃদয়,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।
কিংবা;
গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সর্বজনীন মানবতাবোধে উদ্দীপিত এই পদ্যকারের মৌলিক ধারাপাত পাঠ করেই, জাতীয় বিভাজন-রেখার ভেতরে থেকেই, পরদেশী শাসন-শোষণের শৃঙ্খল ছিন্ন করে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে— 'এক হাতে রণতূর্যে’র কবি নজরুল ছিলেন তার প্রত্যক্ষ প্রেরণা।
সারা বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার বারবার মনে পড়ে তাঁরই কয়েকটি লাইন;
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে,
তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
মোল্লা-পুরুতে লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি ৷

বিদ্রোহের কবি, মানবতার কবি, প্রেমের কবির জয় হোক।

Hillary Clinton’s leaked emails from her term as secretary of state reveal, among many things. One of them is reading books. I think it is a very positive side of a future president.
You can read the articles from here.
হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস 'নন্দিত নরকে’। আর সেই প্রথম উপন্যাসই তার পথ করে দিয়েছিলো। তাকে শক্তিমান কথাশিল্পী হিশেবে চিনতে পেরেছিলেন পাঠকসমাজ। সমালোচকেরাও আশান্বিত হওয়ার মতন লক্ষণাদি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর লেখায়। অনলসভাবে লিখে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। হতাশ করেননি তাঁর পাঠক-পাঠিকাদের।

আমাদের মনে রাখতে হবে ‘সব লেখা সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ী আসন পায় না তবে, পাঠকের ভালো লাগাতে পারাটাও কম কৃতিত্বের ব্যাপার নয়’। গল্প বলার দক্ষতা ছিল তাঁর। এ দক্ষতার কারনে পাঠক-পাঠিকাদের জয় করে নিয়ে ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। জনপ্রিয়তা তাকে ফুলটাইম লেখক হতে বাধ্য করেছিল। পাঠকই তাকে সাহসী করে তুলেছিল বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকুরিতে ইস্তফা দিতে দ্বিধা হয়নি তার। আসলে লেখকের ধর্ম যে লেখা তা প্রমাণ করলেন এই বিরল পাঠকের দেশে হুমায়ূন আহমেদ।

আমাদের সাহিত্যে তাঁর বই বেস্টসেলারের মর্যাদা পেয়েছিল, ছিল কি এখনো আছে। সুতরাং তিনিই পাঠকের মনোরঞ্জনকারী উপন্যাসের সফল নির্মাতা ছিলেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে জনপ্রিয় উপন্যাসিক বিমল মিত্রের বক্তব্য, “স্বীকার করতেই হবে যে পাঠকের জন্যে সাহিত্য নয়, বরং সাহিত্যের জন্যেই পাঠক সুতরাং আজকালকার কোনও সৎ লেখকের পক্ষে পাঠকের সম-স্তরে নেমে আসবার কোনও প্রশ্নই আসে না।” এবং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্যটিও প্রণিধানযোগ্য। যেমন, উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু একটা ব্যক্তি-চরিত্র থাকে তো থাকুক- তার বৃত্তটা হবে সমাজব্যাপী। কিন্তু এর ফলে কি ব্যক্তির মূল্য অস্বীকৃত হবে? সে সম্ভাবনা নিশ্চয়ই নেই। আজ পৃথিবীর সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হচ্ছে - ব্যক্তির সীমানা বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। অর্থনীতি সমাজনীতির সঙ্গে মনের ভৌগোলিক পরিধি বেড়ে গেছে। সেই বৃহত্তর পটভূমিই তো আজকে ব্যক্তি-মানবের স্বাধিষ্ঠানক্ষেত্র। একক মানুষের কোনো সমস্যাকেই এই পটভূমি ছাড়া সমাধান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শরীর, মন, মনুষ্যত্ব আর সংস্কৃতির যে কোনাে ক্ষুধাই আজ এই সামগ্রিক সমাধানে নিবৃত্তি লাভ করতে পারে।

হুমায়ূন আহমেদ অভিনিবিষ্ট পাঠক চরিত্রাবলী এবং কাহিনীর বিপুলতার মধ্যে এই সবের সন্ধান পাবেন আশা করি। সংসারের মধ্যে বেঁচে থেকে মনুষ্যত্বের বিকাশ সম্ভব, আনন্দ মরীচিকা মাত্র নয়। আনন্দ তার প্রবহমানতা নিয়ে সাহিত্যে সমুপস্থিত এরই সঙ্গে যুগলক্ষণে চিহ্নিত মনস্বিতা বিরাজমান। আমাদের সমস্ত সুখদুঃখ, আশানিরাশা রূপলাভ করে চলেছিল তার রচনায় চলচ্ছবি হয়ে।

জর্জ অরওয়েল তার "In Defence of the Novel' প্রবন্ধে বলেছেন : This is the fact that the hack reviewer has made it his special business to obscure. It ought to be possible to devise a system, perhaps quite a rigid one, of grading novels into classes A, B, C and so forth, so that whether a reviewer praised or damned a book, you would at least know how seriously he meant it to be taken. As for the reviewers, they would have to be people who really cared for the art of the novel (and that means, probably, neither highbrows nor lowbrows nor midbrows, but elastic-brows), people interested in technique and still more interested in discovering what a book is about.

এসব কথা মনে পড়ছে কারন অনেকেই শুধু নানা মুনির নানা মতের উপরে ভরসা করে লেখক সাহিত্যিকদের সমালোচনা করেন। আসলে কতটুকু পড়াশোনা করে বলেন, সেটা এই সব পন্ডিতদের সাথে আলোচনায় গেলেই বোঝা যায়। সবাই যার যার মতকে অন্যের উপরে চাপিয়ে বা চালিয়ে দিতে অভ্যস্ত। “আমার মতে” এই শব্দ দুটি বলতে অভ্যস্ত নন।

একজন সেরা পাঠকের অস্ত্র ও যুদ্ধক্ষেত্র দুই-ই হলো ‘বই’। এই সত্যটি যখন সবাই অনুধাবন করতে পারবে তখনই সমাজে সেরা পাঠকের আর অভাব থাকবে না। দুনিয়ার পাঠক এক হও! আসুন সবাই সেরা পাঠক হওয়ার চেষ্টা করি।
গুহার মধ্যে শৃঙ্খলিত বন্দিরা কেবল ছায়াকেই জানতে পারে, জ্ঞানকে নয়, সত্যকে নয়। সেই ছায়াকেই তারা জ্ঞান বলে মনে করে। কিন্তু যে-বন্দি মুক্ত হয়ে গুহার বাইরে সূর্যের আলোকে এসেছে সে যথার্থ জ্ঞানের সাক্ষাৎলাভ করে। কিন্তু সেই যথার্থ জ্ঞানের সাক্ষাৎ সরাসরি হতে পারে না। তার স্তর আছে। অন্ধকার হতে তীব্র আলোতে এসে প্রথমে সে অন্ধের মতো হয়ে যাবে। তার মনে হবে গুহাতেই সে ভালো ছিল। সেখানেই সে সত্যকে জেনেছে। কিন্তু চোখ যখন আলোতে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে তখন সে জ্ঞানের সাক্ষাৎলাভ করতে থাকবে এবং সত্য এবং গুহার ছায়ার পার্থক্য তখন সে উপলব্ধি করতে পারবে। সকল মানুষই এই সত্য জ্ঞান লাভ করতে পারে না। অধিকাংশ মানুষই হচ্ছে গুহার বন্দি। তারা ছায়াকেই সত্য মনে করে। এটা তাদের জ্ঞান নয়, এটা তাদের ধারণা। খুব অল্পসংখ্যকেরই গুহা থেকে মুক্তির সৌভাগ্য জোটে। কিন্তু সকলেরই কামনা হবে সেই মুক্তির। অন্ধকার থেকে আলোতে আসার। ছায়ার বদলে ছায়ার উৎসকে জানার।
উপরোক্ত কথাগুলি দার্শনিক সক্রেটিসের। কিন্তু কথাগুলি সক্রেটিসের না হলেও তো মিথ্যা হবার উপায় নেই। আমাদের চারপাশের নানান ঘটনা বলি কি আমাদের এই মেসেজ দিচ্ছেনা যে আসুন সময় হয়েছে জ্ঞানচর্চার। আর এই চর্চা অব্যাহত রাখতে পারে বই। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার মাধ্যম হিসেবে বই হোক প্রথম অবলম্বন।
মাদ্রাজের (অধুনা তামিলনাড়ু ) টিকুটানি নামে এক ছোট্ট শহরে রাধাকৃষ্ণণ ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেন। টিরুটানি একটি তীর্থস্থানও বটে। র্তার পিতামাতা সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ছিলেন ।
গোড়া হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও রাধাকৃষ্ণণের শিক্ষা বরাবরই খ্ৰীষ্টান মিশনারিদের বিদ্যালয়ে হয়। দক্ষিণ ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষায় মিশনারি বিদ্যালয়গুলির বিশেষ স্বনাম ছিল। যতদূর বোঝা যায়, রাধাকৃষ্ণণকে ভালভাবে শিক্ষিত করবার আশায় নিষ্ঠাবান হিন্দু হয়েও তার পিতা-মাতা তাকে মিশনারিদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন । ভেলোরের আমেরিকান মিশন বিদ্যালয় হতে ১৯০৩ সালে প্রবেশিকা ও ১৯০৫ সালে এফ. এ. পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন। ঐ কলেজ থেকেই ১৯০৭ সালে বি. এ. এবং ১৯০৯ সালে এম. এ. পরীক্ষায়ও সম্মানের সঙ্গে তিনি উত্তীর্ণ হন। লেখাপড়াতে রাধাকৃষ্ণণ বরাবরই মোটামুটি ভাল ছিলেন। তবে তার সহাধ্যায়ীরা মিষ্ট স্বভাবের জন্যই তাকে বেশী ভালবাসত। তিনি ছিলেন লাজুক ও শাস্ত প্রকৃতির মানুষ ।

খ্ৰীষ্টান মিশনারি বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ হওয়ায় তাদের ধর্ম ও ধ্যানধারণার প্রভাব যে রাধাকৃষ্ণণের জীবনে যথেষ্ট প্রভাব রাখবে সে বিষয়ে সন্দেহ করবার কোন কারণ নেই। প্রচলিত হিন্দুধর্মের নানা কুসংস্কার ও আবর্জনা হতে মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তাশীলতার সাহায্যে রাধাকৃষ্ণণ যে প্রকৃত হিন্দুরূপে নিজেকে গড়ে তুলতে সমর্থ হন, মনে হয় সেটা মিশনারি বিদ্যালয়ে শিক্ষারই ফল।

এম এ, পাশ করে সে বছরই রাধাকৃষ্ণণ মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনশাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। ঐ কলেজের কার্যকাল হতেই অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণের খ্যাতি বিদ্বজনমহলে ছড়িয়ে পড়ে। তাই দেখা যায় যে, ১৯১৮ সালে মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষর তাকে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দর্শনাধ্যাপকের পদে নিয়োগ করেন।
মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবার দুবছর পরে, অর্থাৎ ১৯২০ সালে, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দর্শনাধ্যাপকের পদের জন্য উপযুক্ত লোকের সন্ধান করছিলেন। ঐ পদ অলংকৃত করেছিলেন ডঃ ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। ড: শীল মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলারের পদ পেলে তার শূন্যপদে স্যার আশুতোষের উদ্যোগে রাধাকৃষ্ণণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দর্শনাধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। ইতিমধ্যে অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ ইংলণ্ড ও আমেরিকার দার্শনিক পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে ও দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কে একখানি উৎকৃষ্ট পুস্তক প্রকাশ করে খ্যাতিলাভ করেছিলেন।
অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন তখন তার বয়স বত্ৰিশ । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে র্তার “ভারতীয় দর্শন” প্রকাশিত হয়। রাধাকৃষ্ণণের খ্যাতিও চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে Empire Universities Congress-এর যে অধিবেশন হয় তাতে অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন। ইংলণ্ডে বহুস্থান হতে বক্তৃতা দেবার নিমন্ত্রণও তিনি পান। এর মধ্যে অক্সফোর্ডের ম্যাঞ্চেস্টার কলেজে প্রদত্ত Upton Lectures সবিশেষ প্রসিদ্ধ । এই বক্তৃতাগুলি পরবর্তীকালে The Hindu View of Life নামক পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।
ঐ বছর সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে International Congress of Philosophyর ষষ্ঠ অধিবেশনে রাধাকৃষ্ণণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন। আমেরিকাতেও তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য, বাগিতা প্রভৃতিতে সকলেই মুগ্ধ ও চমৎকৃত হন।
অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ ইংলণ্ড ও আমেরিকায় অসাধারণ খ্যাতি লাভ করেন। ফলে দেখা যায় ষে তিনি উন্নতির সোপানপরম্পরায় ক্রমশঃই অগ্রসর হয়েছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, ইংলণ্ডে হিবার্ট লেকচার প্রদান, Encyclopaedia Britannicaতে প্রবন্ধ লিখন, আন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলার হিসাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠন, লীগ অব নেশন্সের সদস্যপদ লাভ, এই ধরনের নানা পদে রাধাকৃষ্ণণ যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৩১ সালে গভর্নমেণ্ট তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাকে স্যার উপাধিতে ভূষিত করেন।
শুধু অধ্যাপক, হিন্দুজীবনবেদব্যাখাত, অসাধারণ বাগ্মী হিসাবে নয়, পরবর্তী জীবনে রাধাকৃষ্ণণ মস্কোতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসাবেও অসাধারণ সাফল্য লাভ করেন। ভারতবর্ষের প্রেসিডেন্ট হিসাবেও তিনি বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
নানাক্ষেত্রে প্রতিভা ও কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেলেও রাধাকৃষ্ণণ ‘দার্শনিক’ হিসাবেই বিশেষভাবে সর্বত্র পরিচিত। দার্শনিক হিসাবেই তিনি দেশবিদেশের সশ্রদ্ধ অভিনন্দনও পেয়েছেন। স্যার ফ্রানসিস ইয়ংহাজব্যান্ড তার একটি গ্রন্থে লিখেছেন : “রবীন্দ্রনাথ যেমন নবীন ভারতের কবি তেমনি রাধাকৃষ্ণণও নবীন ভারতের দার্শনিক।”
রাধাকৃষ্ণণের বাগ্মিতাও ছিল অসাধারণ । অনেক ইংরেজ অধ্যাপকও মন্তব্য করেছেন যে, এ ধরনের বাগ্মিতা তাদেরও ঈর্ষা, প্রশংসা ও আত্মগ্লানির বিষয়। কোন রকম লিখিত টীকাটিপ্পনীর সাহায্য না নিয়ে রাধাকৃষ্ণণ এমন নিখুঁত কাব্যধর্মী ভাষায় অনর্গল বক্তৃতা দিতেন যে ভারতীয়দের মধ্যে তো নয়ই, ইংরেজদের মধ্যেও এমন বাগ্মিতা ছিল বিরল।
দার্শনিকেরা সকলেই যে প্রসন্নগম্ভীর লেখা লিখতে পারেন তা নয়। প্লেটো, হিউম, রাসেল, বের্গসঁ, শংকর প্রভৃতির মতো লেখক দার্শনিকমহলে খুব বেশী নেই। কিন্তু রাধাকৃষ্ণণের রচনাশৈলী ছিল অননুকরণীয়।. তার ভাষার সৌন্দর্য, অপরূপ ছন্দোময় ইংরাজি এমনই মনোহারী ছিল যে, বহু বিদেশী মণীষী অকুণ্ঠচিত্তে রাধাকৃষ্ণণের রচনাশৈলীর প্রশংসা করেছেন।
রাধাকৃষ্ণণ প্রধানত “ভারতীয় দর্শন" ( দুই খণ্ড ) রচয়িতা হিসাবে পরিচিত হলেও অন্যান্য দার্শনিক ও ধর্মমূলক গ্রন্থও তিনি লিখেছেন। যৌবনে তিনি The Reign of Religion in contemporary Philosophy -নামক পাশ্চাত্য দার্শনিকদের সমালোচনামূলক গ্রন্থ রচনা করে হন। তার “ভারতীয় দর্শন" দেশবিদেশে ভারতীয় দার্শনিক চিন্তাধারার সম্যক পরিচয় দিয়ে তাকে আন্তর্জাতিক-খ্যাতিসম্পন্ন করে তোলে।
এছাড়া Kalki or the Future Civilisation, The Hindu View of Life, An Idealist View of Life, Religion and Society, The Philosophy of Rabindranath Tagore, Recovery of Faith, Precdom and Culture, India and China প্রভৃতি গ্রন্থ বহুলপরিচিত। রাধাকৃষ্ণণ ভগবদগীত, ব্রহ্মপুত্র, ধৰ্ম্মপদ-এর ইংরাজি । অনুবাদ টীকসহ প্রকাশ করেছেন। মহাত্মা গান্ধীর উপর লিখিত প্রবন্ধাবলীর সংকলন প্রকাশ করেছেন মুখবন্ধ সহ। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর উপর মূল্যবান আলোচনা করেছেন। তার বক্তৃতা ও ভাষণ সংকলিত হলে বেশ কয়েক খণ্ড হবে বলেই মনে হয় ।
রাধাকৃষ্ণণ পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য উভয় দর্শনেই পারংগম ছিলেন। বিশেষ করে ইংলণ্ডের নব্য-হেগেলপন্থী স্টারলিং, কেয়ার্ড, গ্রীন ব্ৰডলে, বোসাংকে প্রভৃতি দার্শনিকদের চিন্তাধারার সঙ্গে তার ছিল অন্তরঙ্গ পরিচয় । হিন্দু ষড়দর্শনের মধ্যে রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন শংকর-বেদান্তের ভক্ত। রাধাকৃষ্ণ নিজে কোন সমগ্র, সুসংহত দর্শনপ্রস্থান প্রতিপন্ন করেন নি। তবে পূর্বপক্ষ খণ্ডন এবং বিভিন্ন দর্শনব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তার একটা সুস্পষ্ট জীবনবেদ ফুটে উঠেছে, যে জীবনবেদে একদিকে রয়েছে শংকরের প্রভাব, অন্যদিকে ব্র্যাডলের ।
হিন্দু কুপমণ্ডুকতা পরিহার করে, মাদ্রজী গোড়া ব্রাহ্মণসমাজের কুসংস্কারের বন্ধন ছিন্ন করে রাধাকৃষ্ণণ এক উদার সর্বজনীন হিন্দুধর্মের সন্ধানে বেরিয়ে বেদান্ত-দর্শনে উপনীত হন। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মর্মবাণী তিনি যেমন একদিকে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে তেমনি emergent evolution-এর মূল তত্ত্বও তার চিন্তাধারায় প্রভাব বিস্তার করেছে। বিজ্ঞান, কাব্য, ধর্মশাস্ত্র ও মরমী সাধকদের কাহিনী ঘেঁটে রাধাকৃষ্ণণ গড়ে তুলেছেন এক ‘গতিশীল ব্রহ্মবাদ’। এর আকর্ষণ এক যুগে যে ছিল তা অস্বীকার করা যায় না।
একথা সত্য যে রাধাকৃষ্ণণ কোন সম্পূর্ণ মৌলিক দর্শনপ্রস্থান স্মৃষ্টি করেন নি। তবুও ষে ইউরোপের ও আমেরিকার জ্ঞানীগুণী মহলে তিনি সশ্রদ্ধ অভিনন্দন পেয়েছেন তার কারণ জীবনের সমস্তাকে তিনি বুঝতে চেয়েছেন এক অসাম্প্রদায়িক, ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, জাতিতে জাতিতে সমন্বয়ের তত্ত্বকথা তিনি প্রচার করেছেন এবং প্রবহমান জীবনকে অস্বীকার করে শুধুই আকাশ-কুসুম রচনা করেন নি।

বিস্তারিত অন্যকোন সময়ে দেওয়া যাবে।
উপরের লেখাটি চতুরঙ্গ পত্রিকা থেকে নেওয়া।
বাংলাদেশে এসে যে সুযোগটি সবচেয়ে বেশি বেশি পাচ্ছি তা হলো প্রচুর পড়ার সুযোগ। সম্প্রতি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরির একটি প্রবন্ধ পড়ে চমৎকৃত হলাম। স্যার লিখছেন, "সামন্তবাদ জিনিসটা জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। সেখান থেকেই উদ্ভূত এবং তার ওপরেই নির্ভরশীল। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে জমিদারি ব্যবস্থার ছবি আছে। আর আছে সামন্তবাদী সাংস্কৃতিক নানা প্রভাব ও বিভিন্ন মূল্যবোধ। বস্তুত এই সাংস্কৃতিক দিকটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এর নিজস্ব মূল্য রয়েছে, তদুপরি জমিদারি ব্যবস্থাকে আবরণ দেওয়া, তাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও এই সংস্কৃতি কাজ করেছে। বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, তার মূল্যবোধগুলোকে মহিমান্বিত করে জমিদারি ব্যবস্থাটাকে পরোক্ষে বৈধতা দিয়েছে।" পাঠকের সুবিধার্থে সম্পূর্ণ লেখাটি এখানে তুলে দিচ্ছি।

সামন্তবাদের সঙ্গে শরৎচন্দ্রের বসবাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অসামান্য এক কথাসাহিত্যিক ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। গল্প বলায় তিনি অতুলনীয়; মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে অসাধারণ। কথাসাহিত্য সার্থক হয় ওই দু’টি গুণ থাকলে। যে-সাহিত্যে গল্প থাকে, থাকে চরিত্র। সেই সঙ্গে থাকে লেখকের মতাদর্শিক অবস্থান। সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বস্তুত কোনো সাহিত্যই মহৎ হয় না, যদি না সে ধনী হয় দার্শনিকতায়। এই দার্শনিকতারই অপর নাম মতাদর্শ। শরৎসাহিত্যের মতাদর্শিক দিকটি সবসময় বিবেচনায় নেওয়া হয় না; কিন্তু নেওয়াটা জরুরি। দুই কারণে। প্রথমত জীবন ও জগৎকে শরৎচন্দ্র কোন অবস্থান থেকে দেখছেন, এবং কোন দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করছেন সেটা লক্ষ্য করলে তাঁকে বুঝতে সুবিধা হয়। বোঝাটা গভীর হয় এবং আবেদনটা আরও বেশি স্থায়িত্ব পায়। দ্বিতীয়ত, সাহিত্য আমাদের সংস্কৃতির অত্যন্ত মূল্যবান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরৎচন্দ্র আমাদের প্রধান সাহিত্যিকদের একজন। তাঁর মতাদর্শ আমাদের দার্শনিক চিন্তার একটি দিক ও স্তর নির্দেশ করে। চিন্তার ওই দিক ও স্তরের প্রভাব আমাদের মানসিক ভুবনে পড়েছে, এবং কার্যকর রয়েছে। সাহিত্যকে দর্পণ বলা হয়, সেই অভিধা খুবই যথার্থ। শরৎচন্দ্রের রচনাতে তাঁর নিজস্ব চিন্তার তো অবশ্যই, যে মধ্যবিত্ত বাঙালি সাহিত্য সৃষ্টি করেছে তারও ভাবনাধারার একটা ছবি পাওয়া যাবে। শরৎসাহিত্যের মতাদর্শিক দিকটির ওপর আমি নিজে ছোট একটি বই লিখেছিলাম ১৯৭৮ সালে। নাম দিয়েছিলাম ‘শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ’। বইটির পক্ষে-বিপক্ষে বেশ কিছু কথা শোনা গিয়েছিল, সেই সময়ে। বইটি কয়েকবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। প্রয়াত সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ আবদুল হালিম ভিন্ন মত প্রকাশ করে ‘শরৎচন্দ্র ও মানবতাবাদ’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন। কলকাতা থেকেও বইটি পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। প্রায় চার দশক পরে সেটি আবার পড়তে গিয়ে দেখলাম আমার তখনকার বক্তব্যের মূল জায়গাটিতে কোনো পরিবর্তন দরকার নেই, সেটি বহালই থাকছে, তবে গুরুত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কিছুটা রদবদল দরকার হয়ে পড়েছে। নিজের বক্তব্য পড়তে গিয়ে শরৎসাহিত্যের সঙ্গেও নিজের পরিচয়টা আবার পোক্ত করে নেবার সুযোগ ঘটলো তাঁর রচনাবলি পুনরায় পড়ায়। সেটা একটা বড় প্রাপ্তি। কিশোর বয়সে শরৎচন্দ্রের অনেক লেখা পড়ে আমাদের চোখ সজল হতো। আমরা কাঁদতামও। দেখলাম শরৎচন্দ্র ক্ষমতা রাখেন বার্ধক্যে পৌঁছানো পাঠকদেরকেও অভিভূত করতে। কারণ মনস্তত্ত্বের খবর তিনি রাখতেন। যেমন তাঁর কাল্পনিক মানুষদের তেমনি তাঁর পাঠকদেরও। নিজের আবেগকে তিনি অনায়াসে সংক্রমিত করে দেন পাঠকের মধ্যে। একজন শিল্পীর জন্য সেই ক্ষমতাটা সামান্য নয়। কিন্তু কেবল আবেগের ওপর প্রভাবই যে পড়ে তা নয়, প্রভাব পড়ে চিন্তাধারার ওপরেও। সেই প্রভাবটা সূক্ষ্ম, কিন্তু তাই বলে অবাস্তব নয়। বাঙালি পাঠক শরৎচন্দ্রের লেখা পাঠ করে আনন্দ পেয়েছে, এবং নিজেদের অজান্তেও প্রভাবিত হয়েছে; সেই প্রভাবকে অতিক্রম সে করেছে নিশ্চয়ই, কিন্তু তাকে নিজের মধ্যে বহন করেনি এমন নয়। চার দশক আগে যখন শরৎসাহিত্য ধারাবাহিক ভাবে পড়ছিলাম তখন মনে হয়েছিল সামন্তবাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা অত্যন্ত নিবিড়। সামন্তবাদের সীমাবদ্ধতা তিনি জানেন, তার সংশোধন চেয়েছেন। কিন্তু আবার সঙ্গে সঙ্গে সামন্তবাদের প্রতি তাঁর মমতাও রয়েছে। এই মমতাটা খুবই সত্য। সামন্তবাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অনেকটা সচেতন পুত্রের সঙ্গে বৃদ্ধ পিতার সম্পর্কের মতো। পুত্র পিতার সমালোচনা করে, দুর্বলতাগুলোর সংশোধন চায়, কিন্তু পিতাকে যে প্রত্যাখ্যান করে তা নয়। এই গোপন মমতাটা সেকালের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ভেতর ছিল। এখনও যে নেই তা নয়। শরৎচন্দ্র ওই মমতার প্রতিনিধিত্ব করেন। সেটা একটা কারণ যে জন্য তিনি অতটা জনপ্রিয় ছিলেন। আবার নেতির দিক থেকে এই মমতা যে সামাজিক অগ্রসরমানতায় প্রতিবন্ধকতাকে অল্প পরিমাণ হলেও শক্তিশালী করেছে সেটাও স্বীকার করতে হবে। সে জন্য সামন্তবাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটাকে নিরীক্ষণ করার সাহিত্যিক মূল্য তো আছেই, থাকবেই, সাংস্কৃতিক মূল্যও রয়েছে। রাজনৈতিক দিক থেকেও বিষয়টা গুরুত্ব বহন করে। কারণ আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশে, একবার নয়, দুই দুইবার স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশেও, রাষ্ট্র যদিও পুঁজিবাদী স্বভাব নিয়েছে তবু শাসক শ্রেণির মনোভঙ্গিটা অনেকাংশে সামন্তবাদী। রাষ্ট্রকে তারা বড় একটা জমিদারী মনে করে, তাদের রাজনৈতিক বিরোধ জমিদারে জমিদারে সংঘর্ষের রূপ নেয়। পক্ষ-বিপক্ষ উভয়েরই লাঠিয়ালবাহিনী আছেÑআইনি এবং বেআইনি। সামন্তবাদ জিনিসটা জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। সেখান থেকেই উদ্ভূত এবং তার ওপরেই নির্ভরশীল। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে জমিদারি ব্যবস্থার ছবি আছে। আর আছে সামন্তবাদী সাংস্কৃতিক নানা প্রভাব ও বিভিন্ন মূল্যবোধ। বস্তুত এই সাংস্কৃতিক দিকটিই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এর নিজস্ব মূল্য রয়েছে, তদুপরি জমিদারি ব্যবস্থাকে আবরণ দেওয়া, তাকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রেও এই সংস্কৃতি কাজ করেছে। বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, তার মূল্যবোধগুলোকে মহিমান্বিত করে জমিদারি ব্যবস্থাটাকে পরোক্ষে বৈধতা দিয়েছে। শরৎচন্দ্র এ দাবি করতেই পারেন যে, সাহিত্যকে তিনি অভিজাতদের বসতবাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এসেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে জমিদারদের যে ধরনের রাজবাড়ীর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, শরৎচন্দ্রের লেখায় তা অনুপস্থিত। এর একটা কারণ শরৎচন্দ্র ওই দুই সাহিত্যিকের পরবর্তী। দ্বিতীয় কারণ তাঁর নিজের অবস্থান সমাজের সর্বোচ্চ শ্রেণিতে ছিল না। তিনি নিম্ন মধ্যবিত্ত ছিলেন। বড় আমলা, কিংবা বড় জমিদার ছিলেন না। কিন্তু তাঁর অধিকাংশ নায়ক নায়িকাই জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এটাই ছিল স্বাভাবিক। সে সময়ে নায়ক নায়িকা হিসেবে তারাই ছিল উপযুক্ত। পেশাজীবী একটি শ্রেণি গড়ে উঠেছিল, কিন্তু তাদের ভেতর নায়কসুলভ মানুষ তেমন একটা পাওয়া যায়নি। শরৎচন্দ্র তা পেতেও চাননি। কেননা তিনি সাংস্কৃতিক সামন্তবাদকে ঘৃণা করেননি, তার প্রতি তাঁর অনুরাগ ছিল। আর সামন্তবাদী সংস্কৃতির প্রতি যদি কারও অনুরাগ থাকে তবে তিনি যে জমিদারবিদ্বেষী হবেন এটা স্বাভাবিক নয়। সামন্তবাদকে শরৎচন্দ্র দেখেছেন মূলত নিম্নমধ্যবিত্তের দৃষ্টিতে। নিম্নমধ্যবিত্ত জমিদারদের ঈর্ষা করে এবং তাদের মতো হতে চায়। শরৎচন্দ্র এই ধরনের নিম্নমধ্যবিত্ত ছিলেন না। তিনি অসামান্য শিল্পী। এবং শিল্পী হিসেবে জমিদারি ব্যবস্থায় কৃষকের ওপর নিপীড়নের বাস্তবতা তাঁর অজানা ছিল না। কিন্তু শিল্পী তো আবার ব্যক্তিও। ব্যক্তি শরৎচন্দ্র শিল্পী শরৎচন্দ্রের ওপর প্রভাব ফেলেছে; শিল্পীর মূল্যবোধকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে চেয়েছে। সামন্তবাদী মূল্যবোধের ভেতর রয়েছে আনুগত্য ও ভক্তি। আনুগত্য ও ভক্তি বিদ্যমান ব্যবস্থা ও তাদের সুবিধাভোগীদের প্রতি। ওই ভক্তি আবার ধর্মের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। পদধুলি গ্রহণ হয়ে দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক উচ্চতার নিদর্শন। সামন্তবাদে রয়েছে পুরাতনকে মহৎ ও নতুনকে ছোট করে দেখার মনোভাব। বিশেষভাবে আছে বৈষম্যকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া। বৈষম্যের বিশেষ ভুক্তভোগী হচ্ছে মেয়েরা। তাদের মাতৃত্ব, সেবাপরায়ণতা, রান্নাবান্না, ঘরসংসার করা, সতীত্ব, আতিথেয়তাÑএসব সামান্য ও ক্লান্তিকর কাজকে বাধ্যতামূলক করা হয় এবং গুণ হিসেবে চিহ্নিত করা চলতে থাকে। সামন্তবাদ অসংশোধনীয় রূপে পিতৃতান্ত্রিক।

২. শরৎচন্দ্রের অবিস্মরণীয় দুটি রচনা ‘মহেশ’ ও ‘অভাগীর স্বর্গ’। দুটোই ছোট গল্প। দুটোই সামন্তবাদবিরোধী। ‘মহেশে’র (১৯২৬) নায়ক গফুর আগে ছিল তাঁতি, এখন হয়েছে ভাগচাষি। (ব্রিটিশ শাসনের প্রত্যক্ষ ফল) এখন তাকে নানা রকমের খাজনা দিতে হয়, এবং না দিতে পারলে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হয়। গ্রীষ্মের খরা পড়ায় গ্রামটিতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। পানীয়জলের ভীষণ অভাব। ব্রাহ্মণশাসিত ছোট্ট গ্রামটিতে গফুর ও তার মাতৃহীন কন্যা আমেনা একটি মুসলমান পরিবার। জল সংগ্রহের সময় পাছে অন্যদের অপবিত্র করে ফেলে এই ভয়ে আমেনাকে গা বাঁচিয়ে চলতে হয়। অতিকষ্টে সেদিন সে এক কলস জল সংগ্রহ করেছিল। গফুরের তৃষিত বৃদ্ধ ষাঁড় মহেশ, যাকে সে সন্তানের মতো আদর যতœ করে এবং উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে জানে, সেই মহেশ জলপিপাসায় ছিল অত্যন্ত কাতর। আমেনার কলসিতে মুখ দিতে গিয়ে মহেশ সেটা ভেঙে ফেলে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য গফুর তার লাঙলের ফালটি নিয়ে এসে মহেশকে আঘাত করে। মহেশ মারা যায়। হতভাগ্য গফুরের জন্য এবার আসে গো-হত্যার অপরাধে প্রায়শ্চিত্ত করবার পালা। শেষ রাতে গফুর মেয়েকে নিয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। গন্তব্য চটকল। যেখানে মেয়েদের আব্রু থাকবে না বলে সে জানে। জমিদারি শোষণই তাকে বাস্তুচ্যুত করল, এবং ঠেলে দিল কারখানার দিকে। শেয়ালের হাত থেকে বের হয়ে গিয়ে বাপ ও মেয়ে এবার পড়বে গিয়ে নেকড়ের খপ্পরে। গল্পটি সামন্তবাদের চরিত্র-উন্মোচন করে দেয়। জমিদারি ব্যবস্থার প্রতি ধিক্কার হিসেবে এ গল্প অসাধারণ। ‘অভাগীর স্বর্গে’ (১৯২২) জমিদার নিজে অনুপস্থিত, তবে তার গোমস্তা আছে, আছে হিন্দুস্তানি পাইক, তারাই যথেষ্ট। আসলে তারা জমিদারের চেয়েও পরাক্রমশীল। জমিদারের প্রজা অভাগী মেয়েটি জন্মদুঃখী সব দিক দিয়েই সে নিঃস্ব। স্বামী চলে গেছে অন্যগ্রামে, সেখানে বিয়ে করেছে, ঘরসংসার পেতেছে। অভাগী আছে, আর আছে তার বালকপুত্র কাঙালী। গ্রামের ঠাকুরদাস মুখুয্যে অত্যন্ত সঙ্গতিপন্ন; সে ধানের কারবার করে। বৃদ্ধ ঠাকুরদাসের স্ত্রী মারা গেছে। ধুমধাম করে তাকে দাহ করা হচ্ছে। দূর থেকে অভাগী দৃশ্যটা দেখল। নীচুজাতের মেয়ে, তাই দূরেই থেকেছে। নিজে সে অসুস্থ। দাহ করার দৃশ্যটি দেখে তার চোখে জল এসেছে, মুখুয্যের স্ত্রীর সৌভাগ্য কল্পনা করে। অভাগী দেখে মৃত মায়ের মুখে আগুন দিচ্ছে মায়ের পুত্র। অভাগীর স্বপ্ন সে মারা গেলে তার ছেলেও যেন অমনি করে তার মুখে আগুন দেয়; তাহলে সেও পাবে স্বর্গে যাবার অধিকার। শ্মশানঘাট থেকে ফিরে অভাগী জ্বরে পড়ল। সে মরণাপন্ন হলো। ছেলেকে বলল তার স্বপ্নের কথা। আর বলল ছেলে যেন তার বাবাকে ডেকে আনে, যাতে স্বামীর পদধুলি নিয়ে মরতে পারে। অভাগীর স্বামী যখন এলো তখন অভাগীর জ্ঞান নেই। ছেলের হাতে মুখাগ্নি লাভের সখের কথা শুনে ছেলের পিতা রসিক বাড়ির একটা বেল গাছ কাটতে গেছে, অমনি জমিদারের হিন্দুস্তানি দারোয়ান এসে হাজির। গাছ কাটতে হলে জমিদারকে টাকা দিতে হবে। যারা উপস্থিত ছিল তারা কেউই ‘অস্বীকার করিল না যে বিনা অনুমতিতে রসিকের গাছ কাটিতে যাওয়াটা ভাল হয় নাই। তাহারাই আবার দেওয়ানজীর হাত-পায়ে পড়িতে লাগিল তিনি অনুগ্রহ করিয়া যেন একটা হুকুম দেন।’ অনুমতির জন্য কাঙালী গেছে জমিদারের গোমস্তার কাছে। গিয়ে গলাধাক্কা পেয়েছে। এর পর গেল ঠাকুরদাসের কাছে, কাঠ ভিক্ষা চাইতে। ঠাকুরদাস কাঠ দেবে কি করে, স্ত্রীর শ্রাদ্ধের জন্য তার কত কাঠ দরকার। ঠাকুরদাসের ছেলে মন্তব্য করল, ‘সব ব্যাটাই এখন বামুন কায়েত হতে চায়।’ শেষ পর্যন্ত নদীর চরে গর্ত খুঁড়ে অভাগীকে শোয়ানো হলো। প্রতিবেশী রাখালের মা কাঙালীর হাতে একটি খড়ের আঁটি জ্বালিয়ে দিয়ে হাত ধরে মায়ের মুখ স্পর্শ করিয়ে দিল। এরপর সকলে মিলে মাটি চাপা দিয়ে স্বপ্নসহ ‘কাঙালীর মায়ের শেষ চিহ্ন বিলুপ্ত করিয়া দিল।’ অভাগীকে যে বোঝাটা বহন করতে হয়েছে সেটা সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সামন্তবাদের। সঙ্গে আছে পিতৃতান্ত্রিকতা। অভাগীরা লুপ্ত হয়, কিন্তু বিলুপ্ত হয় না, কেননা সামন্তবাদী ব্যবস্থার পক্ষে তারা অত্যাবশ্যকীয়। এটা অবশ্য তাৎপর্যহীন নয় যে, ‘মহেশ’ গল্পের জমিদারিটির আয়তন ছোট এবং ‘অভাগীর স্বর্গে’র জমিদার অনুপস্থিত, প্রতাপ সেখানে জমিদার-গোমস্তার। ছোট জমিদার ও তাদের কর্মচারীরাই অধিক অত্যাচারী, বড় জমিদাররা তুলনামূলকভাবে ভালো, এরকম একটা কথা বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ প্রবন্ধে আছে। শরৎচন্দ্রের গল্প দু’টিতে সে-বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যাবে।

৩. সামন্তবাদ মানুষের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়; এমনকি ভদ্রলোকদেরও সে অব্যাহতি দেয় না। একটি ভালো দৃষ্টান্ত পাওয়া যাবে ‘বামুনের মেয়ে’ (১৯২০) উপন্যাসে। এর কাহিনিতে নায়ক-নায়িকা অরুণ ও সন্ধ্যা। দু’জনেই ভদ্র পরিবারের সন্তান। তাদের বিয়ে হওয়াটা ছিল প্রত্যাশিত ও স্বাভাবিক। কিন্তু হলো না। বংশপরিচয়ে অরুণ যথেষ্ট কুলীন নয়, ওদিকে সন্ধ্যা খাঁটি ব্রাহ্মণ। এ কারণে দু’জনের মেলামেশার ব্যাপারে সন্ধ্যার কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারের আপত্তি ছিল। সন্ধ্যার কিছুটা নাকউঁচু ভাব ছিল, বামুনের মেয়ে বলে। অরুণ খুবই যোগ্য পাত্র। সন্ধ্যার পিতামহীর বিবেচনায় সোনার চাঁদ ছেলে। সে বিলেত গেছে, কৃষিবিদ্যায় শিক্ষা নিয়ে ফিরে এসেছে। গ্রামে থাকে। অবসর সময়ে বই পড়ে। গানবাজনা করে। দুস্থজনকে আশ্রয় দেয়। ওদিকে গ্রামবাসী সকলের মতে রূপ ও গুণে সন্ধ্যা একটি যথার্থ প্রতিমা। কিন্তু কুলীন মেয়ের কি করে বিয়ে হয় অকুলীনের সঙ্গে? শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যার বিয়ে ঠিক হয়েছে অপদার্থ এক ব্রাহ্মণ সন্তানের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের লগ্ন মুহূর্তে প্রকাশ পেল যে সন্ধ্যার পিতা ব্রাহ্মণ নয়, নাপিতের সন্তান। সন্ধ্যার পিতামহের শতাধিক ‘স্ত্রী’ ছিল। সেকালে কুলীনদের ওরকম থাকত। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ সকল স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে পারত না। তার বদলে একজন নাপিতকে পাঠাতো স্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে টাকা পয়সা ও জামা-কাপড় সংগ্রহ করতে। এই রকম যোগাযোগেই নাকি সন্ধ্যার পিতার জন্ম। খবরটা ফাঁস হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বিয়ের আসর থেকে পাত্রপক্ষ উঠে চলে গেল। লগ্ন পার হয়ে গেল, অথচ বিয়ে হলো না, এর অর্থ দাঁড়াবে সন্ধ্যার আর কোনোদিন বিয়েই হবে না। বিপন্ন সন্ধ্যা চলে এসেছিল অরুণের বাড়িতে। অরুণ সম্মত হলে সমস্যার সমাধান হতো, সন্ধ্যার সঙ্গে তার কাক্সিক্ষত বিবাহ সম্পন্ন হয়ে যেত। কিন্তু অরুণ পারলো না। পারলো না উঠে দাঁড়াতে। তার মধ্যে দেখা দিল দ্বিধা। বোঝা গেল মেরুদণ্ডে জোর নেই। সন্ধ্যা ফিরে গেছে। গ্রামের টাকাওয়ালা এক দুর্বৃত্ত, গোলক চাটুয্যে, যে ব্যবসায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকায় ছাগল চালান দেয়, বিপতœীক সেই ব্যক্তি, সন্ধ্যার মাতামহ হবার জন্য যে উপযুক্ত, সন্ধ্যাকে সে বিয়ে করতে চায়। সন্ধ্যার বাবার কোনো আয়-উপার্জন নেই। লোকটি ‘নিরীহ, নির্বিরোধ, পরদুঃখকাতর অল্পবুদ্ধির’ একজন মানুষ। সন্ধ্যা ঠিক করেছে গ্রামে আর থাকবে না, বাবাকে নিয়ে চলে যাবে বৃন্দাবনে। শেষ মুহূর্তে অরুণ কিছুটা সাহসী হয়ে উঠেছিল দেখা যায়। সে বলেছে যে তার দ্বিধা কেটে গেছে। মনে হয়েছিল সে সঙ্গী হবে সন্ধ্যার। সেটা সে করতে পারতো। তার জন্য অর্থনৈতিক কোনো সমস্যা ছিল না, সঙ্গে ছিল বিলাতী ডিগ্রি; গ্রামে না হোক শহরে গিয়ে থাকা মোটেই কঠিন হতো না। কিন্তু সন্ধ্যা আস্থা রাখতে পারেনি তার ওপরে। সঙ্গে যাবে, এমনটা বলায় সন্ধ্যা অরুণকে বারণ করেছে। বলেছে, ‘না, অরুণদা আমাদের সঙ্গে আসতে পারবে না, তুমি যাও।’ অরুণ নিবৃত্ত হয়েছে, জোর দিয়ে যদি বলতো, না, আমি যাবই, তাহলে সন্ধ্যা রাজি হতো বলেই আমাদের অনুমান। অরুণকে সন্ধ্যা বলেছে, ‘মেয়েমানুষের বিয়ে করা ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো কাজ আছে কিনা আমি সেইটে জানতে বাবার সঙ্গে যাচ্ছি।’ বাবার সঙ্গে যাচ্ছে না, আসলে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিয়ে করাটাও তো একটা কাজ বটে, ফেলে দেওয়ার মতো কাজ নয়। সন্ধ্যার জীবনে সেটা ঘটলো না, কারণ অরুণের মেরুদণ্ড দুর্বল। শরৎচন্দ্র পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সমর্থন করেন, সন্ধ্যার পিতার মতো শরৎচন্দ্রের নিজের পিতাও সাংসারিক জীবনে সাফল্যের পরিচয় দিতে পারেননি; কিন্তু তাই বলে পিতার বিরুদ্ধে তাঁর যে ভীষণ একটা অভিযোগ ছিল তা নয়। অভিযোগ সন্ধ্যারও নেই। ওদিকে আবার অরুণকে যথেষ্ট পরিমাণে দৃঢ়চেতা হিসেবে যে দেখাবেন শরৎচন্দ্র এটাও করতে পারছেন না। করতে গেলে সমাজ কাঠামোটাকে ধাক্কা দিতে হতো। সেটা তিনি দিতে চান না। তাঁর ভেতরে আছে মায়ের মমতাময় হৃদয়; সে-হৃদয় সমাজের নিষ্ঠুরতায় মর্মান্তিক ভাবে আহত হয়, কিন্তু সমাজ ভেঙে পড়–ক এটা চায় না। শরৎচন্দ্র সংস্কার চান, বিপ্লব চান না। অরুণের তুলনায় অনেক বেশি দৃঢ়চেতা রমেশ। রমেশ পল্লী-সমাজ (১৯১৬) উপন্যাসের নায়ক। তার মানবিক সমস্যাটাও বিবাহ নিয়েই। প্রতিবেশী রমা’র সঙ্গে রমেশের সম্পর্কটা অরুণের সঙ্গে সন্ধ্যার সম্পর্কের মতোই। ভালোবাসার। তারা প্রতিবেশী; বড় হয়েছে একই সঙ্গে। পারিবারিক যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ। বর্ণ বা শ্রেণিভেদ কোনোটাই নেই। উভয়েই সচ্ছল পরিবারের সন্তান। দুই পরিবারের একটা বিরোধ ছিল। রমেশের জ্যেঠতুত ভাই বেণী ঘোষালের ষড়যন্ত্র বিরোধটা উস্কানি পায়, এবং রমেশকে জেলে পর্যন্ত যেতে হয়। ব্যাপারটা এরকম চেহারা দেওয়া হয় যে রমার সাক্ষ্যদানের কারণেই আদালত রমেশকে জেলে পাঠিয়েছে। রমেশ ছয় মাস জেল খাটে। তবে বের হয়ে আসে সে নতুন সম্মান অর্জন করে। রমা যে দোষী নয় সেটাও তার জানা হয়ে যায়। তাহলে তাদের বিয়ে হবে না কেন? শরৎচন্দ্র বলবেন, এবং বলেছেনও, যে সমাজ সেটা চায়নি। চায়নি কেন? কারণ রমার একটা বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের অল্পপরেই তার স্বামী মারা যায়। সে বাল্যবিধবা কিন্তু বিধবা বিবাহ তো সেই বিদ্যাসাগরের আমল থেকেই চালু হয়ে গেছে। তাহলে অসুবিধাটা কোথায়? তদুপরি সমাজের তো এমন শক্তি ছিল না যে তাদেরকে একঘরে করে ফেলবে। তাদের গ্রামে রমেশের ও রমার পরিবারই সর্বময় কর্তা। তারাই জমিদার, অন্যরা হয় তাদের অনুগ্রহ ভোগী নয় তাদের প্রজা। তদুপরি ইচ্ছে করলে তো রমেশ রমাকে বিয়ে করে গ্রাম ছেড়ে চলেও যেতে পারে। সে বিলেত যায়নি ঠিকই, কিন্তু কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষা নিয়েছে। তার টাকার অভাব নেই, টাকা উপার্জনের ক্ষমতাও সে রাখে। ওদিকে রমাও তো বিস্তর বিষয় সম্পত্তির মালিক। অভাব নেই টাকার। তা হলে? আসলে শরৎচন্দ্রই চাননি বিয়েটা হোক। কারণ রমার বয়স যদিও অল্প এবং তাড়াহুড়ো করে দেয়া বিয়ের ছয় মাসের মধ্যেই যদিও তার স্বামীটি মারা গেছে, তবুও রমা তো একজন বাল্যবিধবাই। শরৎচন্দ্র তাঁর কোনো উপন্যাসেই বিধবাকে বিয়ে দেননি। কেন দেননি তা নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া যায়নি। পল্লী-সমাজে’র কাহিনি দাবি করে যে রমা ও রমেশের বিয়ে হবে। না-হবার কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য কারণই নেই। রমেশ তো অরুণের মতো দুর্বলচেতা নয়। সে জমিদার। বিত্তবান। সবচেয়ে বড় কথা সে সমাজ-সংস্কারক। গ্রামে এসেছে সে সমাজকে বদলাবে বলে। শিক্ষার ব্যবস্থা করবে, প্রজাদের বিপদে আপদে তাদের পাশে দাঁড়াবে। বদলে দেবে পুরাতন সম্পর্কগুলো। শারীরিকভাবেও সে অত্যন্ত সুস্থ ও সবল। আত্মরক্ষায় সে যখন লাঠি ধরে, পেশাদার লাঠিয়ালরা তখন প্রমাদ গোনে। রমেশ জেলে যায় নির্ভয়ে, বের হয়ে আসে সংবর্ধিত হতে। নিজের গ্রামের তো বটেই পাশের গ্রামের মুসলমানরাও তাকে নেতা বলে মানে। মসজিদে তার জন্য দোয়া করা হয়। তার কেন এই ব্যর্থতা? কারণটা রমেশের চরিত্রের ভেতরে নেই, বাইরে রয়েছে। সামন্তবাদ তাকে নত করতে পারতো না, যদি শরৎচন্দ্র তাঁর সাথে থাকতেন। শরৎচন্দ্র যে তাঁর সঙ্গে থাকতে পারেননি, তার একটা কারণ হতে পারে তাঁর ভয় ছিল জনপ্রিয়তা হারাবার। বিধবাবিবাহ তখনকার মধ্যবিত্ত পছন্দ করতো না। এ ব্যাপারে তারা ছিল পিতৃশাসিত। আরেকটা কারণ সম্ভবত এই যে, শরৎচন্দ্র নিজেই ছিলেন পিতৃতান্ত্রিকতার সমর্থক, এবং সামন্তবাদের সঙ্গে তার ছিল মমতার সম্পর্ক। হয়তো দুটো কারণই একসঙ্গে কাজ করেছে। ধারণা করা অন্যায় হবে না যে দ্বিতীয় কারণটাই ছিল প্রধান। তিনি যে মাপের লেখক তাতে রমেশ ও রমার বিয়ে হলে পাঠক হারাবেন এমন আশঙ্কা সঠিক ছিল না। পাঠক তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই থাকতো। হ্যাঁ, সাহিত্য বিয়োগান্ত পরিণতি পছন্দ করে! কিন্তু বিয়োগের পেছনে তো বিশ্বাসযোগ্য কারণ থাকা চাই। রমার রূপ যেমন গুণও তেমন, গুণই বরং বেশি। বাবা মা নেই, ভাইটা ছোট; সংসার রমাই চালায়, সম্পত্তির ব্যবস্থাপনা তারই দায়িত্ব, এবং সকল ক্ষেত্রেই সে একজন দক্ষ ও যথার্থ কর্ত্রী। নারী হিসেবে তার যোগ্যতার খুবই স্মরণীয় প্রমাণ দেয় সে তারেকশ্বরের মন্দিরে, যেখানে রমেশকে পেয়ে সে সামনে বসে অত্যন্ত যতœ করে খাওয়ায়। সামন্তবাদী সংস্কৃতিতে ওই কাজটা খুবই জরুরি। খাবার রান্না করা ও পরিবেশন করা দুটোই মেয়েদের জন্য বড় একটা পরীক্ষা। শরৎচন্দ্রের নায়িকাদের সকলেই ওই পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়। নিয়ম এটাই। যারা পারে না তারা নিতান্তই অযোগ্য। তারকেশ্বরের ভাড়া-করা আবাসে রমা যেভাবে রমেশকে আপ্যায়ন করে, সামনে বসে খাওয়ায়, অথচ নিজে খায় না, তা রমেশকে অনির্বচনীয় রূপে অভিভূত করে। তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়াটা লক্ষণীয়। ‘বাড়ী ফিরিয়া সারারাত্রি তাহার ঘুম হইল না, সে যে তারকেশ্বরের সম্মুখে বসিয়া খাওয়াইয়াছিল নিরন্তর তাহাই চোখের উপর ভাসিয়া বেড়াইতে লাগিল এবং যতই মনে হইতে লাগিল, সেই সুন্দর সুকুমার দেহের মধ্যে এত মায়া এবং এত তেজ কি করিয়া এমন স্বচ্ছন্দে শান্ত হইয়া ছিল ততই তার চোখের জলে সমস্ত মুখ ভাসিয়া যাইতে লাগিল।’ রূপ ও গুণ ছাড়া আরও একটি দিক আছে রমার। জ্যাঠাইমা যা দেখতে পেয়েছেন। সেটা হলো ‘বড় একটা প্রাণ’। কিন্তু এই প্রাণ প্রকাশ পাবে কী করে? কী করে ঘটবে এর অভিব্যক্তি? না, অন্য কোনো সুযোগ নেই, ওই খাওয়ানো ছাড়া। রমা ওই সুযোগের চমৎকার সদ্ব্যবহার করেছে, তারকেশ্বরে রমেশকে একা পেয়ে। আর আছে প্রণাম করা, পদধূলি নেওয়া। রমা যখন জন্মের মতো বিদায় নিচ্ছে রমেশের কাছ থেকে, তখন রমেশকে সে প্রণাম করে। একবার নয় দু’বার। একবার প্রকাশ্যে, ‘মাথা হেট হইয়া মাটিতে ঠেকাইয়া।’ দ্বিতীয়বার নিঃশব্দে, দূর থেকে। প্রণাম রমেশও করে। বিদায় মুহূর্তে জ্যাঠাইমাকে। কোনোমতে হাতবাড়িয়ে তাঁর পায়ের ধুলো নিয়ে দ্রুত ছুটে বের হয়ে যায়। উপন্যাসের সমাপ্তি ওই প্রস্থানে। পল্লী-সমাজের মূল ব্যাপারটা সামাজিক; কিন্তু রাজনীতি যে অনুপস্থিত এমন নয়। সবচেয়ে মারাত্মক ছিল যে রাজনীতি, নাম যার সাম্প্রদায়িকতা, সেটাও দেখা দিয়েছিল। রমেশ উদারনৈতিক মানুষ, পার্শ্ববর্তী গ্রামের মুসলমান প্রজাদের সাথে স্বচ্ছন্দে ওঠাবসা করে, তারা তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে, রমেশও মুসলমান সমাজের ভেতর ঐক্য দেখে সন্তুষ্ট হয়। কিন্তু একটি ব্যাপার তাকে উদ্বিগ্ন করে তোলে, সেটি হচ্ছে মুসলমানদের সংখ্যাবৃদ্ধি। যে জ্যাঠাইমা’কে সে পথপ্রদর্শক হিসাবে মানে তার কাছে সমস্যাটাকে সে উত্থাপন করে এই ভাবেÑ

এই যে মানুষ গণনা করার একটা নিয়ম আছে, তার ফলাফলটা যদি পড়ে দেখতে জ্যাঠাইমা তা হলে ভয় পেয়ে যেতে। মানুষকে ছোট করে অপমান করার ফল হাতে হাতে টের পেতে! দেখতে পেতে কেমন করে হিন্দুরা প্রতিদিন কমে আসছে এবং মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে উঠছে। তবু হিন্দুর হুঁস হয় না।

এখানে এসে রমেশ ধরা পড়ে যায়। দেখা যায় হিন্দু মুসলমান সকলের সাধারণ ও সমমানের দুর্দশা নিয়ে ভাবনাকে স্থগিত করে দিয়ে সাম্প্রদায়িক চিন্তার অনুপ্রবেশের জন্য সে পথ করে দিচ্ছে। যতই উদার, উচ্চশিক্ষিত এবং মানুষের মঙ্গলকামী হোক না কেন রমেশের ভেতর একটা সাম্প্রদায়িকতা আছে; সে গণতান্ত্রিক হতে পারছে না, সামন্ততান্ত্রিক রয়ে গেছে। মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তিত হচ্ছে। রমেশের এই ভয়টা কয়েক যুগ আগে স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ করেন তাঁর ‘বহুবিবাহ’ নামের প্রবন্ধটিতে। বঙ্কিমচন্দ্রের ওই দুশ্চিন্তায় সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ ছিল পরবর্তীতে তা বিষবৃক্ষতে পরিণত হয়, এবং ১৯৪৭-এর দেশভাগ নিশ্চিত করে। রমেশ দেখা যাচ্ছে ওই রাজনীতিকেই লালন করছে। ঘটনাটা ছোট মনে হলেও এর ভেতরকার বিপদটা যে ছোট ছিল না পরবর্তী ইতিহাসে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। রমেশের চিন্তার পেছনে শরৎচন্দ্র নিজে কি অনুপস্থিত ছিলেন? মনে হয় না। সামন্তবাদকে প্রশ্রয় দেওয়াটা সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়াচে রাজনৈতিক অসুখকে আশ্রয় দেওয়া থেকে খুব যে দূরবর্তী তা নয়। অত্যন্ত শক্ত মেরুদণ্ডের মানুষ শরৎচন্দ্রের সব্যসাচী। শিক্ষায় চিকিৎসক, দীক্ষায় বিপ্লবী। পথের দাবী (১৯২৬) উপন্যাসের ওই অসামান্য নায়কের আগমন রমেশের দশ বছর পরে। মধ্যবিত্ত স্বল্পপ্রাণ বঙ্গসন্তান অপূর্ব গেছে রেঙ্গুনে, ভাগ্যান্বেষণে। বন্দরে নেমেই দেখে পুলিশের ভীষণ তৎপরতা; তারা সব্যসাচীকে ধরবে। পুলিশের রণসজ্জা দেখে বাঙালি হিসেবে অপূর্বের ভারি গর্ব হয়েছে; তার চোখ ভিজে গেছে অশ্রুজলে। তা গর্ব করবার ব্যাপার বৈকি। সব্যসাচী একজন বিপ্লবী, সরকারের জন্য মহা ত্রাস, পরাধীন দেশের জন্য মস্ত ভরসা। সব্যসাচী রমেশের তুলনায় অনেক উঁচু মাপের মানুষ। রমেশ নেতা গ্রামবাসীদের, সব্যসাচী নেতা সশস্ত্র বিপ্লবীদের। রমেশ সংস্কারপন্থি, সব্যসাচী বিপ্লববাদী। তিনি গান্ধীবাদী নন, আবার ব্যক্তিগত সন্ত্রাসে যে মুক্তি আসবে তাও মনে করেন না। তিনি সশস্ত্র বিপ্লবীদের গোপন সংগঠন গড়ার ওপর আস্থাশীল। আর সেই কাজই করছেন, অসামান্য সাংগঠনিক শক্তির সাহায্যে। নিজের বিপ্লবী অবস্থান সম্পর্কে তাঁর উক্তিগুলো উদ্দীপ্ত ও উদ্দীপক। যেমন,

১. আমি বিপ্লবী। আমার মায়া নেই, দয়া নেইÑ পাপপুণ্য আমার কাছে মিথ্যা পরিহাস। ওইসব ভালো কাজ আমার কাছে ছেলেখেলা। ভারতের স্বাধীনতা, ওই আমার ভাল, ওই আমার মন্দÑএছাড়া এ জীবনে আমার কোথাও কিছু নেই। ২. শান্তি! শান্তি! শুনে শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। [...] বঞ্চিত, পীড়িত, নরনারীর কানে অবিশ্রান্ত এই মন্ত্র জপ করে তাদের এমন করে তুলেছে যে তারাই অশান্তির নামে চমকে উঠে ভাবে এ বুঝি পাপ, এ বুঝি অমঙ্গল। ৩. সমস্ত ধর্মই মিথ্যা, আদিম দিনের কুসংস্কার। বিশ্বমানবতার এত বড় পরম শত্রু আর নেই। ৪. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকেই নিরতিশয় পবিত্র জ্ঞান করে কারা আঁকড়ে ধরে থাকতে চায় জানো? জমিদার।

এমন চমকপ্রদ উক্তি বোধ করি সে-কালের কোনো রাজনীতিবিদ উচ্চারণ করেননিÑ না জনসভায়, না সাহিত্যে। খুবই স্বাভাবিক ছিল ইংরেজ শাসক এমন বক্তব্য সহ্য করবে না। বইটিকে তারা দ্রুতবেগে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তাতে ফল হয়েছে উল্টো। এর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। গোপনে প্রচার হয়েছে। বিপ্লবীরা হাতেলেখা কপি তৈরি করে নিজেদের মধ্যে বিতরণ করেছে। এমনকি কমিউনিস্ট বিপ্লবীরাও পথের দাবী’কে মনে করতেন তাঁদের জন্য গীতা। বাংলার বিপ্লবীদের বুকের কাছে ছিলেন শরৎচন্দ্র। বিপ্লবীদের অনেকের কাছেই সব্যসাচী ছিলেন পথপ্রদর্শক। আর সেই ঘটনার ভেতরই একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে ভারতবর্ষে বিপ্লব কেন ঘটেনি তার। রাশিয়া ও চীনে বিপ্লব ঘটেছে, কেননা ‘গীতা’ হিসেবে সেখানকার বিপ্লবীরা পথের দাবী’কে পাননি, পেয়েছেন মার্কস-এঙ্গেলসের রচনাকে। আড়ম্বরের অন্তরালে সব্যসাচীর বিপ্লবের আসল চরিত্রটা কি? সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক। ব্রিটিশকে তাড়ানোর এই বিপ্লব সামাজিক বিপ্লব নয়, সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা এর লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য বরঞ্চ উল্টো; বিদ্যমান সামাজিক সম্পর্কের অন্তর্নিহিত শ্রেণিবৈষম্যটিকে রক্ষা করা। বিপ্লববিরোধী এই বিপ্লবকে সব্যসাচী বলছেন ‘আমার বিপ্লব’, অর্থাৎ ভদ্রলোকের বিপ্লব। খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী তরুণী ভারতী সব্যসাচীকে গুরু বলে মানে। সব্যসাচীকে সে জানে,; তাই সে বলে, ‘হৃদয় বলে কোনো বালাই যদি তোমার থাকে, সে শুধুু পড়ে আছে মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত ভদ্রজাতিকে নিয়ে।’ কথাটা মোটেই মিথ্য নয়। সব্যসাচী শিক্ষিত ভদ্র মধ্যবিত্তকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন। আর তার কারণ, তাঁর ভাষায়, ‘শিক্ষিত ভদ্রজাতির চেয়ে লাঞ্ছিত, অপমানিত, দুর্দশাগ্রস্ত সমাজ বাংলাদেশে নেই।’ অবিশ্বাস্য শোনাচ্ছে? কিন্তু সত্য। সব্যসাচী কৃষকের দুর্দশা, তার লাঞ্ছনা, তার অপমানের খবর রাখেন না, বা রাখতে চান না, এবং কৃষকের স্বাধীনতাহীনতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। ভদ্রলোকদের অবস্থাকে বরঞ্চ কৃষকের অবস্থার চেয়ে করুণ বলে ধারণা করেন। এর কারণটা বোঝা যায়। কারণ নিজে তিনি জমিদার হয়তো নন, কিন্তু যে ভদ্র শ্রেণির তিনি সদস্য, সেই ভদ্র শ্রেণির অনেকেই জমির মালিক, এবং সকলেই কোনো না কোনো ভাবে জমিদারি প্রথার সুবিধাভোগকারী। এক্ষেত্রে গ্রামের রমেশ ও রেঙ্গুনের সব্যসাচীর মধ্যে খুব যে দূরত্ব আছে তা নয়। সব্যসাচী ভদ্রশ্রেণির স্বার্থ দেখেন, তাদের মুক্তি চান; জমিদারি ব্যবস্থা ভেঙে গেলে এদের সমূহ বিপদ। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই পরিষ্কার উক্তি ‘আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি’Ñ এদের সকলের বুকের মধ্যেই আছে। সকলে বলেন না, সব্যসাচী বলেছেন। পথের দাবী উপন্যাসে কবি শশীপদ বলে একটি চরিত্র আছে। তিনি মনে হয় কৃষকের পক্ষে গান গাইতে চেয়েছেন। লোকটির অবস্থান অনেকটা কাজী নজরুল ইসলামের মতো। সব্যসাচী চান শশীপদ নিজের ‘ভ্রান্ত’ পথ ছেড়ে দিয়ে সব্যসাচীর পথে আসুন। অর্থাৎ পথবিচ্যুত হোন। ‘লাঙলধারী’ না হয়ে ভদ্রলোক বনে যান। স্মরণীয় যে নজরুল যে ‘লাঙলধারী’ সে-কথাটা নজরুল মোটেই লুকিয়ে রাখেন নি, সদম্ভে ঘোষণা করেছেন, ‘লাঙল’ নামে তিনি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করেছিলেন; কলকাতা শহরের বুকে পত্রিকার সাইনবোর্ডে আস্ত একটি লাঙল ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন। শশীপদ-নজরুলকে উদ্দেশ করে সব্যসাচী বলছেন, “তুমি আমার বিপ্লবের গান করো। যেখানে জন্মেচো, যেখানে মানুষ হয়েচো, শুধু তাদেরইÑসেই শিক্ষিত ভদ্রজাতির জন্যই।” কথাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ও সত্য-উন্মোচক। মুখে যতই যা বলুন, সব্যসাচীদের এবং তাঁর মতো বিপ্লবীদের জন্ম আসলে দেশে নয়, শ্রেণিতে। সেখানেই তাঁরা জন্মান এবং সেখানেই ‘মানুষ’ হয়ে থাকেন। ভদ্রশ্রেণিই তাঁদের জন্মভূমি ও লালনভূমি। এই শ্রেণির নিজস্ব দৃষ্টিতে ভদ্রলোকেরাই হচ্ছে দেশ, তারাই হচ্ছে জাতি। বিচলিত বোধ করে ভারতী সব্যসাচীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘তুমি জাত মানো? তোমার লক্ষ্যও সেই ভদ্রজাতির দিকে?’ জবাবে সব্যসাচী যা বলেছেন তা খুবই পরিষ্কার।

আমি তা বর্ণাশ্রমের কথা বলি নি, ভারতী, সেই জোর করা জাতিভেদের ইঙ্গিত ত’ আমি করি নি। সেই বৈষম্য আমার নেইÑ কিন্তু শিক্ষিত অশিক্ষিতের জাতিভেদ, সেই ত’ আমি না মেনে পারি নে। এই ত’ সত্যকারের জাতিÑ এই ত’ ভগবানের হাতে গড়া সৃষ্টি। ক্রীশ্চান বলে কি ঠেলে দিতে পেরেছি দিদি?

কথাগুলো খুবই আন্তরিক, তবে একেবারেই যুক্তিহীন। শিক্ষিত-অশিক্ষিতের যে ভেদের কথা বলছেন সব্যসাচী, সেটা তো আসলে শ্রেণিভেদের ভিন্ন নাম; কিন্তু এটা স্বয়ং ভগবান সৃষ্টি করেছেন, এমনটা বলবার পেছনে যুক্তিটা কী? যুক্তি নেই, তবে আবেগ আছে, এবং সে আবেগ শ্রেণিবিভাজনকে ঈশ্বর-প্রদত্ত ও পূজনীয় ব্যবস্থা বলে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। ‘বৈপ্লবিক’ অভিপ্রায় বৈকি! যতটা বৈপ্লবিক ততটাই নির্বোধ। কৃষককে সঙ্গে নেওয়া হবে না, কারণ কৃষক হচ্ছে অজ্ঞ মূর্খ ও বিপ্লববিরোধী। সব্যসাচীর মূল্যায়নটা এরকমের :

নিরীহ চাষাভুষোর জন্য তোমার চিন্তার প্রয়োজন নেই, ভারতী, কোন দেশেই তারা স্বাধীনতার কাজে যোগ দেয়? বরঞ্চ, বাধা দেয়। আমার কারবার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, ভদ্র সন্তানদের নিয়ে। কোনো দিন যদি আমার কাজে যোগ দিতে চাও, ভারতী, একথাটা ভুলো না। আইডিয়ার জন্য প্রাণ দিতে পারার প্রাণ, শান্তিপ্রিয়, নির্বিরোধী, নিরীহ কৃষকের কাছে আশা করা বৃথা। তারা স্বাধীনতা চায় না, শান্তি চায়, যে শান্তি অক্ষম, অশক্তের সেই জড়ত্বই তাদের ঢের বেশি কামনার বস্তু।

স্বরটা বিপ্লবী; সারবস্তুটা জাতীয়তাবাদী। বিপ্লবী বলেই সব্যসাচী কথাগুলো অমন উচ্চকণ্ঠে বলতে পেরেছেন। তবে একটু টোকা দিলেই টের পাওয়া যেত কৃষকের প্রতি এমন অবজ্ঞা জাতীয়তাবাদীরাও করে থাকেন। এক্ষেত্রে শান্তিবাদী ও সহিংসপন্থিদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। কৃষকের শ্রমকে তারা নির্দ্বিধায় ব্যবহার করে, এক ভাবে নয়, নানাভাবে; তাকে করুণাও করে থাকে, কিন্তু কৃষককে রাজনৈতিকভাবে সজাগ করবে এমনটা চায় না। ভয়, একবার জেগে উঠলে তারা আর তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকতে চাইবে না, গোটা ব্যবস্থাটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে। এরকমের বিপদ কোন মধ্যবিত্ত চাইবে আগ বাড়িয়ে ডেকে আনতে? বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিসম্পন্ন সব্যসাচী তো চাইতেই পারেন না। রমেশের মনে যে সাম্প্রদায়িক উদ্বেগটি দেখা দিয়েছিল আপাত দৃষ্টিতে সব্যসাচী তা থেকে মুক্ত। কিন্তু আসলেই কি মুক্ত? তাঁর জগতে খ্রিষ্টান ভারতীর স্থান আছে। খ্রিষ্টানরা সংখ্যায় অল্প, তারা কোনো সমস্যা নয়। তাছাড়া খ্রিষ্টান তরুণী ইংরেজ বিতাড়নের আন্দোলনে যে যোগ দিচ্ছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্য সেটা একটা অর্জন বৈকি। কিন্তু কোনো মুসলমান তো নেই। শশীপদ না হয় ছদ্মবেশেই রইলো, তাই বলে অন্যকোনো মুসলমানের উপস্থিতি কি সম্ভব ছিল না? ততদিনে তো তারা বাঙালি-জনসংখ্যার অর্ধেক নয়, তার চেয়েও বেশি হয়ে গেছে। আর ওই যে কৃষকের ব্যাপারে প্রচণ্ড অনীহা, তার পেছনে কি এই বাস্তবতাও কাজ করেছে না যে কৃষকদের অধিকাংশই মুসলমান? তাই কৃষক জেগে উঠলে সেটা হবে একটি অতিরিক্ত বিড়ম্বনা? এক ইংরেজকে নিয়েই পারা যাচ্ছে না, তার ওপর আবার কৃষককে ডেকে আনা! সব্যসাচীর দল শ্রমিকের কাছে যাবে। তার প্রধান কারণ, শ্রমিকের জাগরণে বাঙালি মধ্যবিত্তের কোনো বিপদ ঘটবে না। কেন না কারখানার মালিক বাঙালি মধ্যবিত্ত নয়, মালিক হচ্ছে বিদেশিরা ও দেশি অবাঙালিরা। দ্বিতীয়ত, শ্রমিকের কাছে তারা যাবে অনেকটা ট্রেড ইউনিয়নের নেতার মতো, নিজেদের স্বার্থে, শ্রমিকের স্বার্থে নয়। কৃষক ও শ্রমিককে একসঙ্গে আন্দোলনে নিয়ে এসেছিলেন লেনিন ও মাও সেতুং, ফলে তাঁদের দেশে বিপ্লব ঘটেছে। এনেছিলেন হো চি মিনও, যে জন্য ভিয়েতনামে বিপ্লব সম্ভব হয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী নেতারা ওই কাজটি করা থেকে বিরত থেকেছেন। যার পরিণতি যে কী সে তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। প্রকৃত বিপ্লব হচ্ছে সমাজবিপ্লব। কেবল সব্যসাচী বলে নয়, শরৎচন্দ্র নিজেও ওই বিপ্লবের বিরোধী। এই প্রশ্নে তিনিও জাতীয়তাবাদী এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। তাঁর কয়েকটি বক্তব্য স্মরণ করা যাক। ভূপেন্দ্রচন্দ্র রক্ষিত (১৯০১-৭২) ছিলেন একজন স্বদেশী বিপ্লবী। ঢাকার ছেলে। জেল খেটেছেন। ভূপেন্দ্র ‘বেণু’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের করতেন। পত্রিকাটি বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। ১৯২৯ সালে লিখিত একটি চিঠিতে শরৎচন্দ্র ওই তরুণকে পরামর্শ দিচ্ছেন,

একখানি মাসিক পত্রিকার তুমি সম্পাদক, পধঃপযড়িৎফং যেন তোমাকে না পেয়ে বসে। কারণ, একথা তোমার কিছুতেই ভোলা উচিত নয় যে, বিপ্লব আর বিদ্রোহ এক বস্তু নয়। কোথাও দেখচ কি বিপ্লব দিয়ে পরাধীন দেশ স্বাধীন হয়েচে? [...] বিপ্লব দিয়ে পরাধীন দেশকে স্বাধীন করা যায় বলে আমার মনে হয় না। তার কারণ কি জানো? বিপ্লবের মাঝে আছে পষধংং ধিৎ। আত্মকলহ ও গৃহবিবাদ দিয়ে আর যাই করা যাক, দেশের চরম শত্রুকে পরাভূত করা যাবে না। বিপ্লব ঐক্যের পরিপন্থী।

কোনো জাতীয়তাবাদী নেতাই এমন পরিষ্কারভাবে বিপ্লব-বিরোধিতাকে উপস্থিত করেন নি, শরৎচন্দ্র করেছেন। তবে তিনি জাতীয়তাবাদীদের মনের কথাটিই এখানে অকপটে প্রকাশ করেছেন। এককালের ঔপনিবেশিক দেশগুলোর দুর্ভাগ্য এই যে, সেখানে স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে জাতীয়তাবাদীরা, যার দরুন সেসব দেশে ক্ষমতার হস্তান্তর ঘটেছে, কিন্তু জনগণের মুক্তি আসেনি। আমরা বাংলাদেশের মানুষ তো একবার নয়, স্বাধীন হলাম দুই দুইবার, কিন্তু মুক্তি কোথায়? শুধু চিঠি তো নয়, ব্যক্তিগত আলাপচারিতাতেও শরৎচন্দ্র রক্ষণশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। রেঙ্গুনে এক বন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, ‘শেকল ছিঁড়তে বল? সর্বনাশ, এই শেকল ছিঁড়ে গেলে যে এক মুহূর্তে সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। [...] সেটা কি ভালো? কোটি কোটি মানুষ যেটাকে গভীর শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে, অন্তরের অনুভূতি দিয়ে পরখ করে নিয়ে মেনে চলেছে, বলতে চাও সেটা খুব খারাপ?’ [গোপাল চন্দ্র রায়, শরৎচন্দ্র, দ্বিতীয় খণ্ড, কলকাতা, ১৯৬৯, পৃ ৩৬৯] ‘সমাজ-ধর্ম্মের মূল্য’ নামের একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে,

প্রত্যেকেই স্বীকার করিয়েছেন আইন যতক্ষণ আইনÑ তা ভুলভ্রান্তি তাতে যতই থাকুক না, ততক্ষণ শিরোধার্য তাহাকে করিতেই হইবে। [...] সামাজিক আইনকানুন সম্বন্ধেও ঠিক একই কথা খাটে না কি? দেশের ব্রাহ্মণেরাই যদি সমাজতন্ত্র এযাবৎকাল পরিচালনা করিয়া থাকেন, ইহার মেরামতের কার্য তাহাদিগের দ্বারাই করাইয়া লইতে হইবে।

শরৎ-সাহিত্যে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটা কতটা জরুরি তা তাঁর পাঠক মাত্রেই জানেন। সাহিত্যিক লীলারাণী গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা এক চিঠিতে শরৎচন্দ্র বলছেন, ‘দিদি, আমি কোনোওকালে খাওয়া ছোঁয়ার বাছবিচার করিনে, কিন্তু ব্রাহ্মণ মেয়েদের হাতে আমি কোনোদিন কিছু খাইনে। শুধু খাই তাঁদের হাতে যাঁদের বাবা মা দু’জনেই ব্রাহ্মণ এবং বিয়েও হয়েছে ব্রাহ্মণের সঙ্গে।’ [গোপালচন্দ্র রায়, প্রাগুক্ত, তৃতীয় খণ্ড, পৃ ২১৩]

৪. সব্যসাচীর পরে এসেছে কমল, শেষ প্রশ্ন (১৯৩১) উপন্যাসের নায়িকা। তার মেরুদণ্ড অত্যন্ত শক্ত, চিন্তাধারায় সে বিপ্লবী। অনেক সামাজিক প্রশ্নের বিষয়ে সে পরিষ্কার বক্তব্য উপস্থাপন করে, এবং তার সকল বক্তব্যই প্রথাবিরোধী, এবং কোনোটাই অযৌক্তিক নয়। শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্যে বর্ণনার ভাষা অসাধারণ, সংলাপ বর্ণনার তুলনাতেও অনবদ্য। তাঁর লেখায় যে নাটকীয়তা রয়েছে তা কেবল ঘটনাগতই নয়, সংলাপগত। এমন সংলাপ উৎকৃষ্ট নাটকেই পাওয়া সম্ভব। কমলের সংলাপ শরৎসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণের মধ্যেই পড়ে। কথা প্রধানত কমলই বলে। অন্যরা তার জন্য বলবার সুযোগ তৈরি করে দেয়। তার কথাগুলো সব্যসাচীর মতো রাজনৈতিক নয়, তবে তাতে রাজনীতি যে নেই তা নয়, অবশ্যই আছে। কমল আসলে সব্যসাচীরই পরিবারভুক্ত, একই রকমের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, স্পষ্টবাদী ও অনমনীয়। যেন ভাইবোন। দু’জনে আবার একই রকমের অবিশ্বাস্য। বাংলার পরিবেশে তাদেরকে রাখা সম্ভব হয়নি, সব্যসাচীকে নিয়ে যেতে হয়েছে দূরবর্তী বার্মায়, কমলকে নিয়ে আসতে হয়েছে প্রাচীন শহর আগ্রাতে। তাতে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা যে বেড়েছে তা নয়। কারণ দু’জনের কেউই বিশ্বাসযোগ্য নয়; তাদের ব্যাপারে পাঠক যা করে তা হলো নিজের অবিশ্বাসের স্থগিতকরণ। সব্যসাচীর পক্ষে কলকাতায় থাকা ছিল অসম্ভব, পুলিশে ধরে ফেলতো। কলকাতায় কমলও সুবিধে করতে পারতো না। যে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানুষের সঙ্গে তার ওঠাবসা কলকাতায় থাকলে তাদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ সহজ হতো না, ভিড়ের কারণে। কমলের বাবা খাস ইংরেজ; কলকাতার ইংরেজপাড়ায় তার বাবার দুয়েকজন সহকর্মী বা পরিচিতজন না থাকাটা হতো বাস্তব-অসম্মত; তারা সাহেবের মেয়েটির বাঙালি সাজাতে যে আপত্তি করতো না সে-ব্যাপারেই বা নিশ্চয়তা কোথায়? আপেক্ষিকভাবে সব্যসাচীকে বার্মাতেই মানায়, কমলকে যেমন মানায় আগ্রাতে। কমলের বক্তব্যগুলো যেন শত্রুপক্ষের। আগ্রা শহরের বাঙালি সমাজের প্রায় সকল সদস্যই তার বিরুদ্ধপক্ষ। সে তাদের প্রতিপক্ষ। তাদের ধ্যান-ধারণা ও মানসিক অভ্যাস পুরনো ধাঁচের ও রকমের। সেগুলো বিলক্ষণ সামন্তবাদ-প্রভাবিত, কখনো কখনো সামন্তবাদ-শাসিত। কমলের মূল বিরোধিতা আশুবাবুর সঙ্গে; যিনি মস্ত জমিদার। বিপুল পরিমাণ পৈত্রিক উত্তরাধিকারের ‘শান্ত আনন্দে’ উদ্ভাসিত এই বুড়ো মানুষটির জমিদারি-নির্ভরতা সম্পূর্ণ বৈধ। আয় আসে নায়েব-গোমস্তাদের হাত হয়ে। প্রজাপীড়ন যা করবার তারাই করে থাকে। ওসব নোংরামি তাঁকে স্পর্শ করে না। খবরও রাখেন না। তিনি তাঁর সাড়ে তিন মণ দেহ ও বাতরোগের ভার বহন করে মজলিসি ও বিলাসী জীবনযাপন করেন। তাঁর প্রজারা তো থাকে বাংলায়; তাঁর যাতায়াত বিলেতে; সেখানেই প্রতিপালিত হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত আগ্রা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন, একমাত্র কন্যাটির বিশ্বাসঘাতকায়; যাবেন ফিরে বিলেতেই। বিলেতের কথা যথেষ্ট পরিমাণে বলেন, বাংলার কথা ভুলেও উচ্চারণ করেন না। তিনি জাতীয়তাবাদী। সে জাতীয়তাবাদী বাঙালি নয়, ভারতীয়; তাঁর নির্ভরতা ভবিষ্যতের ওপর নয়, অতীতের ওপর। বর্তমানের পরাধীনতা ও কৃষকের দুর্দশা নিয়ে তাঁর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। অতীতকে আদর্শায়িত করতে গিয়ে তাঁর চোখ বাষ্পাকুল হয়ে ওঠে; সন্তানতুল্য অজিতকে তিনি জানান, ‘তপোবনের যে-আদর্শ কেবল আমাদেরই ছিল, পৃথিবী খুঁজলেও আর কোথায় তার জোড়া মিলবে, অজিত?’ অজিতের জবাব দরকার হয় না। সেও একই পথের যাত্রী। ভারতীয় চিন্তানায়কদের কথা স্মরণ করে আশুবাবু বলেন,

বিলেতের সমস্তই স্বচক্ষে দেখে এসেছি, এখন ভাবি, সময়ে সে সতর্কবাণী যদি না তাঁরা উচ্চারণ করে যেতেন আজ দেশের কী হতো।

একথা বলে তিনি স্বর্গত মনীষীগণের উদ্দেশে নমস্কার করেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, যাঁদের কথা তিনি বলছেন তাঁরা রামমোহনপন্থি ছিলেন না ছিলেন না ইয়াং বেঙ্গলও; ছিলেন রক্ষণশীল, ‘ধর্মসভা’পন্থি। সব্যসাচীর লড়াইটা ছিল ইংরেজের বিরুদ্ধে; ইংরেজতনয়া কমলের লড়াইটা সামন্তবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। তবে সব্যসাচীর লড়াইটা যেমন আপসহীন, কমলেরটা তেমন নয়। কমলের যুদ্ধ শেষ হয় আত্মসমর্পণে। আত্মসমর্পণ করে সে সামন্তবাদের কাছেই। কাহিনির শেষ দৃশ্যে দেখা যায় : ‘আশুবাবু গাড়িতে উঠিলে কমল হিন্দু-রীতিতে পায়ের ধুলা লইয়া প্রণাম করিল।’ কেবল প্রণাম নয়, পদধূলিসহ প্রণাম, এবং তা হিন্দু-রীতিতে। জবাবে, ‘তিনি মাথায় হাত রাখিয়া আর একবার আশীর্বাদ করিলেন।’ আত্মসমর্পণ পিতার কাছে কন্যার। সমস্ত আধুনিকতার অন্তরালে কমল দৃঢ়রূপে পিতৃতান্ত্রিক। নিজের মৃত পিতাকে সে যতভাবে পারে আদর্শায়িত করে, এবং আশুবাবুর মধ্যে একজন পিতাকে খুঁজে পেয়ে আশ্বস্ত হয়। অজিতও আশুবাবুর মতোই প্রাচীন ভারতের মহত্ত্বে বিশ্বাস করে। কমল তাকেই শেষ পর্যন্ত জীবনযাপনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। তাতে সামন্তবাদের মহত্ত্ব বাড়ে, এবং শরৎচন্দ্র খুশি হন। এই ব্যাপারটা আমরা আবার ফিরে আসবো, তার আগে বিতার্কিক হিসেবে কমলের অবস্থান ও দক্ষতা কিছু দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। আশুবাবু বলেছেন, কমলকে,

হিন্দু-সভ্যতার তোমার পরিচয় থাকলে আজ হয়তো বুঝিয়ে দিতে পারতুম যে ত্যাগ ও বিসর্জ্জনের দীক্ষায় সিদ্ধি লাভ করাই আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা এবং এই পথ ধরেই আমাদের কত বিধবা মেয়েই একদিন জীবনের সর্বোত্তম সার্থকতা উপলব্ধি করে গেছেন।

জবাবে কমল যা করেছে তা অত্যন্ত প্রত্যাশিত। কারণ কমল খুবই বুদ্ধিমতী। বস্তুত আগ্রার ওই বিদগ্ধ বাঙালি সমাজে বুদ্ধিতে তার সঙ্গে তুলনীয় দ্বিতীয়টি নেই। একে একে সকলেই তার কাছে পরাজিত হয়। দুর্গ ছেড়ে দিয়ে পালায়। আশুবাবুর ওই আবেগাপ্লুত বক্তৃতায় কমলের প্রতিক্রিয়াটা এরকম :

কমল হেসে বললে, করতে দেখেচেন? একটা নাম করুন তো।

বালাবাহুল্য আশুবাবু একজনও ‘সফল’ বিধবার নাম করতে পারেন নি। কমলের প্রশ্ন শুনে তিনি রীতিমতো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছেন। তার মাথাটা, আশুবাবুর নিজের ভাষাতেই, ‘গুলিয়ে গেল।’ গুলাবারই কথা, শাক দিয়ে তবু মাছ ঢাকা যায়, বাগাড়ম্বর দিয়ে তো সত্যকে গোপন করা যায় না। বিয়ে জিনিসটাকে কমল প্রয়োজনীয় বলে জানে। কিন্তু সেটাকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে ধরে নিতে সে রাজি নয়। এটা কোনো বিপ্লবীর অবস্থান নয়। কিন্তু যে-মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে কমল তার ওই অবস্থানটিকে ব্যক্ত করছে সেখানে আধুনিক শিক্ষাদীক্ষার অন্তরালে রক্ষণশীলতাটা বেশ গভীর। আশুবাবু তাঁর মেয়েটি অযোগ্য এক পাত্রকে বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছে দেখে রাগে, অভিমানে, হতাশায় যখন প্রায় ভেঙে পড়ছেন, কমল তখন তাঁকে প্রবোধ দেয় :

সংসারে অনেক ঘটনার মধ্যে বিবাহও একটা ঘটনা, তার বেশি নয়; ওটাকেই নারীর সর্বস্ব বলে যেদিন মেনে নিয়েছেন, সেদিনই শুরু হয়েছে মেয়েদের জীবনের সবচেয়ে ট্র্যাজেডি।

অজিত বিলাতফেরত ইঞ্জিনিয়ার। মোটরগাড়ি চালায় নিজে, মেরামত করে নিজের হাতে। কিন্তু সে সাত্ত্বিক সন্ন্যাসীগোছের মানুষ, মাছ-মাংস স্পর্শ করে না। বিলেত থেকে আগ্রা আসার পথে কাশী হয়ে এসেছে। কমলের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ আগ্রাতে, তাজমহলের নিচে। আলোচনা স্বভাবতই চলছিল সম্রাট শাহজাহানের অমর প্রেম নিয়ে। কমলকে সবাই উপেক্ষা করছিল। তার ‘স্বামী’ শিবনাথের কাছ থেকে তারা শুনেছে কমল অশিক্ষিত, বিধবা এবং দাসীকন্যা, কিন্তু মোগল সম্রাট সম্পর্কে কমলের মন্তব্য শুনে ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলাদের পক্ষে চমকে না উঠে উপায় ছিল না। তাজমহলের কথা বলতে গিয়ে আশুবাবু বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েছিলেন। সেটা তিনি প্রায়শই হয়ে থাকেন। শাহজাহান সম্পর্কে আশুবাবু বলছিলেন,

বিশেষজ্ঞ তো নয়ইÑসৌন্দর্য্যতত্ত্বের গোড়ার কথাটুকুও জানে সে। সেদিক দিয়ে আমি একে দেখিওনে কমল। আমি দেখি সম্রাট শাজাহানকে। আমি দেখি তাঁর অপরিসীম ব্যথা যেন পাথরের অঙ্গে অঙ্গে মাখান। আমি দেখি তাঁর একনিষ্ঠ পতœীপ্রেম, যা এই মর্ম্মর কাব্যের সৃষ্টি করে চিরদিনের জন্য তাঁকে বিশ্বের কাছে অমর করেচে।

আশুবাবুর উচ্ছ্বাসটা খুবই স্বাভাবিক। নিজে তিনি বিপতœীক; দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি; নিজের মনের ভেতর পতœীর স্মৃতিকে ধরে ও জাগিয়ে রেখেছেন। তাঁর গৃহের বহুস্থানে তাঁর প্রয়াত স্ত্রীর ছবি দৃশ্যমান। কিন্তু কমলের কোনো মোহ নেই, সে বাস্তববাদী। তাই দেখা গেল,

কমল অত্যন্ত সহজ কণ্ঠে তাঁহার মুখের প্রতি চাহিয়া কহিল কিন্তু তাঁর ত’ শুনেচি আরও অনেক বেগম ছিল। সম্রাট মমতাজকে যেমন ভালবাসতেন, তেমন আরও দুশজনকে বাসতেন। হয়ত বেশি হতে পারে, কিন্তু একনিষ্ঠ প্রেম তাকে বলা যায় না আশুবাবু। সে তাঁর ছিল না। এমন ভয়ানক একটি মন্তব্যে সবাই চমকে উঠেছে, কিন্তু কেউই উত্তর খুঁজে পায়নি। কমল আরও বলেছে,

নিষ্ঠার মূল্য যে নেই তা আমি বলিনে, কিন্তু যে মূল্য যুগ যুগ ধরে লোকে তাকে দিয়ে আসচে সেও তার প্রাপ্য নয়। একদিন যাকে ভালোবেসেচি কোন কারণেই আর তার পরিবর্তন হবার জো নেই, মনের এই অচল অনড় জড়ধর্ম সুস্থও নয়, সুন্দরও নয়।

এ ধরনের কথা শুনতে কেউ প্রস্তুত ছিল না, বিশেষ করে সেটি একটি মেয়ের মুখ থেকে আসছে দেখে বক্তাকে তাদের খুবই নির্লজ্জ বলে মনে হয়েছে স্বভাবতই। অজিতের প্রতিক্রিয়াটি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। শরৎচন্দ্রের ভাষায়, ‘অজিতের চক্ষু দিয়া যেন অগ্নি ঝরিয়া পড়িতেছে।’ মনে হবে ঘৃণায়। কিন্তু ঔপন্যাসিক জানেন যে তাতে অন্যকিছুর মিশাল যে ছিল না তা নয়। কারণ কমল অসামান্য রূপসী। কারও বর্ণনায় শিশির-ভেজা ফুল। কেউ বলেছে বর্ষাকালের বন্যলতা, কারও প্রয়োজনে নয়, নিজের প্রয়োজনেই আত্মরক্ষার সঞ্চয় নিয়ে মাথা তুলে আছে। তা রূপসী তো হবেই, তার মা’র রূপ ছিল বিখ্যাত, আর বাবা তো সাক্ষাৎ ইংরেজ। ওদিকে কমলের চলাফেরাটা ইউরোপীয় মেয়েদের মতো সচ্ছন্দ। যেন জলের মাছ, ভেজা না-ভেজার প্রশ্ন ওঠে না। আবার যেন আগুনের বেষ্টনীতে ঘিরে রেখেছে নিজেকে; পুরুষেরা হাত বাড়াতে ভয় পায়। সেবায় সে ‘লক্ষ্মীর প্রতিমা’। রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ উপন্যাসে কুমুদিনীকে শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে হয়েছিল স্বামীর কাছে, সন্তানসম্ভবা হবার কারণে। শরৎচন্দ্র তাঁর নায়িকাকে তেমন কোনো বিপদে ফেলেননি। কমলের বিয়ে হয়েছিল, স্বামী মারা গেছে, কিন্তু সে নিঃসন্তান। শিবনাথের সঙ্গে বসবাস করেছে সে কিছুদিন, স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই, কিন্তু কোনো বিপদ ঘটেনি। অজিতের অগ্নিঝরা অনুভূতির ভেতরকার ‘অন্য কিছু’টা পরে বিকশিত হয়েছে, এবং অজিতকে বাধ্য করেছে কমলের পাণিপ্রার্থী হতে। প্রায় পায়ে পড়ার দশা। ঘৃণা এবং ভালোবাসা সবসময়ে ততটা দূরে থাকে না, যতটা দূরের বলে তাদেরকে সাধারণত মনে করা হয়। কমল চায় নারী-পুরুষের সম্পর্কটা যেন আলো-বাতাসের মতো সহজ ও স্বাভাবিক হয়। এই হওয়াটা খুবই প্রয়োজন। কিন্তু কমল জানে না কিভাবে সেটা সম্ভব। নারী-পুরুষ সম্পর্কের সঙ্গে যে ব্যক্তি নয় গোটা সমাজ ব্যবস্থা জড়িত, সেটা সে ভাবে না। কমলের স্মরণীয় উক্তিগুলোর একটি হচ্ছে, মন্দ তো ভালোর শত্রু নয়, ভালোর শত্রু তার চেয়ে আরও ভালো। সমাজে বিদ্যমান নানা মন্দকে দৃঢ় করার জন্য ‘মন্দের ভালো’ নয়, ভালোর চাইতেও যা ভালো তার দরকার। কিন্তু সেই আরও ভালোর সন্ধানে তার কোনো উদ্যোগ নেই, সে কেবল মন্দকেই আক্রমণ করে। বিধবা নীলিমার অন্যের সংসারে বেগার খাটাকে যখন অন্য সবাই আদর্শায়িত করার চেষ্টা করে কমল তখন নীলিমা এবং তার প্রশংসাকারী উভয়কে বিস্মিত করে দিয়ে বলে, ‘বাক্যের ছটায় বিশেষণের চাতুর্যে লোকে একে যত গৌরবান্বিতই করে তুলুক, গৃহিণীপনার এই মিথ্যে অভিনয়ে সম্মান নেই। এ গৌরির ছাড়াই ভালো।’ কমলের এই বক্তব্যে যারা বিস্মিত হয় তাদেরকে প্রশংসা করা যায় না, তাদের যেটা প্রাপ্য তা হলো করুণা। কিন্তু এক্ষেত্রেও কমল জানে না বা জানায় না যে, আসল কারণটা বৈষম্য। এটা তো মোটেই অপরিষ্কার নয় যে বিদ্যমান সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় পুরুষই কর্তা; ওই ব্যবস্থা বিধবা, সধবা, অবিবাহিত, সকল নারীকেই নিজের কাজে লাগাবে, পীড়ন করবে, কম আর বেশি। ব্যবস্থাটা ভাঙতে না পারলে কি নারী কি পুরুষ কারোই মুক্তি নেই, বিশেষভাবে মুক্তি নেই নারীর, কারণ সে বন্দী পুরুষের হাতে। দ্বিতীয় দফায় বন্দী। কমল অনেক কিছু জানে, ইউরোপ ও বিশ্ব ইতিহাসের অনেক কিছু সম্পর্কে সে সম্যক অবহিত, কিন্তু রুশ বিপ্লবের পরের মানুষ হয়েও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে নারী-পুরুষের সমতাবিধানের বিষয়ে সে কোনো খবরই রাখে না। তার আশেপাশে যেসব ‘বিপ্লবী’রা তৎপর খবর তারও যে রাখে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। আশুবাবু ও অজিত তো বিলাতফেরত, তারা বিস্তর বাগাড়ম্বর করে, কিন্তু ইতোমধ্যে রুশ দেশে যে একটা বিপ্লব ঘটে গেছে তার সংবাদ তাদের আন্তর্জাতিক বিশ্বের কোথাও নেই। কমল তাদের শত্রুপক্ষ, কিন্তু এই বিশেষ ক্ষেত্রে তারা সকলেই আবার একপক্ষ। না, কমল ব্যবস্থাকে ভাঙতে চায় না, ব্যবস্থার সংস্কার চায়। রক্ষণশীল আশুবাবুকে সে এই গোপন খবরটি দিয়ে করেছে, ‘আচার অনুষ্ঠানকে মিথ্যে বলে আমি উড়িয়ে দিতে চাইনে, চাই শুধু এর পরিবর্তন।’ কেবল আশুবাবু নয়, অন্যরাও হয়তো সেটা জানে। ঘোষণা দিয়ে জানাতে হয় না, তার নিজের আচার আচরণই তা প্রচার করে। তার কথাবার্তা শুনে মনে হবে যে উচ্ছৃঙ্খল, কিন্তু আসলে সে অত্যন্ত সংযমী। সেই কবে কৈশোরে তার বিবাহ হয়েছিল, হিন্দুর সঙ্গে নয়, আসামের এক খ্রিষ্টানের সঙ্গে, স্বামী অল্প পরেই মারা যায়, যেমনটা শরৎ-সাহিত্যে প্রায়ই ঘটে থাকে, কিন্তু খ্রিষ্টান স্বামীর স্ত্রী এবং খ্রিষ্টান পিতার সন্তান হওয়া সত্ত্বেও বৈধব্যকে সে হিন্দু বিধবার মতো মেনে নিয়েছে। একবেলা খায়, নিজে রান্না করে খায়, মাছ-মাংস স্পর্শ করে না। শিবনাথের সঙ্গে থেকেছে, কিন্তু তাকে বিয়ে করেনি। অজিতের সঙ্গে থাকবে, কিন্তু অজিত যে কত কাকুতি মিনতি করছে, প্রকাশ্যে নিজের যথাসর্বস্ব নিবেদন করছে তার পদতলে, তাতেও টলছে না সে। বলছে, তোমার দুর্বলতা দিয়েই বেঁধে রেখো, বিয়ের আনুষ্ঠানিক শক্তি দিয়ে নয়। যেন শ্রীকান্ত উপন্যাসের সেই রাজলক্ষ্মী, যে শ্রীকান্তকে বিয়ে করতে রাজি নয়, কারণ সে বিধবা। সত্য বটে কমল অজিত নয়। অজিতের মতো সে বিবাহকে আদর্শায়িত করে না, মনে করে না যে পৃথিবীজুড়ে ‘সমস্ত মানব জাতির জন্য’ এই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটি অতি পবিত্র। সে জানে অনেকক্ষেত্রেই বিবাহ পরিণত হয় আনন্দহীন দায়িত্বপালনে। তার নিজের মায়ের বিবাহপরবর্তী দুর্নামের ব্যাপারটা সে জানে এবং ভীষণভাবে জানে বিধবা হওয়ার পরে চা বাগানের এমন এক সাহেবকে বিয়ে করা যার সঙ্গে তার কোনো প্রকার সম্পর্ক থাকার কথা নয়, কামনা চরিতার্থকরণ ভিন্ন। কমলের জন্য এসব তো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। এই সচেতনতা বিয়ের ব্যাপারে তাকে উৎসাহিত না-করে থাকবে। শিবনাথ যে বিয়ের নামে তার সঙ্গে ছলনা করেছে সেটাও তাকে আঘাত করবার কথা। কিন্তু তারপরেও অত্যন্ত সজ্জন, ধনবান, বিলেত-ফেরত ইঞ্জিনিয়ারকে বিয়ে করায় সে যে সম্মতি দিচ্ছে না তার মূল কারণ তার বৈধব্য। শিবনাথের সঙ্গে সে ঘর-সংসার করতে রাজি হয়েছিল হয়তো এটা ভেবেই যে সম্পর্কটা বিয়ের হবে না, থাকবে শুধু ভালোবাসার। নিজের বৈধব্য-জনিত আপত্তির কথাটা সে প্রকাশ্যে জানায় না। জানালে রহস্য থাকতো না, ঘটনাটা সাদামাটা হয়ে পড়তো। সাহিত্য রহস্য পছন্দ করে। শরৎচন্দ্র নিজেও যে তাঁকে তার বৈধব্যের আচারবিধি লঙ্ঘন করাতে সম্মত হতেন তা নয়। এমনিতেই তিনি বিধবা বিবাহে অনুৎসাহী, তদুপরি কমল তো তাঁর অত্যন্ত প্রিয়জন; আপনজনই বলা চলে। গ্রামের অসহায় বিধবা মেয়েরা সেবিকা হবে এবং কৃচ্ছ্রসাধন করবে এটা অস্বাভাবিক নয়; কিন্তু যার বাবা ইংরেজ, সামান্য ইংরেজ নয় চা বাগানের বড় সাহেব, যে মেয়ে নিজে, অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত, সুশিক্ষিত, কুসংস্কারমুক্ত কেবল নয় কুসংস্কারবিরোধী সে কেন বাল্যবিধবার জীবনযাপন করতে যাবে? ঘটনার সময় দেশে যে ইংরেজশাসন প্রবলভাবে বিদ্যমান এটাও তো সত্য। ওদিকে কমল যে নারীর কাক্সিক্ষত মাতৃত্বকে অত্যন্ত অধিক মূল্য দেয়, তাও নয়। মাতৃত্বের প্রশ্নে তার বক্তব্যটি পরিষ্কার। তার মতে নারীকে, ‘চাটুবাক্যের নানা অলঙ্কার গায়ে আমাদের জড়িয়ে দিয়ে, যারা প্রচার করেছিল মাতৃত্বই নারীর চরম সার্থকতা, সমস্ত নারী জাতিকে তারা বঞ্চনা করেছে।’ তার নিজের জীবনে কোনো প্রকারের বিলাস নেই, শ্রমজীবীদের জামা-কাপড় সেলাই করে তার দিন চলে। আশ্রমবাসী কলেজের অধ্যাপক হরেন্দ্র যখন কমলের রক্তে পশ্চিমী দুনিয়ার ভোগবাদিতার শিক্ষা আছে বলে কটাক্ষ করে, কমল তখন রাগ করে না, তবে প্রবলভাবে প্রতিবাদ করে। তার বক্তব্য

[...] এ সব কথা বলবেন না। কেবলমাত্র ভোগটাকেই জীবনের বড় করে নিয়ে কোনো জাত কখনো বড়ো হয়ে উঠতে পারে না। মুসলমানেরা যখন এই ভুল করলে তখন তাদের ত্যাগও গেলো, ভোগও ছুটলো। এই ভুল করলে ওরাও মরবে। পশ্চিম তো আর জগৎ-ছাড়া নয়, সে-বিধান উপেক্ষা করে কারো বাঁচার উপায় নেই।

তাহলে? কারণ একটাই, ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র বিধবাবিবাহে সম্মতি দানে অনিচ্ছুক। কমল উচ্ছৃঙ্খল তো নয়ই, দুর্বিনীতও নয়। সে পিতৃভক্ত। সে অজিতের সঙ্গে ঘর-সংসার করতে রাজি আছে, কিন্তু বিয়ে যে করবে এমন প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি নয়। পিতৃভক্তির ব্যাপারটা এই উপন্যাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছাড়া কমলের আচরণের, তার জয়ের, আশুবাবুর কাছে তার আত্মসমর্পণের এবং সকলের কাছে তার মহত্ত্বের ব্যাখ্যা করাটা অসম্ভব। কমল চা বাগানের সাহেব ম্যানেজারের একমাত্র সন্তান। তার পক্ষে নিঃস্ব ও অসহায় হবার কথা নয়। ইচ্ছা করলেই চা বাগানে, রেল কোম্পানিতে বা ইংরেজদের কোনো প্রতিষ্ঠানে তার চাকরি হবার কথা। স্কুলে শিক্ষকতা করাটাও খুবই সম্ভব ছিল। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক যদি হতো তাহলেও অবাক হবার কিছু ছিল না। চাই কি বিলেতেও চলে যেতে পারতো, সেখানে তার পিতার আত্মীয়স্বজন থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। এসবের কোনো কিছু না করে সে কেন আশুবাবুর বৃত্তের ভেতর ঘোরাফেরা করবে এবং দারিদ্র্য, অবজ্ঞা, বিদ্রƒপ ও লাঞ্ছনার শিকার হতে যাবে? মানলাম না হয় যে এক আত্মীয়ের বাড়িতে তাকে পারিবারিক দাসির বিধবা কন্যা হিসেবে পেয়ে এবং রূপে মুগ্ধ হয়ে শিবনাথ তাকে আসামের চা বাগান থেকে উদ্ধার করে আগ্রায় নিয়ে এসেছে; সাহিত্যে এরকমের অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটাটা অস্বাভাবিক কিছু নয় । কিন্তু আগ্রায় আসার পরে শিবনাথ যখন তাকে চিনতে পেরে পালিয়ে গেছে তখন কেন সে বাঙালি মধ্যবিত্ত পাড়ায় ঘোরাফেরা করবে? মানলাম তার মা বাঙালি ছিল; কিন্তু ওই মা’কে তো সে মোটেই গুরুত্ব দেয় না। মা’র সম্পর্কে তার বক্তব্যÑ ‘মায়ের রূপ ছিল কিন্তু রুচি ছিল না।’ রুচিহীনা মায়ের কথা সে বলতে চায় না, পারলে ভুলে যেতে চায়। জ্ঞানের অত্যন্ত উজ্জ্বল যে-আলোতে সে আলোকিত তার সবটাই পেয়েছে সে বাবার কাছে। বাবার সঙ্গে তার কথোপকথন নিশ্চয়ই বাংলা ভাষায় চলতো না। বাবা তো খাঁটি সাহেব, পণ্ডিত ও জ্ঞানী ছিলেন, তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেই তার কতটা কী কথোপকথন হতো আমরা জানি না, স্ত্রী ইংরেজি জানলে নিশ্চয়ই চা বাগানের হেড ক্লার্কের বাসায় দাসির চাকরি নিতো না। মোট কথা, ইংরেজ, এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, এমন কি সাহেবী ধরনের শিক্ষিত অবাঙালি ভারতীয়দের খোঁজ না করে কমল যে মধ্যবিত্ত বাঙালি বৃত্তে আটক থেকে লাঞ্ছিত হতে সম্মত হয়েছে এর ব্যাখ্যা করাটা খুবই কঠিন। একটা ব্যাখ্যাই হতে পারে, সেটা পিতৃতান্ত্রিকতায় তার আস্থা। আশুবাবুর কাছে তার যে আত্মসমর্পণ সেটা পিতৃতান্ত্রিকতার সবচেয়ে শান্ত ও গ্রহণযোগ্য একজন প্রতিনিধির কাছে আত্মসমর্পণ বৈ নয়। এটা বলা খুবই সম্ভব যে কমল একজন পিতা খুঁজছিল। আশুবাবুর মধ্যে তাঁর সন্ধান পেয়েছে। নিজের মাতার ওপর কমলের ভক্তি শ্রদ্ধা নেই। মা’কে সে স্মরণ করতে বাধ্য হয়, নিজের পূর্ব-ইতিহাস ব্যাখ্যা করার জন্য। পিতার কথাই সে বার বার বলে। পিতৃপরিচয়ের ওপরই সে তার নিজের পরিচয় দাঁড় করিয়েছে। পিতাকে সে ধীর, শান্ত, জ্ঞানী, বিচক্ষণ ও সাধু বলে উপস্থিত করে। এর অনেকটাই তার ইচ্ছাপূরণ। কমলের মৃত পিতাকে জ্ঞানী ও বিচক্ষণ বলে মানতেই কষ্ট হয়, সাধু বলে ভাবা তো অসম্ভব। সাধুরা চা বাগানের ম্যানেজার হয়ে আসামে আসে না, এবং এলেও সাধু থাকতে পারে না। কমলের অনুপস্থিত পিতা যে সাধু চরিত্রের ছিল এমনটা ভাবার পক্ষে কোনো যুক্তিই নেই। চা বাগানের এক বাঙালি কর্মচারীর বিধবা রূপসী যুবতী স্ত্রীকে নিজের বাংলোতে এনে তুলেছে, এমন কাজ ম্যানেজাররা করেই থাকে, কিন্তু তার দ্বারা লোকটার সাধুত্ব প্রমাণিত হয় না, উল্টো দিকেই সন্দেহ জাগে। লোকটি মারা গেল, কিন্তু মরবার আগে একমাত্র কন্যা ও তার মায়ের জন্য কোনো ব্যবস্থাই করে গেল না, এটা প্রমাণ করে না যে সে দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন লোক ছিল। তার মৃত্যুর পর তার আদরের কন্যাটিকে নিয়ে কন্যার মাতাকে বাগানের হেড ক্লার্কের বাসাতে দাসির কাজ নিতে হলো, এটাও এমন সাক্ষ্য দেয় না যে কমলের মা’কে তার পিতা স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিল। কমল পিতার স্নেহ যথেষ্ট পরিমাণে পায়নি। অল্পবয়সে তার বিয়ে হয়ে গেছে, বিয়ের পরে স্বামী মারা গেছে, এবং তার পরপরই পিতা মারা পড়েছে, ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে। পিতৃস্নেহের জন্য সে অত্যন্ত কাতর। তার এই কাতরতার প্রতি শরৎচন্দ্রের সমর্থন রয়েছে, নিজের জীবনে তিনিও পিতৃভক্ত ছিলেন। নিজের মায়ের সম্পর্কে শরৎচন্দ্রও তেমন কিছু বলেননি, পিতা সম্পর্কে বলেছেন। যা বলেছেন তা অল্প হলেও উল্লেখযোগ্য :

পিতার নিকট হতে অস্থির স্বভাব ও গভীর সাহিত্যানুরাগ ব্যতীত আমি উত্তরাধিকার সূত্রে আর কিছুই পাই নি। পিতৃদত্ত প্রথম গুণটি আমাকে ঘরছাড়া করেছিল [...] আর দ্বিতীয় গুণের ফলে জীবনভর আমি কেবল স্বপ্ন দেখে গেলাম।

উত্তরাধিকারসূত্রে কমল তার বাবার কাছ থেকে কি পেয়েছে সেটা স্মরণ করতে গিয়ে দেখা যায় সে প্রায় শরৎচন্দ্রের নিজের ভাষাতেই কথা বলে। যেমন :

বাবা আমাকে দিয়ে যেতে পারেন নি কিছুই, কিন্তু পরের অনুগ্রহ থেকে মুক্তি পাবার এই বীজমন্ত্রটি দান করে গিয়েছেন।

পিতার কাছ থেকে শরৎচন্দ্র পেয়েছেন স্বপ্ন দেখার অভ্যাস; কমল পেয়েছে স্বাবলম্বনের শিক্ষা। এই দুই প্রাপ্তির ভেতর ব্যবধান আছে, কিন্তু উভয়েই যে পৈত্রিক উত্তরাধিকারকে উচ্চ মূল্য দেন সেটা তো স্পষ্ট। কমল কেবল উত্তরাধিকার লাভে সন্তুষ্ট নয়, সে পিতার স্নেহও চায়। নিজের পিতার কাছ থেকে সেটা পাবার উপায় নেই, সে মৃত; পাবার প্রতিশ্রুতি আছে আশুবাবুর মধ্যে, যিনি বয়সে, স্বভাবে ও অবস্থানে পিতার মতো। আগ্রার বাঙালি সমাজে তিনিই অভিভাবক। তাঁর বাড়িটি তো বিরাট আয়োজন, সেখানে দারোয়ান, সোফার, সহিস, বেয়ারা, পাচক, দাসি সব কিছু আছে, রয়েছে তাঁর বিশাল মোটরগাড়ি ও সদাপ্রস্তুত ঘোড়ার গাড়ি। টাকার কোনো অভাব নেই। বিলেতে বড় হয়েছেন, আবার বিলেতেই চলে যাবেন। তাঁর জন্য লন্ডন কলকাতার চেয়েও কাছে। বিলেতে ফেরত যাবার সময় আপন কন্যার চেয়েও আপন হয়ে ওঠা কমলকেও সঙ্গে নিয়ে যেতে চান তিনি। সামর্থ্যরে অভাব নেই। উদার, মজলিসি লোক। আতিথেয়তা অবারিত। তাঁর সঙ্গে বিদগ্ধ আলোচনা যে কোনো সময়ে চলতে পারে। বাড়িতে বই ও পত্রিকার ছড়াছড়ি। তাঁর জন্য সারাদিনই অবসর। শুয়ে, বসে, গল্পগুজব করে সময় কাটান। তিনি অত্যন্ত স্নেহপ্রবণ। পুরোপুরি বাঙালি। তিনি বিপতœীক, পরিবারের দ্বিতীয় সদস্যটি তাঁর কন্যা। সে একমাত্র সন্তান। পিতার সঙ্গে সে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে; এক দুর্বৃত্তের সঙ্গে ঘর ছেড়ে চলে গেছে। পিতার বিনা অনুমতিতে সে বিয়ের ব্যবস্থা করেছে। পিতার ধারণা এই বিয়ে কন্যাটির জন্য হবে ভয়াবহ। কমলের দিক থেকে পিতৃসম এমন একজন মানুষেরই প্রয়োজন ছিল। কমলের জন্য একটি অতিরিক্ত প্রাপ্তি এই যে, আশুবাবু চালচলনে সাহেবী; চুরুট খান, খাদ্য অখাদ্যের ব্যাপারে বাছবিচার করেন না, বই পড়েন। কমলের পিতা ছিলেন পুরোপুরি সাহেব, আশুবাবুও যে কিছু কম সাহেব তা নন। নকল নন, খাঁটি; লেখাপড়া বিলেতেই করেছেন, সেখানে সামাজিকভাবে বিস্তর মেলামেশা করেছেন। বন্ধুবান্ধবও রেখে এসেছেন। বিলেতি সমাজের দুর্বলতাগুলো তাঁর নখদর্পণে। কমল তাঁর সঙ্গে তর্ক করতে পারে, সন্তান যে-ভাবে তর্ক করে পিতার সঙ্গে ঠিক সে-ভাবেই। তাঁর আসল পিতা তর্ক করবার সুযোগ দিত বলে মনে হয় না। তাছাড়া কমলের কী-ই বা তখন বয়স। বয়স যখন মাত্র ঊনিশ তখনই তো সে পিতৃহীন হয়েছে। কমল খুশি হতো আশুবাবুর মেয়ে হতে পারলে। তাই সে ঘুরেফিরে তাঁর কাছেই আসে। আশুবাবুর মেয়ে হবার ইচ্ছার কথাটা সে যে বলেনি এমনও নয়। অজিতকে সে আরও বলেছে, ‘মেয়ের মত তাঁর কাছে গিয়েই শুধু নিতে পারি।’ প্রণাম সে সচরাচর কাউকে করে না, আশুবাবুকে করে। ওদিকে আশুবাবুও কমলকে মেয়ের মতোই দেখেন। তর্ক করেন, পরামর্শ নেন, তাকে পেলে খুশি হন। অন্যরা যখন কমলকে নিয়ে নানা কথা বলে, তার পিতৃপরিচয় ও মাতৃপরিচয় উল্লেখ করে কটূক্তি করে, নিজেদের ক্ষমতার পরিচয় দেয়, আশুবাবু তখন জানেন যে কমল একেবারেই খাঁটি। তাঁর স্নেহে কোনো কমতি নেই। ‘মা’ বলে ডাকেন। প্রথমে ডাকতেন ঘরের ভেতরে, শেষে এসে ডেকেছেন প্রকাশ্যে। শেষ পর্যন্ত কমলেরই জয় হয়। প্রতিপক্ষের সকলকে একে একে পরাভূত করে সে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তার সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিল অক্ষয়বাবু। কলেজের অধ্যাপক এবং অত্যন্ত রক্ষণশীল এই দুর্মুখ ব্যক্তিটি বর্বরোচিত ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চালাচ্ছিল কমলের ওপর। কমলের বিরুদ্ধে ইংরেজি ভাষায় প্রবন্ধ লিখে মেয়েদের সভায় পাঠ করতেও ছাড়েনি। ভেবেছিল কমল ইংরেজি জানে না। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল সেই অক্ষয়বাবু পর্যন্ত কমলের গুণগ্রাহী হয়ে পড়েছে। কমলকে ‘তুমি’ বলা ছেড়ে ‘আপনি’ বলছে, কাতর কণ্ঠে নিজের বাড়িতে তাকে নিমন্ত্রণ জানাচ্ছে, যেতে না-পারলে অন্তত চিঠি যেন লেখে বলে অনুনয় করছে। এর পরে আর কেউ বাকি রইলো না। বেলা ও মালিনী তো অন্তঃসারশূন্য দম্ভ মাত্র। কিন্তু ওদিকে, এত কিছু অর্জন করার পরে, কমল নিজেই তো আত্মসমর্পণ করে বসে আছে আশুবাবুর কাছে। অর্থাৎ পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে। সব্যসাচীর মতোই কমলও শরৎচন্দ্রের আপনজন; তাঁর মুখপাত্রই বলা চলে। আপাতদৃষ্টিতে দুজনেই ‘বিপ্লবী’, কিন্তু তাদের উভয়কে দিয়েই শরৎচন্দ্র যে কাজটি করিয়ে নিয়েছেন সেটি বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থাটাকে ভেঙেপড়া থেকে রক্ষার চেষ্টা। কমলকে তিনি তিলোত্তমার মতো গড়ে তুলেছেন, এবং তার সাহায্য নিয়ে আশুবাবুকে মহৎ করে তুলেছেন। নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখলে আশুবাবু মানুষটি খুবই সামান্য। তিনি স্বল্পবুদ্ধি, অনেকটা বামুনের মেয়ে’র সন্ধ্যার ভালোমানুষ পিতার মতো। যেভাবে তিনি ক্ষণে ক্ষণে ভাবাবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন, কমলের যুক্তির কাছে পরাজিত হন, এবং নিজের তিন মণ ওজনের দেহভাব ও যন্ত্রণাদায়ক বাতরোগের কথা বলেন তাতে তাঁর প্রতি পাঠকের করুণার ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়, শ্রদ্ধার সঞ্চার মোটেই ঘটে না। তদুপরি তাঁর সমস্ত অবস্থানটাই তো অনৈতিক। তিনি উপার্জন করেন না, দু’হাতে অপচয় করেন। আর টাকাটা আসে তাঁর প্রজাদের কাছ থেকে। কেবল অপচয় করেন না। তাঁর ভূমিকা একজন শোষণকারীর। মস্ত বড় জমিদারিটা তিনি পেয়েছেন পৈতৃক উত্তরাধিকার হিসেবে, এবং জমিদারি থেকে যতটা দূরে থাকা সম্ভব ততটা দূরেই তিনি থাকেন; টাকা আসে কলকাতার অফিস থেকে, সেখানে তাঁর ম্যানেজার আছে। আর যেভাবে তিনি সুযোগ পেলেই ইউরোপে তাঁর কৈশোর ও যৌবনকাল কাটাবার কথা স্মরণ করিয়ে দেন তা অত্যন্ত গ্রাম্য ও অরুচিকর। আশুবাবুকে গ্রহণযোগ্য করবার প্রয়োজন বলে কথা, নইলে লোকটির ওপর শরৎচন্দ্রের নিজেরও বিরক্ত হওয়া উচিত ছিল। ওই রকম অভ্যাসের এক ব্যক্তির ওপর তিনি যে বিলক্ষণ বিরূপ হয়েছিলেন তার সাক্ষ্য তাঁর এক চিঠিতে রয়েছে। তিনি লিখছেন,

আর এক ধরনের অসংযম দেখতে পাই ‘অ’র লেখায়। ছেলেটি লেখে ভালো, বিলেতেও গেছে, ও যাওয়াটা ও এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারে না। বিলেতের ব্যাপার নিয়ে ওর লেখায় এমনি একটা অরুচিকর ভক্তি গদ্গদ্ আদেলেপনার প্রকাশ পায় যে পাঠকের মন উৎপীড়িত বোধ করে। [দিলীপকুমার রায়কে লেখা চিঠি, ৪ঠা ফাল্গুন, ১৩৩৭]

‘অ’ সম্ভবত অরবিন্দ ঘোষ; যাঁর আশ্রমনিবাসী স্বদেশীপনার প্রতি শরৎচন্দ্র বিরূপ ছিলেন। আশুবাবু বিলাত উল্লেখ উৎপীড়ন করে না, কারণ আশুবাবুকে শরৎচন্দ্র পছন্দ করেন, বিলেতে বড় হয়েও তিনি যে মনেপ্রাণে সামন্তবাদভক্ত রয়ে গেছেন এই কারণে। ইংরেজতনয়া কমলের আশুবাবু ভক্তিটাও সামন্তবাদের মাহাত্ম্যবৃদ্ধির আবশ্যকতার কারণেই ঘটেছে। দুস্থ বিধবারা তাদের অসহায়তার দরুন সামন্তবাদী সংস্কৃতির ভক্ত হবে এতে সামন্তবাদের কোনো অর্জন নেই, মর্যাদাও বাড়ে না, কেননা ওটি নিরুপায়ের আত্মসমর্পণ; কিন্তু ইংরেজ সাহেবের মেয়ে যখন স্বেচ্ছায় ও সানন্দে সামন্তবাদী হয় তখন সেটা একটা বিজয় বৈকি। অসামান্য এই কমলের প্রতি যুবকরা আকৃষ্ট হবে এটা তো খুবই স্বাভাবিক। তারা সেটা হয়ও। কমল আগ্রায় এসেছে শিবনাথের সাথে; আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়নি, স্বামী-স্ত্রীর মতো একসাথে থাকা চলছিল। শিবনাথ অযোগ্য বলে প্রমাণ দিল, কমলকে ফেলে সে পালালো। এর পরে কমলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় তিনজন যুবকের, অজিত, হরেন্দ্র ও রাজেন্দ্রের। তিনজনের সঙ্গেই কমলের নিঃসঙ্কোচ মেলামেশা। এরা তিনজনই দেশপ্রেমিক, দেশের মুক্তির কথা ভাবে। তিনজনই যুক্ত ছিল একটি আশ্রমের সঙ্গে। এই আশ্রমের সঙ্গে পণ্ডিচেরীতে গড়া অরবিন্দ ঘোষের আশ্রমের মিল আছে। শরৎচন্দ্র যেমন আশ্রম ও আশ্রমবাসী সন্ন্যাসীদের পছন্দ করতেন না, তার মুখপাত্র কমলও তাদের পছন্দ করে না, কমলের বক্তব্য এই কৃচ্ছ্রসাধনে গর্ব আছে, মঙ্গল নেই। শেষ পর্যন্ত কমলের অবস্থানেরই জয় হয়, হরেন্দ্র ছিল আশ্রমের প্রধান কর্তা : সে ঠিক করে ওটা ভেঙে দেবে। রাজেন্দ্র জেলখাটা সন্ন্যাসী, আশ্রম তার জন্য যথেষ্ট নয়, সে আরও কিছু করতে চায়, কিন্তু কি করবে জানে না। ধার্মিক নয়, কিন্তু মখুরার এক গ্রামে এক পুরোহিতের গৃহে আগুনের গ্রাস থেকে দেবতার মূর্তি উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ হারায়। বাকি থাকে হরেন্দ্র ও অজিত। এদের দু’জনের যে কোনো একজনের সঙ্গে কমলের বিয়ে হতে পারতো। দুজনের ভেতর মিলও আছে, হরেন্দ্র ও অজিতের দৃষ্টিতে ভারতবর্ষ হচ্ছে ধর্মভূমি ও দেবভূমি। মাতৃভূমিতে তাদের উৎসাহ নেই। মাতার চেয়ে পিতার প্রতিই টানটা বেশি। ভারতে হিন্দু মহাসভা নামের রাজনৈতিক দলটি ততদিনে গঠিত হয়ে গেছে; এরা অবশ্য তার সদস্য নয়, কিন্তু এদের প্রবণতা ওই দিকেই। দুজনেই আশুবাবুর অনুরাগী। অজিত কিছুটা বেশি; তার অনুরাগ ভক্তিতে পর্যবসিত হয়েছে। আশুবাবুর মধ্যে ‘বিরাট শান্তি’ ও ‘ধৈর্যের হিমগিরি’ দেখতে পেয়েছে। কমল বলেছিল, ‘ইচ্ছে হয় আমি যদি তার মেয়ে হতাম,’ শুনে অজিতের প্রতিক্রিয়া এরকমের : ‘কথাটি অজিতের অত্যন্ত ভাল লাগিল। আশুবাবুকে সে অন্তরের মধ্যে দেবতার ন্যায় ভক্তি-শ্রদ্ধা করে।’ অজিত ও হরেন্দ্রের মিল আরও এক জায়গাতে। উভয়েই কমলকে ভক্তি শ্রদ্ধা করে। শুরুতে বেশ বিরূপতা ছিল, উভয়েরই। পরে তা ধুয়েমুছে দূর হয়ে গেছে। তারা দুজনেই কমলের ভেতর মহৎ একজন মানুষকে দেখতে পেয়েছে। দু’জনের সঙ্গেই কমলের মতের অমিল আছে। তার কারণ দু’জনেরই প্রবণতাটা ব্রহ্মচর্যার দিকে। হরেন্দ্র আশ্রম গড়েছে, অজিত সেখানে এসে আশ্রয় নিয়েছে। কমল কিন্তু আশ্রমে বিশ্বাস করে না। তার বিশ্বাস স্বাভাবিক জীবনে; সে চায় পূর্ণতা। যদিও তার ভেতরেও স্ববিরোধিতা আছে, (হাজার হোক মানুষ তো)। হরেন্দ্রর দেরী হয়নি, কমলকে সে জানিয়ে দিয়েছে, ‘সংসারে যত লোক আপনাকে যথার্থ শ্রদ্ধা করে আমি তাদেরই একজন।’ তার আগে অবশ্য রাজেনের পতন ঘটে গেছে। রাজেনও ব্রহ্মচারী তবে বেশ ভিন্ন রকমের, সে যে বিশেষভাবে মেয়েদের তোয়াজ করবে এমন পাত্রই নয়, মেয়েদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব সম্পর্কে সে অসচেতন। এবং তার কাছে মতের মিলটাই বড় মনের মিলের তুলনায়। এইখানে সে বস্তুবাদীদের কাছের মানুষ, এবং অন্য সকলের থেকে একেবারেই স্বতন্ত্র। অন্যসবাই নির্ভেজাল ভাববাদী, ভেতরে ভেতরে কমলও তাই। এবং ওই ভাববাদিতার জায়গাটিতেই কমল এক হয়ে যায় আশুবাবু, হরেন্দ্র, অজিত এবং আশুবাবুর বৃত্তে যাদের ঘোরাফেরা সেই ভদ্র বাঙালিদের সঙ্গে। তাদের মতো করেই কমলও ভাবে মতের মিল নয়, মনের মিলটাই বড়। যে জন্য তার পক্ষে আশুবাবুকে শ্রদ্ধা করতে অসুবিধা হয় না। আশুবাবুর মতগুলো তার কাছে খুবই সামান্য ঠেকে। যেটা স্বাভাবিক। কিন্তু মনের ভেতরে আশুবাবু মানুষটার প্রতি তার গভীর টান সন্তানের টান যেন পিতার প্রতি। রাজেন ছেলেটি কমিউনিস্ট হতে পারত, যদি পার্টির সন্ধান পেত; পাবে কি করে, তার চারদিকে তো স্বদেশী এবং হিন্দু মহাসভাপন্থিদেরই নিত্য আনাগোনা। দিগ্ভ্রান্ত রাজেন মূর্তি উদ্ধার করতে গিয়ে প্রাণ দিল। প্রাণদানের ওই ঘটনায় আশুবাবুর প্রতিক্রিয়াটা একজন নির্মল ভাববাদী জাতীয়তাবাদীর।

আশুবাবু যুক্ত-হাত মাথায় ঠেকাইয়া বলিলেন, তার মানে দেশছাড়া আর কোন মানুষকেই সে আত্মীয় বলে স্বীকার করে নি। শুধুই দেশÑএই ভারতবর্ষটা। তবু, ভগবান! তোমার পায়েই তাকে স্থান দিয়ো। তুমি আর যাই করো, এই রাজেনদের জাতটাকে বিলুপ্ত করো না।

ভগবানের কাছে পিতার সমর্পণ, পুত্রকে। কমলের প্রতিক্রিয়াটা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের :

এই শোকের আঘাত কমলের চেয়ে বেশী বোধ করি কাহারও বাজে নাই, কিন্তু বেদনার বাষ্পে কণ্ঠকে সে আচ্ছন্ন করিতে দিল না। চোখ দিয়া তাহার আগুন বাহির হইতে লাগিল, বলিল, দুঃখ কিসের? সে বৈকুণ্ঠে গেছে। হরেন্দ্রকে কহিল, কাঁদবেন না হরেনবাবু, অজ্ঞানের বলি চিরদিন এমনি করেই আদায় হয়।

রাজেনকে সে অজ্ঞান বলছে। তার সঙ্গে কমলের মতের মিল দুর্লঙ্ঘনীয়। কিন্তু মনের মিল আছে। যেমন মনের মিল আছে আশুবাবু, হরেন্দ্র ও অজিতের সঙ্গে। মনের মিলের গুরুত্বের ব্যাপারটা নিয়ে রাজেনের সঙ্গে তার তাৎপর্যপূর্ণ মতবিরোধও ঘটেছে। রাজেন ঠিক করেছে হরেন্দ্রর আশ্রম ছেড়ে চলে যাবে। কারণ তারা সবাই দেশের জন্য কাজ করতে চায় ঠিকই, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে তার মতে মেলে না, কাজেও মেলে না, মেলে শুধু দেশের প্রতি ভালোবাসাতে। শুনে কমল বলে, ‘মন যেখানে মিলেচে, থাক না সেখানে মতের অমিল। হোক না কাজের ধারা বিভিন্ন; কি যায় আসে তাতে? [...] মত এবং কর্ম্ম দুইই বাইরের জিনিস রাজেন, মনটাই সত্য।’ মনকে প্রধান করার এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কমল, অজিত, হরেন্দ্র, বিধবা নীলিমা, প্রৌঢ় আশুবাবু, সবাই এক কাতারে এসে যায়। শরৎচন্দ্রের নিজের অবস্থানও এইখানেই, মতের ওপর মনের ওই প্রাধান্যদানের পথটাতেই। তিনি জানিয়েছেনও ওই কথা। যেমন, ‘বিপ্লবের সৃষ্টি মানুষের মনে, অহেতুক রক্তপাতে নয়।’ [শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ, ত্রয়োদশ সম্ভার, পৃ ৩৫১] আর যথার্থ বিপ্লব, অর্থাৎ সামাজিক বিপ্লব যে তিনি পছন্দ করেন তাও নয়, তাঁর মতে, বিপ্লব আসলে মানসিক, সামাজিক নয়। কমলের বিপ্লবটাও বাকপটু তার্কিকেরই। সেখানে রক্তপাতের কোনো আশঙ্কা নেই। যদি সে সত্যিকারের বিপ্লবী হতো তাহলে জমিদার আশুবাবুর পরশ্রমজীবী শোষণের কুৎসিত বাস্তবতাকে ঘৃণা করত। প্রয়াত পিতার গুণের স্বকলোপ-কল্পিত তালিকা তৈরি না করে উল্টো চা বাগানের ইংরেজ মালিক ও ম্যানেজারদের অতিশয় ঘৃণ্য ও নির্লজ্জ শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়াত। সে-ক্ষেত্রে অবশ্য উপন্যাসটা দাঁড়াতোই না, কমল আশুবাবুর বৃত্তে এসে ধরা দিত না, থাকত অন্যত্র এবং ভিন্ন কাজে। কমলকে শরৎচন্দ্র বস্তুবাদিতার আচ্ছাদনে ভাববাদিতার চমৎকার মুখপাত্র হিসেবে হাজির করেছেন। বস্তুত ওই আচ্ছাদনটুকু না থাকলে সে আশুবাবুর মতোই সামান্য হয়ে পড়ত। সে যুক্তি দেয় আবার উপমাও দেয়। তার উপমাগুলো কখনো কখনো বিভ্রান্তিকর। যেমন সে মনে করে স্বাধীনতা জিনিসটা বাইরের ব্যাপার নয়, ভেতরের, অর্থাৎ মনের ব্যাপার; উপমা দিয়ে বলে, বাইরে থেকে ডিমের খোসা ঠুকরে ভিতরের জীবনকে মুক্তি দিলে সে মুক্তি পায় নাÑ মরে। কিন্তু এটা সে খেয়াল করে না যে ডিমটা পচা হতে পারে, এবং যদি পচা হয় তবে সেখান থেকে জীবন বের হবার কোনো আশাই নেই, যুগ যুগ ধরে প্রতীক্ষা করলেও অলৌকিক কিছু ঘটবে না। যাদের সঙ্গে তার ওঠাবসা নিত্য তাদের ভেতর জীবনের ভান আছে, জীবন যে আছে এমন নয়। কমলের সাহেব পিতাটি ভীষণ রকমের পিতৃতান্ত্রিক। ‘স্ত্রী’কে সে অরক্ষিত অবস্থায় রেখে বিদায় নিয়েছে। লোকটি নাকি প্রায়ই বলত যে, “পৃথিবীর ক্রীতদাসের স্বাধীনতা দিয়েছিল একদিন তাদের মনিবেরাই, তাদের হয়ে লড়াই করেছিল সেদিন মনিবের জাতেরাই, নইলে দাসের দল কোঁদল করে, যুক্তির জোরে নিজেদের মুক্তি অর্জন করে নি। বিশ্বের এমনিই নিয়ম; শক্তির বন্ধন থেকে শক্তিমানেরাই দুর্বলকে ত্রাণ করে। তেমনি নারীর মুক্তি আজও শুধু পুরুষেরাই দিতে পারে।” কমলের পিতা চা বাগানের বড় সাহেব। সে যে এটা বলবে সেটা খুবই স্বাভাবিক। জ্ঞানী ব্যক্তি, শ্রেণি বোঝে, মেয়েকে শ্রেণিস্বার্থ বুঝতে শিখিয়েছে। কিন্তু ‘বিপ্লবী’ মেয়েটি যে ঔপনিবেশিক পিতার ওই মতকে সমর্থন করছে, বিস্ময়ের ব্যাপার সেটাই। অবশ্য বিস্ময় কেটে যায় যদি ধরে নিই যে তার নিজের অবস্থানটাও তার পিতার মতোই, এবং সেটাই হচ্ছে আসল সত্য। ‘সব্যসাচী’ অবশ্য ইংরেজদের মুক্তিদানকারী উদারতায় বিশ্বাস করেন না, তবে ভদ্রলোকরাই যে কৃষকদের মুক্ত করবে এ তত্ত্বে তিনি সম্পূর্ণ নিঃসংশয় ছিলেন। দেখা যাবে যে বিপ্লব-বিরোধিতা বিলক্ষণ ক্ষমতা রাখে, অন্য ব্যাপারে পরস্পরের শত্রুদেরকেও এক করে দিতে। আশুবাবু বলেন, কমলকে,

বুড়োর এই কথাটা মনে রেখো কমল, আদর্শ, আইডিয়াল শুধু দু’চার জনেরই, তাই তার দাম। তাকে সাধারণ্যে টেনে আনলে সে হয় পাগলামি, তার শুভ যায় ঘুচে, তার ভাল হয় দুঃসহ।

তাঁর এই বক্তব্য স্বাভাবিক, কারণ তাঁর জাতীয়তাবাদ রক্ষণশীল, বলা চলে প্রতিক্রিয়াশীল। তবে তাতে যে কমলের পিতার বক্তব্যের ছায়া এসে পড়েছে সেটা নিতান্ত তাৎপর্যহীন নয়। কিন্তু আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে শরৎচন্দ্রের নিজের মতামত, যেটি তাঁর ‘নারীর মুক্তি’ নামের প্রবন্ধটিতে পাওয়া যায়।

নারীর মূল্য নির্ভর করে পুরুষের স্নেহ, সহানুভূতি ও ন্যায়-ধর্ম্মের উপরে। ভগবান তাহাকে দুর্ব্বল করিয়াই গড়িয়াছেন, বলের সেই অভাবটুকু পুরুষ এই সমস্ত বৃত্তির দিকে চাহিয়াই সম্পূর্ণ করিয়া দিতে পারে, ধর্ম্ম পুস্তকের খুঁটিনাটি ও অবোধ্য অর্থের সাহায্যে পারে না।

ভগবানের দেখা যাচ্ছে কাজের কোনো শেষ নেই; তিনি নিজ হাতে শিক্ষিত অশিক্ষিতের ব্যবধান সৃষ্টি করেছেন (সব্যসাচীর বক্তব্য স্মরণীয়); নারীকেও দুর্বল করে রেখে গেছেন। নারীর জন্য পুরুষের উদারতা ভিন্ন ভরসা কিসে? ‘স্বরাজ-সাধনায় নারী’ প্রবন্ধে আবার পাওয়া যাচ্ছে : ‘মেয়ে মানুষকে মানুষ করার ভারও তার উপরে, এখানেই পিতৃত্বের সত্যকার গৌরব।’ কিন্তু পিতারা যদি দল বেঁধে কমলের দুই পিতার (একটি আসল অপরটি সংগৃহীত) মতো হন, তাহলেই মস্ত বিপদ। সামন্তবাদী বিশ্বে তো বটেই, পুঁজিবাদী বিশ্বেও ঠিক অমনটাই ঘটেছে।

হরেন্দ্র ও অজিতের কাছে ফেরত যাওয়া যাক। আপাতদৃষ্টিতে দু’জনের কারোর সঙ্গেই কমলের মতের মিল নেই। শুরুতে প্রচণ্ড বিরূপতাই ছিল, কিন্তু পরে আবিষ্কার করা গেল মনের মিলটা অল্প নয়, ভালোভাবেই আছে। এমন কি মতের পার্থক্যটাও আপাত মাত্র, গভীর নয়, কারণ কমলও তাদের মতোই বিপ্লববিরোধী। এই সত্যটা অবশ্য তিনজনের কেউই মানবে না, শরৎচন্দ্র নিজেও মানতে চাইবেন না, কিন্তু উপন্যাসের কাহিনীটা তো তাই বলছে। রাজেনও বিপ্লবের বিপক্ষে। মুচিদের পাশে গিয়ে সে যে দাঁড়ায় সেটা তাদেরকে মড়কের হাত থেকে বাঁচাবার জন্য বটে; শোষণ-ব্যবস্থার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য নয়। অগ্নিআক্রান্ত ঠাকুরবাড়ির দেবমূর্তি আর মুচিপাড়ার রোগাক্রান্ত শিশু তার কাছে একই মূল্যের। হরেন্দ্র ও অজিতের ভেতর একটা পার্থক্য আছে, সেটি কমলের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির ভেতরেও কাজ করে। হরেন্দ্র সংগঠক, অজিত সেটা নয়, অজিত আশ্রয় চায়। হরেন্দ্র তাকে অল্পসময়ের জন্য হলেও আশ্রয় দিয়েছিল। হরেন্দ্র কেবল কমলের প্রতি নয়, নীলিমার প্রতিও সশ্রদ্ধ। এই দুইজন বাল্যবিধবার ভেতর পার্থক্য আছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা যেভাবে কঠিন সংযমের ভেতর নিজেদের আটক রেখেছে এবং অন্যদের যতœ নিয়ে যাচ্ছে, তাতে তাদের ভেতর ‘নারী সত্ত্বার’ একটি মহৎ প্রকাশ সে দেখতে পায়। উন্মোচনের বিশেষ ঘটনাটি ঘটে হরেন্দ্রকে কমলের নিজহাতে রান্না করে খাওয়ানোকে কেন্দ্র করে। যেমন রমার ব্যাপারে ঘটেছিল রমেশের ক্ষেত্রে।

আয়োজন সামান্য তথাপি কি যতœ করিয়াই না কমল অতিথিকে খাওয়াইল। খাইতে বসিয়া হরেন্দ্রের বার বার করিয়া নীলিমাকে স্মরণ হইল; নারীত্বে শান্ত মাধুর্য ও শুচিতার ইহার চেয়ে বড় সে কাহাকেও ভাবিত না। মনে মনে বলিল, শিক্ষা, সংস্কার, রুচি ও প্রবৃত্তিতে প্রভেদ ইহাদের মধ্যে যত বেশিই থাক, সেবা ও মমতায় ইহারা একেবারে এক। [...] নারীর যেটি নিজস্ব আপন, সর্ব্বপ্রকার মতামতের একান্ত বহির্ভূত, সেই গূঢ় অন্তর্দ্দেশের রূপটি দেখিলে একেবারে চোখ জুড়াইয়া যায়।

রমা বা কমল বলে নয়, শরৎচন্দ্রের সব নায়িকারাই রন্ধনে দক্ষ, আপ্যায়নে অকুণ্ঠ। তাদের ক্ষেত্রে বিধাতার অনেক দানের মধ্যে একটি এই জ্ঞান যে পুরুষের হৃদয় জিনিসটা মোটেই উদারনিরপেক্ষ নয়। হরেন্দ্র অবশ্য লক্ষ্য করেছে যে বাইরে থেকে মনে হবে কমল বুঝি ধর্মবিদ্বেষী;

অথচ নিজের মধ্যে এমনি একটি নির্দ্বন্দ্ব সংযম, নীরব মিতচার ও নির্বিশেষ তিতিক্ষা আছে যে দেখে বিস্ময় লাগে।

তা সংযমের ব্যাপারটা কমলের আছে। নইলে শ্রদ্ধা তো পেতই না বিপদ অবধারিত ছিল। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে অভিভাবক আশুবাবুর নৈতিকতার জ্ঞানটা কিছুটা ভিক্টোরীয় ইংল্যান্ডের। ওই নৈতিকতার বিশেষ মুখপাত্র ছিলেন কবি টেনিসন। তিনি তাঁর কবিতায় আত্মসম্মান, আত্মজ্ঞান ও আত্মসংযমের কথা খুব জোর দিয়ে বলেছেন। আশুবাবু বলেন আত্মদর্শনের কথা। কমল তা মানে না। কমলের নিজের আচরণ বলে দেয় যে প্রয়োজন আত্ম-সংযমেরও। বিধবাদের মতো কমলের একবেলা নিরামিশ আহারে দিনযাপন ওই আত্মসংযমের সঙ্গে যুক্ত। নিজের খাদ্যাভ্যাসের এই খবরটা সে যে সুযোগ পেলেই বিশেষত পুরুষদের জানিয়ে দেয় সেটা বেশ চোখে পড়ে। যেন বলে দেয়, ওইখানেই বসে থেকো, আর এগিয়ো না। রাজেনের সঙ্গে তার সম্পর্কটা যে নিকটের হয়েও নৈর্ব্যক্তিকতার স্তরেই রয়ে যায় তার উপাদানগুলোর ভেতর খাদ্যাভ্যাসও রয়েছে। রাজেন দেখে রোগীর সেবায় নিমগ্ন কমল অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে অভুক্ত থাকছে। এতে তার শ্রদ্ধা বাড়ে। আসল সত্যটা অবশ্য এই যে, কমল প্রতিদিনই বাসায় গিয়ে রান্না করে খাবার নিয়ে আসতো। কিন্তু সেটা সে রাজেনকে জানায়নি। তাতে ফলটা খারাপ নয়, ভালোই হয়েছে। রাজেনের সঙ্গে কমল তার মৃত পিতার একটি সাদৃশ্যও দেখতে পেয়েছে। কমলের মনে পড়েছে যে তার পিতাও ছিল রাজেনের মতোই রসকসহীন, তবে আন্তরিক। হরেন্দ্রর তুলনায় অজিতের ভেতর একটা অপূর্ণতা আছে। নিজের ওপর অজিতের আস্থা নেই। এক সময়ে সে যোগাভ্যাস পর্যন্ত শুরু করেছিল। মাছ মাংস না খাবার কথা তো শুরুতেই প্রকাশ পেয়েছে। নাকি ঠিক করেছিল সমুদ্রযাত্রার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে কাশীতে যাবে। অনেকটা ছেলেমানুষই। তার অভিভাবক দরকার। সে জন্য সে আশুবাবুর বাড়িতে গিয়ে উঠেছিল, যিনি ছিলেন তার পিতার মতো। সে আশ্রয় ভেঙে গেলে সে চলে এসেছে হরেন্দ্রর আশ্রমে। হরেন্দ্র তার বড় ভাইয়ের মতো। অজিত শেষ পর্যন্ত এলো কমলের ভাড়া করা বাসায়। বাক্সপোটরা নিয়ে। কমল তাকে ঠিকই চিনে ফেলেছে। বলেছে, নিজেকে শ্রদ্ধা করতে শিখুন অজিত বাবু। আত্মশ্রদ্ধা চর্চার সেই ভিক্টোরীয় পরামর্শ! এবং শেষে অজিত যখন কমলের অজান্তেই তার বাসায় এসে উঠেছে তখন কমল স্নেহ ও প্রশ্রয়ে কণ্ঠে বলেছে, ‘এক জাতির মানুষ আছে তারা আশি বছরেও সাবালক হয় না। তাদের মাথার উপর অভিভাবক একজন চাই-ই। এ ব্যবস্থা ভগবান কৃপা করে করেন।’ অজিত প্রতিবাদ করে না। হয়তো শুনে খুশিই হয়। এত দিনে সে যথার্থ অভিভাবক পেয়েছে। ভগবানের কৃপা! কমল নিজেও একজন অভিভাবক খুঁজছিল, যে জন্য তার ওই রকমের পিতৃ-আনুগত্য। আশুবাবু লোকটির বুদ্ধি মোটেই তীক্ষè নয়, হৃদয় দিয়ে চলেন; হৃদয় দিয়েই তিনি কমলের যে রূপটি দেখেছেন সেটি এই রকমের:

এই উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির মেয়েটি সংসারে অসম্মান, অমর্যাদার মধ্যে জন্মলাভ করিয়াছে, কিন্তু জন্মের সেই লজ্জাকর দুর্গতিকে অন্তরে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করিয়া লোকান্তরিত পিতার প্রতি তাহার ভক্তি ও স্নেহের সীমা নাই। তবে আশুবাবুর এই জ্ঞানে একটা অপূর্ণতা আছে। কমলের অসম্মান ও দুর্গতি ইত্যাদি বিন্দুপরিমাণও ঘটত না যদি সে স্বেচ্ছায় মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের কাছে না আসত। এসেছিল পিতার খোঁজে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ কমলের নিজের মধ্যেও একটি পিতা আছে এবং বেশ মজবুত রূপেই সে পিতৃতান্ত্রিকতায় আস্থাশীল। যেভাবে সে সবাইকে পরামর্শ দেয়, আপদে-বিপদে পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, ভুল ধরিয়ে দেয়, এবং সম্পূর্ণ বৈরী পরিবেশে নিজের সম্মান শুধু নয়, কর্তৃত্বই প্রতিষ্ঠা করে ফেলে তা মাতৃসুলভ নয়, পিতৃসুলভ বটে। ওদিকে আবার নিজের পিতাকে নিয়ে বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই, উল্টো গর্ব আছে, তার যত সংকোচ মাতাকে নিয়েই। কমলের ভেতরকার পিতৃতান্ত্রিকতা বিশেষভাবে প্রকাশ পায় অজিতের সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রটিতে। কমলের মধ্যে যে একজন পিতা আছে বুদ্ধিমান শিবনাথ সেটা টের পেয়ে গিয়ে থাকবে, যে জন্য বন্ধনটাকে রেখেছিল আল্গা করে, এবং ঘর ছেড়ে পালিয়েছে প্রথম সুযোগেই। আর রাজেন? কমলের মধ্যে পিতা হয়তো নয়, তবে ভ্রাতার খোঁজ পেয়ে সে যে খুশি হয়েছিল তা বেশ স্পষ্ট। কিন্তু অজিতই শেষ পর্যন্ত টিকে রইল। কমলের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নয়, তার কর্তৃত্বকে মেনে নিয়ে। সম্পর্কের বিবর্তনটা লক্ষণীয়। অজিতের দিক থেকে প্রথমে ছিল স্নেহ ও করুণা। পরে এলো বিপুল শ্রদ্ধা। এলো হরেন্দ্রর ক্ষেত্রে যেভাবে এসেছিল সে-ভাবেই, নিজে অভুক্ত থেকে অতিথি অজিতকে রান্না করে খাওয়ানোর পথ ধরে। অজিতের জন্য কমল আয়োজন করেছে মাছ-মাংসের; অথচ নিজের জন্য বরাদ্দ রেখেছে চাল-ডাল ও আলুসিদ্ধ’র। কমলের খাওয়ার দিকে চেয়ে অজিত অভিভূত হয়ে পড়ে। কমলকে যারা অসম্মান করেছে তাদের প্রতি তার ঘৃণা জাগে। আবেগ চাপতে পাড়ে না, উচ্ছ্বসিত স্বরে বলে ওঠে, “যারা অপমানে আপনাকে দূরে রাখতে চায়, যারা অকারণে গ্লানি করে বেড়ায়, তারা কিন্তু আপনার পাদস্পর্শেরও যোগ্য নয়। সংসারে দেবীর আসন যদি কারও থাকে সে আপনার।” কিন্তু এর পরে দেবীটি আর দেবী থাকে না, দেবীকে সে ব্যক্তিগতভাবে পেতে চায়, হরেন্দ্র যা চায়নি। কিছুটা প্রশ্রয় পেয়ে দেবীকে সে আর ‘আপনি’র আসনে বসিয়ে রাখে না, ‘তুমি’তে নামিয়ে আনে। অন্ধকার রাতে গাড়িতে করে বেড়াতে বের হয়ে সে সাহসী হয়ে পড়েছিল। কমলের পিঠে হাত রেখেছিল, তাকে বুকের কাছে পর্যন্ত টেনেও নিয়েছিল, বাসনা জেগেছিল কমলকে নিয়ে নিরুদ্দিষ্টই হয়ে যাবে, শেষ পর্যন্ত পারে নি যে সেটা কমলের অসম্মতির দরুন নয়, পকেটে টাকাপয়সা নেই এটা টের পেয়ে। এর পরে তো তাকে শরণার্থী হয়েই চলে আসতে হয়, কমলের বাসাতে। তার আগে, এক রাতে অজিতকে কমল নিজেই সে রেখে দিয়েছিল তার বাসাতে। ফুলকাটা অব্যবহৃত চাদর ও বালিশ বিছিয়ে বিছানা করে দিয়েছে অত্যন্ত যতœ করে। অনেক কথা হয়েছে দুজনে। কোথাও কেউ নেই। কিন্তু অজিত বুঝেছে কমলের পিঠে আবার যে হাত রাখবে তা হবে না। বিছানায় শায়িত অবস্থায় অজিত যা করেছে তা এরকমের। ‘ধীরে ধীরে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়া শুইতেই তাহার কি কারণে কোথা দিয়া চোখে জল আসিয়া পড়িল।’ এর পরের ঘটনা এরকমের হয়ত কমল বুঝিতে পারিল। উঠিয়া আসিয়া শয্যার এক প্রান্তে বসিয়া তাহার মাথার মধ্যে হাত বুলাইয়া দিতে লাগিল, কিন্তু সান্ত¡নার একটি কথাও উচ্চারণ করিল না।

অবুঝ অজিতের ক্রন্দনে এই প্রতিক্রিয়াটি মোটেই মাতৃসুলভ নয়, মাতৃসুলভ হলে দু’চারটি সান্ত¡নার কথা উচ্চারণ করত। না, কমল সেটা করেনি; তার ব্যবহার পিতৃসুলভ। পিতা যেন হাত বুলিয়ে দিচ্ছে অবুঝ সন্তানের মাথায়। কাহিনির শেষে অজিত যখন কমলের বাসায় সামাজিক বসতি স্থাপন করেছে তখন দু’জনের ভেতর সম্পর্কটা স্বভাবতই বদলে গেছে। এতকাল কমলের কাছে অজিত ছিল আপনি, এখন আর আপনি নেই, তুমি হয়ে গেছে। এক সকালে অজিতকে দেখা যাচ্ছে চিন্তিত। “কমল বাঁধা-চাঁদা জিনিসগুলো ফর্দ্দ মিলাইয়া কাগজে টুকিয়া রাখিতেছিল। স্থান ত্যাগের অস্বল্পতায় কাজের মধ্যে তাহার চঞ্চলতা নাই, যেন প্রাত্যহিক নিয়মিত ব্যাপার।” এর পরে হরেন্দ্রর পতনাসন্ন-আশ্রমে সান্ধ্য-ভোজে আমন্ত্রণ এসে হাজির। অজিত অসুস্থতার অজুহাতে যেতে অসম্মত হলো, কারণ তার সাহস ছিল না কমলের সঙ্গে থাকার খবরটা জানাজানি হয়ে যাওয়াতে যে পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে সেটি মোকাবিলা করবার। কমল কিন্তু চলে গেল সহাস্যে। এবং গিয়ে সকলের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলল খুব সহজে। পরে অবশ্য অজিতও গিয়ে হাজির হয়েছে, মৃদু পদক্ষেপে। উপন্যাসের শেষ লাইন দুটিতে যে দৃশ্যটি আছে সেটি এরকমের। “শোকাচ্ছন্ন স্তব্ধ নীরবতার মধ্যে কমল অজিতকে লইয়া গাড়ীতে গিয়া বসিল। কহিল, রামদীন চলো।” গাড়িটি অজিতের, কিন্তু কর্তা কমলই। অজিতকে নিয়ে সে রওনা দিল, সোফারকে হুকুম দেবার মালিকও ওই কমলই। অজিত অনুগামী। সম্ভবত এই ব্যাপারে নড়চড় হবে না।

৫. আমাদের এই আলোচনাতে ‘শেষ প্রশ্ন’কে বেশ খানিকটা স্থান করে দিতে হলো। নান্দনিক বিচারে এ উপন্যাস অতটা গুরুত্বপূর্ণ না হলেও শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নে এটি পথের দাবীর মতোই তাৎপর্যপূর্ণ। বস্তুত এই দু’টি উপন্যাসকে একসঙ্গেই বিবেচনা করতে হয়। পথের দাবী রাজনৈতিক উপন্যাস; শেষ প্রশ্ন সামাজিক; কিন্তু রাজনীতি ও সমাজনীতিকে পৃথক করা খুবই কঠিন এবং ঔপনিবেশিক ভারতে রাষ্ট্রের সর্বব্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণাধীন অবস্থায় সামাজিক প্রশ্নগুলো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যরূপে জড়িয়ে-পেঁচিয়ে গিয়েছিল। শেষ প্রশ্ন শরৎচন্দ্রের শেষ বয়সের রচনা, এখানে তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিটিকে অপেক্ষাকৃত স্পষ্টভাবেই পাওয়া যাচ্ছে। ‘পথের দাবী’তে সব্যসাচী প্রধান, ‘শেষ প্রশ্ন’তে যেমন কমলই প্রধান। এরা দু’জনেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ; সে-কারণে কর্মক্ষেত্র ভিন্ন হলেও তারা একই সমাজের সদস্য। ওই সমাজকে সব্যসাচী ও কমল, কেউই ভাঙতে চায় না। কারণ এর স্থিতির সঙ্গে তাদের শ্রেণিস্বার্থ জড়িত। শরৎচন্দ্র এই দু’জনকে পছন্দ করেন, এবং এদেরকে তাঁর নিজের মুখপাত্র হবার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। ‘অভাগীর স্বর্গ’ এবং ‘মহেশ’-এ তিনি সামন্তসংস্কৃতি ও সামন্তশোষণের অমানবিকতাকে উন্মোচিত করে দিয়েছেন। বামুনের মেয়ে এবং পল্লীসমাজ-এ তিনি সমাজ কি করে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জীবন থেকে সম্ভাবনার সুযোগগুলোকে কেড়ে নিয়ে নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে সেটা দেখিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি যে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পক্ষে আবেগ সৃষ্টি করেছেন বা পরিবর্তনের জন্য পথের ইশারা তুলে ধরেছেন এমন নয়। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সংস্কারপন্থি। পথের দাবী ও শেষ প্রশ্ন’তে চরিত্রগুলো সকলেই মধ্যবিত্ত। শরৎচন্দ্র এই শ্রেণিটিকে মমতার সঙ্গে দেখেন এবং এর দুর্দশায় অত্যন্ত পীড়িত বোধ করেন। তাঁর মন কাঁদে। ১৯২১ সালে লেখা ‘স্বরাজ-সাধনায় নারী’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন,

সমস্ত বাঙলা জীর্ণ হয়ে আসছে,Ñ দেশের যারা মেরুমজ্জা সেই ভদ্রগৃহস্থ পরিবার কি করে কোথায় ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে আসছে, সে আনন্দ নেই, সে প্রাণ নেই, সে ধর্ম্ম নেই; সে খাওয়া-পরা নেই; সমৃদ্ধ প্রাচীন গ্রামগুলো প্রায় জনশূন্য,Ñ বিরাট প্রাসাদতুল্য আবাসে শিয়াল কুকুর বাস করে।

কৃষকের অবস্থাটা নিশ্চয়ই আরও খারাপ ছিল; অভাগীর মা ও গফুরের দুর্দশার ছবি তো তাঁর নিজের লেখাতেই পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু তাদের জন্য তাঁর তেমন কোনো উদ্বেগ নেই; যেমন উদ্বেগ নেই মধ্যবিত্ত সব্যসাচী, কমল বা আশুবাবুর। আশুবাবুর মন তো পড়ে আছে ভারতবর্ষের ও ইউরোপের কল্পিত অতীতে। কমল ও অজিত যে নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে সেটা তাদেরকে বাংলার দিকে টেনে আনবে না। নিয়ে যাবে পাঞ্জাবের অমৃতসরে, যেখানে অজিতের বাবার একটি বাংলো আছে। বাবা নেই, তার অবদানটি রয়ে গেছে। এই মধ্যবিত্ত জাতীয়তাবাদী, কিন্তু জাতির সংজ্ঞা যে কী সেটা তাদের কাছে মোটেই স্পষ্ট নয়। শেষ প্রশ্ন’তে জাতি শব্দটা নানা অর্থে ব্যবহৃত হয়। যেমন পুরুষ জাতি, নারী জাতি, নিম্নজাতি। হিন্দুস্তানি জাতি। পুরুষের, এমন কী মানবজাতির প্রসঙ্গও আসে। ভারতীয়রা যে একটি জাতি এ কথা তো বারবারই বলা হয়। কিন্তু ভারতীয়রা যে একজাতি তার প্রমাণ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে মোটেই পাওয়া যায় না। আগ্রা শহরে নিশ্চয়ই নানা প্রদেশের লোকের বসবাস ছিল; কিন্তু কই সেখানকার প্রবাসী বাঙালিদের তো অন্য ভাষাভাষীর সঙ্গে মেলামেলা করতে দেখা যাচ্ছে না; তাদের ওঠাবসা, আতিথেয়তা, আলাপ আলোচনা বাগ্বিতণ্ডা সব বাঙালিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বোঝা যায় বাঙালিরা একটা স্বতন্ত্র জাতি। এবং জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান ধর্ম নয়, ভাষা। বাংলা ভাষা তো কেবল হিন্দুর নয়, হিন্দু মুসলমান উভয়েরই ভাষা; তদুপরি মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, যা নিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শরৎচন্দ্রের রমেশ পর্যন্ত অনেকেই বিলক্ষণ চিন্তিত। সেই মুসলমান বাঙালিদের কেউই কিন্তু আশুবাবুর বৃত্তের ভেতর উপস্থিত নেই। হতে পারে মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান আগ্রা পর্যন্ত যাবার সামর্থ্য তখনও অর্জন করেনি, কিন্তু যদি তারা আগ্রাতে থাকতও তাহলেও কি প্রবেশাধিকার পেতো আশুবাবুর উদার গৃহে? মোটেই না। মুসলমান কেন, কমল নিজেই তো প্রবেশাধিকার পাচ্ছিল না। আশুবাবুর বৃত্তের সঙ্গে তার সত্যিকার যোগাযোগ আশুবাবুর বাড়িতে ঘটেনি, ঘটেছে তাজমহলের নিচে, যেখানে তারা কয়েকজন গেছিল দর্শনার্থী হিসেবে। আশুবাবুর গৃহে সে প্রবেশাধিকারটা পেয়েছে শিবনাথের কারণে। ছিল তার রূপেরচ্ছটা, ছিল অতুলনীয় বাক্শক্তি। তারপরেও নিশ্চিত হতে পারেনি নিজের স্থিতি বিষয়ে। বারবার পিতার মহৎ পরিচয়কে উপস্থিত করতে হয়েছে সনদপত্র হিসেবে। এবং এও বলতে হয়েছে যে সে নীচু জাতের মানুষ নয়; তার মাতামহ তাঁতি ছিল না, ছিল কবিরাজ। ‘জাতি’তে তারা বৈদ্য। খবরটা সে অজিতকে দিয়েছে, যার সঙ্গে সে বসবাস করবে বলে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মধ্যবিত্তকে না চিনে কমলের উপায় নেই। এই মধ্যবিত্ত অত্যন্ত শ্রেণিসচেতন। যে বাঙালি গরিব বা নিম্নবর্গের তাকে তারা চেনেই না। আগ্রায় আশুবাবুর গৃহে কোনো পাঞ্জাবি বা মাদ্রাজিকে দেখা যাবার কথা নয়, দেখা যায়ওনি। সে বাড়িতে গরিব বাঙালি যদি কেউ থেকে থাকে তবে আছে চাকর-বাকর দাস-দাসি হিসেবে, আপনজন হিসেবে নয়। আশুবাবুর আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মজ্ঞান তাঁকে সংকীর্ণ ও বিচ্ছিন্নই করেছে; উদার করতে পারেনি। মস্ত বড় জমিদার হওয়ার কারণে তাঁকে ইউরোপে মানিয়েছিল, আগ্রাতেও মানায়, কলকাতায় মানাতো না, বাংলার মফস্বল শহরে তো নয়ই। কাহিনির শেষে তিনি ইউরোপ যাত্রা করেছেন, যেমন করেছিলেন তার দু’জন পূর্বসূরি, রাজা রামমোহন রায় ও প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, যাঁরা ইউরোপেই দেহরক্ষা করেছেন। আশুবাবুও সেটাই করবেন। হিসেবে কোনো ভুল নেই। অজিত কমলকে নিয়ে যাচ্ছে অমৃতসরে, পরে তারা যদি ইংল্যান্ডে চলে যায় তবে সেটা বিস্ময়ের ব্যাপার হবে না, কমলের নিজের দেহে আছে সাহেবের রক্ত, আর অজিত যতই স্বদেশী হোক সেও তো বিলেতেই শিক্ষিত, এবং পড়েছে সে এক আধা-বিদেশিনীর হাতে। এই সচেতনতাতেই কৃষকের জন্য তাদের মনের সকল দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। কৃষকের ব্যাপারে সব্যসাচী ভীষণ উন্নাসিক, তাদেরকে তিনি মনে করেন চলার পথে অন্তরায়। কমলের মনে কৃষকের কথা না- আসাটাই স্বাভাবিক। আসেও না। তার মা দাসীর কাজ করেছে, বাবা ইংরেজ সাহেব, কিন্তু নিজে সে বাঙালি মধ্যবিত্ত। খ্রিষ্টান নয়, হিন্দু। এবং সে জন্যই গ্রহণযোগ্য; অন্যদের কাছে তো বটেই, ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্রের কাছেও। ভদ্র বিপ্লবী সব্যসাচীর জগতে খ্রিষ্টান ভারতীয়র স্থান আছে, কোনো মুসলমানের স্থান নেই। মুসলমানরা অনগ্রসর, সেটাই প্রধান কারণ। তবে তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি যে অস্বস্তিকর সেটাও সত্য। সব্যসাচী যে-কৃষকদের ব্যাপারে উন্নাসিক, তাদের বেশির ভাগই কিন্তু মুসলমান। এবং ওই উন্নাসিকতার ভেতর সাম্প্রদায়িকতার ছায়াপাত ঘটেনি বলাটা হবে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার নামান্তর। ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার উপদ্রব কতটা অমঙ্গলজনক ছিল এবং তার পরিণতি যে কেমন ভয়াবহ হয়েছিল তার জ্বলন্ত সাক্ষীগুলো ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হয়েছেÑ কেবল ১৯৪৭-এ নয়, তার পরেও। সাম্প্রদায়িকতা ধর্মকে ব্যবহার করে আশ্রয় ও অস্ত্র হিসেবে তৎপরতা চালিয়েছে। বাঙালি যে বাঙালি সেটা ধর্মের কারণে নয়, ভাষার কারণে; বাঙালি মধ্যবিত্ত (যারা রাজনীতির ও সমাজনীতির নিয়ন্ত্রণকর্তা) এই কথা মুখে মুখে যে-ভাবে বলেছে, অন্তরে সেভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব ছিল হিন্দু মধ্যবিত্তের, কারণ মুসলমানদের তুলনায় তারা এগিয়েছিল; কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে তাদের রাজনৈতিক কর্তারা বাঙালি পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে খণ্ডিত করে ফেলেছে। ওই পথে সাম্প্রদায়িকতার প্রবেশ সহজ হয়েছে। পরিণামে দেশ ভাগ হয়ে গেছে। মুসলমানরাও সাম্প্রদায়িক ছিল, অবশ্যই; কিন্তু তারা অগ্রসর হিন্দুর পথ ধরেই এগিয়েছে; সঙ্গে ছিল ইংরেজের প্ররোচনা। কাজটা কিন্তু অনগ্রসর কৃষক করেনি; হিন্দু মুসলমান কৃষক পরস্পরকে শত্রুজ্ঞান করেনি, হিন্দু মুসলমান মধ্যবিত্ত যেভাবে করেছে। নেতৃত্ব ছিল যাদের হাতে তারা ছিল পিতৃতান্ত্রিকÑউভয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেই। ধর্মকে গুরুত্ব না দিয়ে ভাষা ও শ্রেণিকে গুরুত্ব দিলে এই বিপত্তিটা ঘটত না। সাহিত্যও এ ব্যাপারে সাহায্য করেনি, হৃদয়বান শরৎচন্দ্রের কাছ থেকেও সাহায্য পাওয়া যায়নি।
জাতীয়তাবাদ কিভাবে সাম্প্রদায়িকতা দ্বারা খণ্ডিত হয়ে গেছে তার দৃষ্টান্ত শরৎচন্দ্রের নিজের বক্তব্যেও পাওয়া যাবে। শরৎচন্দ্র বাঙালির বাঙালি পরিচয় সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। ১৯২৩ সালে লিখিত তাঁর প্রবন্ধে ‘দিনকয়েকের ভ্রমণ-কাহিনীতে’ আছে,

বাঙ্গালার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে অতিশয় কাছে করিয়া দেখিবার অবকাশ পাইয়াছিলাম। যতই দেখিয়াছি ততই অকপটে মনে হইয়াছে, এই ভারতবর্ষে এত দেশ এত জাতির মানুষ দিয়া পরিপূর্ণ বিরাট বিপুল জনসঙ্ঘের মধ্যেও এত বড় মানুষ বোধ করি আর একটিও নেই। [...] অনেকদিন পূর্বে তাঁহারই একজন ভক্ত আমাকে বলিয়াছিলেন, দেশবন্ধুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা প্রায় তুল্য কথা।

প্রবন্ধটি লেখার সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। ওই বছরেই চিত্তরঞ্জনের উদ্যোগে ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ স্বাক্ষরিত হয়, যার দরুন সাম্প্রদায়িক সমস্যা সমাধান ও বাংলার রাজনীতিকে সর্বভারতীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্নকরণ উভয়ক্ষেত্রেই একটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়েছিল। শরৎচন্দ্র ওই পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন বলে ধারণা করা যায়। দু’বছর আগে চিত্তরঞ্জনের কারামুক্তি উপলক্ষে যে সংবর্ধনার অনুষ্ঠান হয় তার অভিনন্দনপত্রটি রচনার ভার পড়েছিল শরৎচন্দ্রের ওপর। সেটিতে চিত্তরঞ্জনকে উদ্দেশ করে তিনি লিখেছিলেন,

তোমার সকল গর্ব্বের বড় গর্ব্বÑ বাঙালী তুমি, তাই ত’ সমস্ত বাঙ্গালীর হৃদয় তোমার কাছে আজ বহিয়া আনিয়াছিÑ আর আনিয়াছি, বঙ্গজননীর একান্ত মনের আশীর্ব্বাদ [...]

হিন্দু-মুসলমানের ব্যবধান ও বিরোধ এখানে স্থান পায়নি। সবাই বঙ্গজননীর সন্তান হয়ে গেছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাঙালির হিন্দুর এবং মুসলমানের উভয়েরই মনের ভেতর থেকে বিরোধের চিন্তা যে অপসারিত হয়েছিল তা নয়। শ্রীকান্ত নামের উপন্যাসে সেই যে উক্তি শ্রীকান্তের, ‘ইস্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমান ছাত্রদের ফুটবল ম্যাচ’ চলছিল তার অন্তর্স্থিত ব্যবধানের নির্দেশিকাটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় মধ্যবিত্তের চিত্রভূমিতেই সংস্থাপিত ছিল। উৎপাটিত হয়নি, বরঞ্চ বিকশিত হয়েছে। ফলে বাঙালি বাঙালি থাকতে পারেনি, হিন্দু এবং মুসলমানে পরিণত হয়ে গেছে। চতুর ইংরেজ যে সাম্প্রদায়িক ব্যবধানকে বিরোধে পর্যবসিত করার চেষ্টা করছিল সেটা তো এক নির্মম সত্য। তাদের একটা কায়দা ছিল হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য পৃথক পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। ভোটাধিকার ছিল অত্যন্ত সীমিত, শতকরা দুইজন থেকে বাড়তে বাড়তে ১৯৪৬-এ সেটি এসে দাঁড়িয়ে ছিল শতকরা ভারতে; এদেরকেই আবার ভাগ করা হয়েছিল হিন্দু-মুসলমানে, জনসংখ্যার অনুপাতে। ১৯৩২-এর সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদে হিন্দু আসন সংখ্যাকে আবার ভাগ করে দেওয়া হলো হিন্দু ও তফসিলিদের মধ্যে। এতে হিন্দু আসন বলতে আগে যা বোঝাতো তার সংখ্যা আরও কমে গেল। এর দরুন স্বভাবতই হিন্দু সম্প্রদায়ের মুখপাত্ররা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। বাংলায় তাঁদের প্রতিবাদটি হয়েছিল বেশ জোরেশোরে। যাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে শরৎচন্দ্রও ছিলেন। সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ যখন আইনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় তখন কলকাতায় অনুষ্ঠিত দু’টি প্রতিবাদ সভার একটিতে তিনি ছিলেন উদ্বোধক, অপরটিতে সভাপতি। ১৯৩৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের প্রতিবাদ সভায় উদ্বোধনী বক্তৃতায় তিনি বলেন যে, হিন্দু জনগণের ওই সভায় যারা উপস্থিত তাদের।

সকলের বর্ণ হয়তো এক নয়, কিন্তু ভাষা এক, ধর্ম্ম এক, জীবনযাপনের গোড়ার কথাটা একÑ যে বিশ্বাস যে নিষ্ঠা আমাদের ইহলোক পরলোক নিয়ন্ত্রণ করে সেখানেও আমরা কেউ কারো পর নয়। [...] যুগ যুগান্ত থেকে [...] বন্ধন আমাদের এক করে রেখেছে [...] [‘সাম্প্রদায়িক বটোয়ারা’]

ধর্মের কথাটা এসে গেছে। না-এলেই ভালো ছিল। কিন্তু না-এসে তো উপায় ছিল না। সভাটি যেখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের সেখানে হিন্দু পরিচয়টা তো আসবেই। ভাষাভিত্তিক পরিচয়টিকে সরিয়ে দিয়ে ধর্মভিত্তিক পরিচয় যে প্রধান হয়ে উঠবে, এবং হিন্দু সম্প্রদায় ‘হিন্দু জাতিতে’ পরিণত হবে, সেটাতো অনিবার্যই। এই অনিবার্যতাটা যে রাজনীতির ফল সেটা হলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, ওই রাজনীতিই তখন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ভিন্ন একটা রাজনীতির ধারাও গড়ে উঠতে পারত, যেটা অসাম্প্রদায়িক, অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ, যার ভিত্তি হতে পারত ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এই সত্যটাকে সামনে নিয়ে আসতে পারত যে ভারতবর্ষ বহু ভাষার দেশ, এবং ভাষার ওই বিভিন্নতাই জানিয়ে দিচ্ছে যে উপমহাদেশে একটি জাতি নেই, রয়েছে অনেক ক’টি জাতি। ওই সত্যের উল্লেখ পূর্বোদ্ধৃত শরৎচন্দ্রের ‘দিন-কয়েকের ভ্রমণ-কাহিনীতে’ রয়েছে, যেখানে শরৎচন্দ্র বলেছেন যে ভারতবর্ষ বহু জাতির মানুষে পরিপূর্ণ। শেষ প্রশ্নে উপন্যাসের কুশীলবেরাও কিন্তু ওই একই বাস্তবতার মুখোমুখিই হয়েছিল, যখন তারা বাঙালিদের বৃত্তের ভেতরেই চলাফেরা করেছে, পাঞ্জাবি, মারাঠী, তামিল বা গুজরাটিদের সঙ্গে তাদের দেখাশোনাই হয়নি। পিতৃপরিচয়কে অবজ্ঞা করে আসামের চা বাগান থেকে কমল যে আগ্রার বাঙালি মহলে চলে এসেছে সেটাও সম্ভব হয়েছে মূলত ওই ভাষার কারণেই। কমলের মুখে বাংলা ভাষাটা ছিল সম্পূর্ণ নির্ভুল ও অবিকৃত। ভারতবর্ষের মানুষের জন্য প্রধান সমস্যাটা ছিল শ্রেণিবিভাজনের, যার দরুন আশুবাবুর বাঙালি দাসিটি (ছিল কিনা জানি না) দাসিই রয়ে গেছে, সে বাঙালি হতে পারেনি। তার পক্ষে ভারতীয় হওয়াটা তো ছিল একেবারেই অসম্ভব। আর ওই শ্রেণিসমস্যার সমাধানের জন্যই দরকার ছিল জাতিসমস্যার সমাধান করা। উপমহাদেশটি যে ইউরোপের মতোই বহুজাতির একটি দেশ এটা মেনে নিলে দেশভাগের ঘটনা হয়তো ঘটতো না, বাংলা এবং পাঞ্জাবও হয়তো দ্বিখণ্ডিত হতো না। কিন্তু এই ধরনের ‘জাতীয়তাবাদী’ রাজনীতি তো গড়ে ওঠেনি। এমন কি কমিউনিস্টরাও এই বাস্তবতাটিকে তুলে ধরতে পারেননি যে ভারতবর্ষ হচ্ছে শ্রেণিবিভক্ত একটি বহুজাতির দেশ। একে এক জাতির ও এক কেন্দ্রের করতে চাওয়াটা মারাত্মক এক অপরাধ। কমিউনিস্টদেরই পারার কথা ছিল, না-পারার ফল তারা নিজেরা ভোগ করেছে, করেছে দেশবাসীও। শরৎচন্দ্রের নিজের জাতীয়তাবাদী অবস্থানটি তাঁর নায়ক সব্যসাচীর মতোই। সে-অবস্থান যেমন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তেমনি সমাজতন্ত্রবিরোধী। অবস্থানটি শ্রেণিবিভাজনকে অক্ষুণœ রেখে ক্ষমতা দখলের। এঁরা উভয়েই মধ্যবিত্ত। উভয়েই নিজেদের শ্রেণিকেই মনে করেন জাতি, যদিও কথাটা তাঁরা কিছুতেই স্বীকার করবেন না। সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী দ্বিতীয় সভাটিও অনুষ্ঠিত হয় কলকাতাতেই, দু’সপ্তাহ পরে। জুলাই মাসের ৩০ তারিখে। সেখানে শরৎচন্দ্র মনে হয় আরও বেশি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি বলেছেন, বাঙলা-সাহিত্যকে বিকৃত করার কথা হীন চেষ্টা চলছে। কেউ বলছেন, সংখ্যার অনুপাতে ভাষার মধ্যে এতগুলি ‘আরবী’ কথা ব্যবহার কর; কেউ বলছেন, এতগুলি ‘পারসী’ কথা ব্যবহার কর; আবার কেউ বা বলছেন, এতগুলি ‘উরদু’ কথা ব্যবহার কর। এটা একেবারে অকারণ,Ñ যেমন ছোট ছেলে ছুরি পেলে বাড়ির সমস্ত জিনিস কেটে বেড়ায়, এও সেই রূপ। [...] আমি মুসলমান ভাইদের বলছি, তোমার সংস্কৃতির উপর নজর রেখো, সাহিত্যের উপর নজর রাখো, আর ছোট ছেলেদের মত ধারালো ছুরি হাতে পেয়েছ বলেই সব কেটে ফেলো না।

অভিযোগটা একেবারেই অন্যায্য। ‘সংখ্যার অনুপাতে’র ব্যাপারটা তো এই রকমের দাঁড়ায় যে মুসলমানের সংখ্যা যেহেতু বেশি তাই তারা সংখ্যার জোরে বাংলাভাষাকে আরবি ফার্সি শব্দ ঢোকাবার তাল তুলে মাতৃভাষাকে রক্তাক্ত করে ছাড়বে। সত্য কিন্তু উল্টোটা। মাতৃভাষার বিকৃতিটা আসলে সংখ্যালঘু ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরাই ঘটিয়েছিল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়াতে। সংখ্যার জোরে নয়, শাসকের সমর্থনের এবং নিজেদের শ্রেণিগত ক্ষমতার জোরে। বাংলাভাষী মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতার অজুহাতে আরবি ফার্সি শব্দের ব্যবহারের দাবি তোলেনি, তাদের চাহিদা এই পর্যন্ত ছিল যে আরবি-ফার্সি-উদ্ভূত যেসব শব্দ দিনানুদৈনিক ব্যবহারের ফলে বাংলাভাষার অংশ হয়ে গেছে তাদেরকে নির্বাসিত করা চলবে না। মুসলমানের সংখ্যাবৃদ্ধির ভয়টা যে হিন্দু সমাজপিতাদেরকে শঙ্কিত করেছে সে-ঘটনা বাংলার ইতিহাসের সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে প্রত্যক্ষরূপে জড়িত। সাহিত্যে তথাকথিত আরবি ফার্সি শব্দের যে ব্যবহার নজরুল করেছেন, তাতে সাহিত্যের কোনো ক্ষতি হয়নি, উল্টো ধারণক্ষমতা ও প্রকাশক্ষমতা এবং সৌন্দর্য-সব দিক থেকেই ভাষার উপকার ঘটেছে। নজরুলের ওই কাজে অস্বস্তি বোধ করেছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, ‘খুন’ শব্দের ব্যবহারে তিনি আপত্তি করেছিলেন। নজরুলের জবাব শুনে অবশ্য তিনি এ বিষয়ে আর কিছু বলেননি। শরৎচন্দ্র দেখা যাচ্ছে মুসলমানদের হাতে ছুরি দেখতে পাচ্ছেন; ভয় পাচ্ছেন তারা খুন-খারাবি ঘটিয়ে ফেলবে। এক্ষেত্রে শরৎচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গিটা যে মাতৃভাষার পক্ষে ছিল এমনটি বলা যাচ্ছে না, বরঞ্চ তাঁকে পিতৃতান্ত্রিক বলে সন্দেহ করতে হচ্ছে। সব তুলনাই আসলে অযথার্থ; তবু ভাষার ব্যাপারে পিতৃতান্ত্রিকতার সঙ্গে মাতৃ-অধিকারে বিশ্বাসীদের ব্যবধানটা বোঝার জন্য মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। কথাটা তিনিও একটি ভাষণেই বলেছিলেন। সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে পাকিস্তান তখন মাত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; সাহিত্য সম্মেলন বসেছিল ঢাকায়, ১৯৪৮-এর শেষ দিকে; তাতে শহীদুল্লাহ বলেছিলেন,

আমরা হিন্দু বা মুসলমানেরা যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোনো আদর্শের কথা নয়, এটি একটি বাস্তব সত্য। মা-প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছে যে তা মালা-তিলক-টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি-পাগড়িতে ঢাকবার জো’টি নেই। [শহীদুল্লাহ স্মারক গ্রন্থ, ঢাকা, ১৯৮৭, পৃ ৩৯৩]

শহীদুল্লাহর মুখে এমন কথা শুনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পিতৃতান্ত্রিকতার রক্ষকেরা সেদিন ভ্রƒকুটি করেছিল, আশঙ্কা ছিল শহীদুল্লাহ গ্রেফতার হবেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয়তা বিষয়ে তাঁর অবস্থানই জয়ী হয়েছে। ১৯৩৬ সালের ওই জুলাই মাসটিতে শরৎচন্দ্রকে বেশ ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। ১৫ ও ৩০ তারিখে কলকাতার দু’টি প্রতিবাদ সভাতে যোগ দিয়েছেন, মাঝখানে ২৫ তারিখে তাঁকে আসতে হয়েছে ঢাকায়। ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শরৎচন্দ্রকে ডক্টর অব লিটারেচার উপাধিতে ভূষিত করে। একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও ওই উপাধি দেওয়া হয়, রবীন্দ্রনাথ অবশ্য উপস্থিত থাকতে পারেননি। নজরুলকে কিন্তু তখন ডক্টর উপাধি দেওয়া হয়নি, যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কলকাতার লোকেরা কেউ কেউ নাক উঁচিয়ে বলতেন ‘মক্কা ইউনিভারসিটি’। শরৎচন্দ্রের ঢাকা-উপস্থিতি এখানে স্মরণীয় জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তাঁর একটি বক্তব্যের কারণে, বক্তব্যটি তিনি দিয়েছিলেন ঢাকার মুসলিম সাহিত্যে সমাজের বার্ষিক অধিবেশনে। স্বভাবতই বিষয়টা ছিল হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে। হাবীবুল্লাহ বাহার ও শামসুন নাহার মাহমুদ সম্পাদিত বুলবুল পত্রিকায় শরৎচন্দ্র একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ‘অবাঞ্ছিত ব্যবধান’ নাম দিয়ে সেটি নিয়ে একটি পাল্টা বক্তব্য এসেছিল লীলাময় রায়ের কাছ থেকে। অনুমান করা হয় যে, লীলাময় রায় অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছদ্মনাম। শরৎচন্দ্র তাঁর লেখাটিতে গুরুত্ব দিয়েছিলেন সাহিত্যের মাধ্যমে মিলন সৃষ্টির ওপর, লীলাময় রায়ের বক্তব্য ছিল এই রকমের যে, বিরোধের প্রতিকার যদি থাকে তা সাহিত্যে নেই, আছে ‘স্বাজাত্যে’। লীলাময়ের ভাষায় : “ঐক্য জিনিসটা ড়ৎমধহরপ, হাড়ের সঙ্গে মাংস জুড়লে যেমন মানুষ হয় না, তেমনি হিন্দুর সঙ্গে মুসলমান জুড়লে বাঙালী হয় না, ভারতীয় হয়।” শরৎচন্দ্র বলেছেন কথাটার অর্থ তিনি বোঝেননি। লীলাময়ের বক্তব্যের অর্থটা কিন্তু মোটেই দুর্বোধ্য নয়, এবং পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত। স্বাজাত্য বলতে লীলাময় বুঝিয়েছেন ‘জাতীয়তাবাদ’কে, যে-জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হবে ভাষা। বাঙালি হতে হলে বাঙালিকে ভাষার কাছে যেতে হবে। তা না করে সে যদি নিজের হিন্দু অথবা মুসলমান পরিচয়টাকেই প্রধান করে তোলে তাহলে সে আর বাঙালি থাকবে না, হয়ে যাবে ভারতীয় হিন্দু কিংবা ভারতীয় মুসলমান। উপমহাদেশের রাজনীতির বড় ট্র্যাজেডিটাই কিন্তু ছিল ওইখানেই, সর্বভারতীয় হবার ওই চেষ্টাতেই। সর্বভারতীয় হতে গিয়ে বাংলার মানুষ তখন নিজের জাতীয় পরিচয় থেকে উৎপাটিত হয়ে ধর্মীয় পরিচয়ের খপ্পরে গিয়ে পড়েছে, এবং স্বাধীনতার সংগ্রামকে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে পরিণত করার কাজে কাঁধ লাগিয়েছে। বিপদটা চিত্তরঞ্জন টের পেয়েছিলেন, শরৎচন্দ্র যে খেয়াল করেননি সেটা মানতেই হবে। ধরা যাক তাঁর নিম্নলিখিত উক্তিটির কথা, যেটি তিনি করেছেন ১৯৩৪-এ লিখিত ‘বর্তমানের রাজনৈতিক প্রসঙ্গ’ নামক প্রবন্ধটিতে

[...] অধিকাংশ ধনী মুসলমানই নায়েব, গোমস্তা, উকিল, ডাক্তার হিসেবে স্বজাতির চেয়ে হিন্দুদের বিশ্বাস করেন বেশী। সঙ্গে সঙ্গে এও আমি বলব যে, প্রত্যেক হিন্দুই মনে প্রাণে ন্যাশনালিস্ট। ধর্ম বিশ্বাসেও তারা কারও চেয়ে ছোট নয়।

ধর্ম, জাতি, ন্যাশনালিজম, এখানে একাকার হয়ে গেছে। একটাকে আরেকটা থেকে আলাদা করা কঠিন। ১৯৩৬-এর ৩০শে জুলাইয়ের বক্তৃতাটিতে শরৎচন্দ্র একটা কর্তব্য এবং আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। সেটা এরকমের,

এই যে অন্যায়টা আমাদের উপর হয়েছে, তার প্রতিকার করতেই হবে; তা না হলে দশ বছর পরেÑ বাঙালি আজ যা নিয়ে গৌরব করছে-তার কিছুই থাকবে না। ১৯৩৬-এর পর দশ বছর ধরে ‘প্রতিকারে’র চেষ্টা দু’পক্ষ থেকেই করা হয়েছে। উভয়পক্ষের নেতারাই ধর্মের পরিচয়কে প্রাধান্য দিয়েছেন, ভাষার পরিচয়কে ভুলে গিয়ে। ছুরি হাতে দৌড়াদৌড়ি চলেছে। কাজটা অবুঝ ছোট ছোট ছেলেরা করেনি, বয়স্ক বুদ্ধিমানেরাই করেছে। তাদের এই পিতৃতান্ত্রিক আচরণের দরুন মাতৃভূমি দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। শরৎচন্দ্রের আশঙ্কা সত্যে পরিণত হয়েছে, দশ বছর পরে বাঙালি তার গৌরব হারিয়েছে, কারণ বাঙালি তো আর বাঙালিই থাকতে পারেনি, একপক্ষ হয়ে গেছে ভারতীয়, অন্যপক্ষ পাকিস্তানি। জাতীয়তাবাদী সুভাষচন্দ্র বসু খাঁটি বাঙালি ছিলেন। তাঁর আজাদ হিন্দু ফৌজ-এ সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান ছিল না। প্রবাস থেকে বেতার ভাষণে গান্ধীকে তিনি সম্বোধন করেছিলেন ‘জাতির পিতা’ বলে। কার্যক্ষেত্রে কিন্তু এমনটা দাঁড়িয়ে গেল যে গান্ধী হয়ে পড়লেন ভারতীয় হিন্দু ‘জাতি’র পিতা, কেননা তাঁর বিপরীতে ভারতীয় মুসলিম ‘জাতি’র একজন পিতা দাঁড়িয়ে গেলেন। ওই দু’জনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাটা ব্যক্তিগত রইল না, হয়ে গেল ‘জাতিগত’। দ্বিখণ্ডিতকরণ থেকে ভারতবর্ষকে যে রক্ষা করবেন সেটা তাঁরা পারলেন না। ভারতবর্ষকে এক রাখার ব্যাপারে সুভাষচন্দ্র ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ রূপে অসাম্প্রদায়িক, কিন্তু তাঁর জাতীয়তাবাদেও দুর্বলতা ছিল। তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন, কিন্তু সেই সঙ্গে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, তার সমাজতন্ত্র মার্কস-এঙ্গেলসের নয়, এটি হলো ভারতীয়, অর্থাৎ জাতীয়। সমাজতন্ত্র যদি জাতীয় হয় তাহলে তা কেমন বিপজ্জনক হতে পারে সেটা তো ততদিনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, ইউরোপে হিটলারের তৎপরতার ভেতর দিয়ে। সমাজতন্ত্রকে জাতীয়তাবাদ দ্বারা আক্রান্ত হবার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলেন কিন্তু সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সুভাষচন্দ্রও। তাঁর দেশপ্রেমিক অবস্থানের অভ্যন্তরে পিতৃতান্ত্রিকতা ছিল না এমনটা বলা যাবে না। ছিল। ভালোভাবেই ছিল। তিনি ‘ভারতীয়’ জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছিলেন; ভারত যে একটি বহুজাতিক দেশ এ সত্যের স্বীকৃতি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তায় স্থান পায়নি। সুভাষচন্দ্রের জাতীয়তাবাদের দুর্বলতা পরবর্তীকালে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নমুখী রাজনৈতিক তৎপরতার ভেতর প্রকাশ পেয়েছে। ওই পরিবারের একজন সদস্য একাত্তরে বাংলাদেশের নারী-নির্যাতনের ওপর ‘গবেষণা’ করে প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে নির্যাতনটি সে-মাত্রায় হয়নি যে-মাত্রায় হয়েছে বলে প্রচার পেয়েছে। তাঁকে বলা যায় পাকিস্তানপন্থি দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন। আরেকজন যোগ দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসে; অপর একজনকে দেখা যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) হয়ে কলকাতার একটি আসন থেকে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এই ২০১৬-তে। এঁরা আর যাই হোন সমাজতন্ত্রী নন। তদুপরি পিতার অভাবে বংশধররা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছেন। পিতৃতান্ত্রিকতার বড় একটা অসুবিধা এখানেও। শরৎচন্দ্র চলে গেছেন ১৯৩৮ সালে। তাঁর মৃত্যুর পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িকতার প্রতাপ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃদ্ধির ওই কাজটা মধ্যবিত্তই করেছে, নিজেদের স্বার্থে। এরা সেই মধ্যবিত্ত যারা গণতান্ত্রিক হতে পারেনি, অধিকার ও সুযোগের সাম্যে যাদের বিশ্বাস ছিল না, যাদের ভেতর ছিল সামন্তবাদী পিছুটান। শরৎচন্দ্রের সাহিত্য মধ্যবিত্তকে সামন্তবাদের আওতা থেকে বের হয়ে আনার ব্যাপারে সাহায্য করবে বলে মনে হয়েছিল, কার্যক্ষেত্রে কিন্তু করেনি। লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বর্ষ ৯, সংখ্যা ১৪

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz