জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা

Monday, October 17, 2016


আত্মপ্রত্যয় সেইসঙ্গে স্বাজাত্যবোধ জাতীয়তাবাদের ভিত রচনা করে থাকে। এইজন্যে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জাতীয়তাবাদ প্রধান শক্তি হিশেবে প্রেরণা জুগিয়ে চলে। ধূর্জটিপ্ৰসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতে- "Sense of community বা সমাজবোধ নষ্ট হবার পরই শূন্যতা ভরাট করবার জন্যে জাতীয়তার (nationalism) প্রয়োজন হয়। ব্যক্তি যেমন এক, নেশন বা জাতিও তেমনই একটি; ব্যক্তি যেমন লাভের জন্য দুঃসাহসী, জাতিও তেমনই শক্তিপ্ৰসারে অভিলাষী ।" এই যে শক্তিপ্রসারে অভিলাষী কথা এর থেকেই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে জাতীয়তাবাদ কখনো কখনো স্বৈরাচারী হওয়ার পথ সুগম করে দিতে পারে। যেমন ঘটেছিল হিটলারের আমলের জার্মানীর বেলায়। তাই জাতীয়তাবাদীদের জন্যে রবীন্দ্রনাথ সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন এই বলে যে, “এইরূপ উপলব্ধি করিব যে স্বজাতির মধ্য দিয়া সর্বজাতিকে ও সর্বজাতির মধ্য দিয়া স্বজাতিকে সত্যরূপে পাওয়া যায়।” এমনকি তাঁর "Nationalism' প্ৰবন্ধটি বিস্মৃত হওয়া চলবে না জাতীয়তাবাদীদের। কেননা সেখানে আছে : "Nations, who sedulously cultivate moral blindness as the cult of patriotism, will end their existence in a sudden and violent death." আর একটি কথা তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, "যে জাতির মধ্যে বর্ণসংকরতা খুব বেশি ঘটেছে তার মনটা এক ছাঁচে ঢালাই হয়ে যায় না। প্রকৃতিবৈচিত্র্যের সংঘাতে তার মনটা চলনশীল হয়ে থাকে। এই চলনশীলতায় মানুষকে অগ্রসর করে, এ কথা বলাই বাহুল্য।"
কখনো কখনো জাতীয়তাবাদ গোষ্ঠীর সঙ্গে গোষ্ঠীর সংঘর্ষ বাঁধায়, যার ফলে মানবকল্যাণের পরিবর্তে স্বীয় স্বার্থসাধনই বড় হয়ে পড়ে। নিপীড়িত যারা তারা জাতীয়তাবাদকে মুক্তির সরল পথ হিশেবে ধরে নিয়ে একতাবদ্ধ হয়। বিবেকবান নেতৃত্বও এই সঙ্গে দরকার। সুতরাং সার্বিক মুক্তির পথ জাতীয়তাবাদ এক মাত্র পথ নয়।
সব কারণ খতিয়ে দেখলে বোঝা যায় যে জাতীয়তাবাদ জটিল একটি বিষয়। জাতিপ্রেম একটি জাতিকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যে তাকে পথ দেখাতে পারে, পারে তাকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন করতে। আবার মোহমুগ্ধ করে এক ধরনের সংকীর্ণতাও এনে দিতে পারে। ক্ষমতার অন্ধতা শুভবােধ থেকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে।
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব হলো তার সৃজনশীলতা। এই সৃজনশীলতা বন্ধনমুক্তির ফলেই সম্ভব হয়। তাই ব্যক্তিস্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিতে হয়। সৃজনশীলতাকে আমরা পেতে পারি সংস্কৃতিতে। সংস্কৃতিই সর্বমানবের মধ্যে মেলবন্ধন সৃষ্টি করে। বিশ্বমানুষের রূপ আবিষ্কার করতে করতে এগিয়ে যেতে হবে মানুষকে। জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তাই মেলাতে হবে বিশ্বমানুষের স্বরূপকে। এই অম্বিষ্টকে সামনে রেখে জাতীয়তাবাদীদের এগিয়ে যেতে হবে।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর চিন্তাবিদ হিশেবে খ্যাতি আছে আমাদের দেশে। যথেষ্ট শ্রম স্বীকার করে জাতীয়তাবাদের মতন জটিল বিষয়কে নিয়ে তিনি কয়েকটি গ্ৰন্থ রচনা করেছেন। আমার কথা গুলো তাঁর সাম্প্রতিক একটি বই “জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগনের মুক্তি” প্রকাশ করেছে সংহতি। প্রায় দশ বছর ধরে তিনি লিখেছেন এই বইটি। বইটির ফ্ল্যাপে বইটি সম্পর্কে লেখা আছে;
“উনিশ শ’ পাঁচ সালের প্রথম বঙ্গভঙ্গ থেকে শুরু করে উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালের জনগণের মুক্তি গ্রন্থটি প্রচলিত অর্থে ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং ঘটনার তাৎপর্য অনুসন্ধানের বিশিষ্টতায় অনন্য। বাঙালীর জাতীয়তাবাদের বিকাশটি ঘটেছিল এই সময়টুকুর মধ্যে, বিশেষ করে প্রথমবারের বঙ্গভঙ্গের প্রতিরোধ যে তীব্র দেশাত্মবোধের আর আত্মোপলব্ধির সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, তারই হাত ধরে। অন্যদিকে ওই বঙ্গভঙ্গের মধ্য দিয়েই বাংলায় আধুনিক সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের ইতিহাসটিরও শুরু। এই হাত ধরাধরি করে চলা জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতির আড়ালে, কিভাবে তাদের শ্রমিক বা কৃষক পরিচয়কে ভুলিয়ে ভারতীয় বা পাকিস্তানী, হিন্দু বা মুসলিম পরিচয়কেই সামনে টেনে এনে প্রধান পরিচয় বানিয়ে দেয়া হয়েছিল, সেটাও বর্তমান গ্রন্থের অন্যতম উপজীব্য।
জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা উভয়ের উত্থানের ওই সময়টুকুতে সমাজের সক্রিয় অংশগুলোর মনস্তত্ব ও আকাঙ্ক্ষাকে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন একদিকে তাদের ক্রিয়াকাণ্ড, অন্যদিকে সমকালীন সাহিত্যের সাক্ষ্যসহ নানান উপাদান ব্যবহার করে। এক একটা যুগ এবং তাতে ভূমিকা রাখা সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মনোভাবকে উপলব্ধির জন্য সাহিত্যিক নিদর্শনগুলোর এত গভীর ও বিপুল ব্যবহার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর আগে খুব কমই হয়েছে বাংলা ভাষায়।
১৯০৫-৪৭ কালপর্বের ঘটনাবলীর বীজ অনুসন্ধানের প্রয়োজনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেমন অনায়াসে বিচরণ করেছেন এর আগেকার উনিশ শতকের কখনো কখনো চিহ্নিত করেছেন আমাদের চারপাশের বাস্তবতায়।”
‘বঙ্গভঙ্গ এবং তারপর’ বইটির প্রথম পরিচ্ছেদ। সেখানে লেখক জানাচ্ছেন;
“রাষ্ট্রীয় তৎপরতায় দেশ ভাগ হয়েছে দু’বার, রদ ঘটেছে একবার, উত্থান ঘটেছে নতুন রাষ্ট্রের, তার পতনও হয়েছে, কিন্তু যাদেরকে নিয়ে রাষ্ট্র সেই মানুষেরা কি সুখ, শান্তি ও স্বস্তি পেয়েছে? সন্ধান পেয়েছে কি মুক্তির? পায়নি যে সেটা তো খুবই স্পষ্ট। পেছনের দিকে তাকালে না-পাবার ইতিহাস এবং বঞ্চনার কারণ উভয় সম্পর্কেই ধারণা করা সম্ভব। আর এই পিছনে ফিরে তােকানোটা খুবই প্রয়োজন, সামনের দিকে এগোবার জন্য। আমাদের অতীতের মধ্যে বর্তমানের ব্যাখ্যা আছে, সেখানে নিহিত রয়েছে নিয়ামক শক্তির পরিচয়ও; সে-সম্বন্ধে না জানলে ভবিষ্যতের পদক্ষেপ দুর্বল ও অনিশ্চিত হতে বাধ্য।”
…বাংলাকে ভাগ করার ব্যাপারে সর্বাধিক আগ্রহ ছিল প্ৰকাশ্যতই বাঙালীবিরোধী লর্ড কার্জনের। তিনি বসে থাকেন নি, বঙ্গবিভাগের পক্ষে জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পূর্ববঙ্গ সফর করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় যাবার পথে ট্রেনে বসে কার্জন তৎকালীন ভারত সচিবকে একটি চিঠি লেখেন, যাতে বঙ্গভঙ্গের পেছনে আসল ইচ্ছাটা তিনি বেশ পরিষ্কারভাবেই বলেছেন; বলারই কথা, কেননা এ চিঠি শত্রুপক্ষের হাতে পড়তে পারে এমন কোনো আশঙ্কাই তার মনে ছিল না । সময় ১৭ই ফেব্রুয়ারী, ১৯০৪। কার্জন যা লিখছেন বাংলা অনুবাদ করলে তা এই রকমের দাড়ায়;
“বাঙালীরা, নিজেদেরকে যারা একটি জাতি বলে ভাবতে পছন্দ করে, এবং যারা এমন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে যখন ইংরেজদেরকে বিদায় করে দিয়ে কলকাতার গভর্নমেন্ট হাউজে একজন বাঙালী বাবুকে অধিষ্ঠিত করবে, তারা অবশ্যই তাদের ওই স্বপ্ন বাস্তবায়নে হস্তক্ষেপ ঘটাতে পারে এমন যে কোনো প্রতিবন্ধকের ব্যাপারে তীব্ৰ অসন্তোষ প্ৰকাশ করবে। আমরা যদি তাদের হৈচৈ-এর কাছে নতি স্বীকার করার মতো দুর্বলতা প্ৰকাশ করি, তাহলে আগামীতে বাংলাকে কখনোই খণ্ডিত বা দুর্বল করতে পারবো না, এবং ভারতের পূর্ব পার্শ্বে আপনি এমন একটি শক্তিকে সংযুক্ত ও দৃঢ় করবেন যেটি ইতিমধ্যেই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং ভবিষ্যতে তা ক্রমবর্ধমান গোলযোগের নিশ্চিত উৎস হয়ে দাড়াবে।”
জাতীয়তাবাদে ধর্মের প্রবেশ সম্পর্কে তিনি লিখছেন;
“...নেতৃত্ব যাদের হাতে ছিল তাদের অধিকাংশই ধর্মের প্রভাব ও প্রয়োজনীয়তাকে মানতেন। কারণ ছিল একাধিক। প্রথমত, ধর্ম ছিল তাদের সংস্কৃতি, অভ্যাস ও অনুভূতির অংশ। আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের পক্ষে সামাজিক, সাংস্কৃতিকভাবে তাে বটেই, ব্যক্তিগতভাবেও ধর্মের বাইরে যাওয়া কঠিন, যে জন্য ইহজাগতিকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা এখানে খুবই দ্বিধাগ্রস্ত। যেমন ধরা যাক, বাংলাদেশের কথা। এর প্রতিষ্ঠা ঘটেছে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে; কিন্তু সেখানে তাকে স্থির রাখা যায় নি। ধর্ম যে কেবল হৃদয়ের ব্যাপার তা নয়, বিশ্বাসের বস্তুও, এমন কি বললে অন্যায় হবে না, অনেক ক্ষেত্রেই তা স্নায়বিক ব্যবস্থারও অন্তৰ্গত হয়ে রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ধর্ম হচ্ছে মানুষের জন্য আশ্রয়। যারা পরাজিত হয়েছে তাদের জন্য তো বিশেষভাবেই। রাজনৈতিক আন্দোলনে ধর্মকে ব্যবহার করলে আন্দোলনকারীরা ঐশ্বরিক অনুপ্রেরণা, ভরসা, সাহস ইত্যাদি পান। মনে করবার সুযোগ ঘটে যে সরকারের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের পেছনে অদৃশ্য শক্তির সমর্থন আছে, যে জন্য সরকার যতই পীড়ন করুক না কেন পীড়নকারীর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। তৃতীয় একটি কারণও গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হচ্ছে এই যে, ধর্মের ভাষায় কথা বললে সেটা মানুষের কাছে সহজে গিয়ে পৌছায়, দ্রুত আবেদন সৃষ্টি করে, মানুষ অনুপ্রাণিত হয়, তারা সাড়া দেয়, কাছে আসে, ঐক্য গড়ে তোলে। লৌকিক ভাষার তুলনায় ধর্মীয় ভাষা সব সময়েই সরল ও সহজবোধ্য; সে-ভাষা শিক্ষিত মানুষ যেমন বোঝে, অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষেরও তেমনি বোধগম্য হয়। ধমীয় উপমা, রূপক, কাহিনী, বক্তব্যকে একাধারে সহজ, পরিচিত ও আবেগ-সমৃদ্ধ করে তোলে।
স্বদেশী আন্দোলনের নেতারা ছিলেন উচ্চশিক্ষিত মানুষ, তাঁদের মধ্যে কেউ এমন কি বাংলায় লিখতে ও বলতে অভ্যস্ত পর্যন্ত ছিলেন না, অন্যরাও যে ধরনের বাংলা ভাষা ব্যবহার করতেন সাধারণ মানুষের জন্য তা যে অত্যন্ত সহজবোধ্য হবে এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারতেন না। অন্যদিকে ধর্মের ভাষায় কথা বলার সময় তাঁরা নিজেরা যেমন অনুপ্রানিত বোধ করতেন, ধর্মের শ্রোতাদেরকেও তেমনি উদ্ধৃদ্ধ করতে পারতেন। ব্যাপার আরো একটি ছিল। সেটা এই যে, ধর্ম তাদেরকে আত্মপরিচয় লাভে সাহায্য করতো। শাসক ইংরেজ কেবল বিদেশী নয়, সে বিধর্মীও, এই বোধটা জাতীয়তাবাদের জন্য যে উদ্দীপক শক্তি ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইংরেজী ভাষার ব্যবহার করা না-করা দিয়ে দুই পক্ষের ব্যবধানকে স্পষ্ট করায় অসুবিধা ছিল; কারণ ইংরেজী ভাষা কেবল শাসক শ্রেণী নয়, আন্দােলনকারীরাও ব্যবহার করতেন। কিন্তু ধর্মের দিক দিয়ে দুই পক্ষ ছিল একেবারেই দুই জগতের, এক পক্ষ খ্রিস্টান, বিপরীত পক্ষ হিন্দু, দুইয়ের ভেতর মিলনের কোনো ক্ষেত্র নেই।
এসব কারণে দেশপ্রেমিক আন্দোলনের পরিচ্ছন্ন স্রোতের ভেতর সাম্প্ৰদায়িকতার বিপজ্জনক আবিলতা চলে এলো। ধর্ম পরিচয়ের চিহ্ন হিসাবে থাকা এক কথা, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। ধাৰ্মিক মানুষ মৌলবাদী হতে পারেন, মৌলবাদের ভেতর সাম্প্রদায়িকতা উপাদান থাকে নিশ্চয়ই, কিন্তু ধমীয় মৌলবাদ আর সাম্প্রদায়িকতা তো এক বস্তু তা নয়, দুয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা জিনিসটা মৌলবাদের তুলনাতে অধিক পরিমাণে রাজনৈতিক। এর সঙ্গে ক্ষমতা ও সম্পত্তির প্রশ্ন অঙ্গাঙ্গী জড়িত।”
তিনি আরও লিখছেন; “দুই ধর্মের দুই মৌলবাদী পাশাপাশি বসবাস করতে পারেন, তাদের মধ্যে সম্প্রীতি থাকাও অসম্ভব নয়, ভূদেবচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-৯৪) তাঁর লেখাতে এ ধরনের সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। কিন্তু দু’জন যদি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন, বিশেষ করে একপক্ষ যদি অপর পক্ষের সম্পত্তি (সেটা স্থাবর অস্থাবর যে ধরনেরই হােক) এবং বৈষয়িক সুযোগ-সুবিধা দখল করতে উদ্যত হয়, এবং সেই উদ্যোগকে শক্তিশালী করবার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করে তখন সাম্পপ্রদায়িকতা দেখা দেয়।
এদেশে ধর্মবিশ্বাস প্রাচীন ব্যাপার; হিন্দু মুসলমান এখানে যুগ যুগ ধরে প্রতিবেশী হিসাবে বসবাস করেছে। তারা একই আকাশের রোদ-বৃষ্টি-জ্যোৎস্না ভোগ-উপভোগ করেছে, চাষ করেছে মিলেমিশে, একই বাজারহাটে কেনাবেচা, করতে তাদের অসুবিধা হয় নি। শোকে দুঃখে পরস্পরকে সাহায্য করেছে, পরস্পরের উৎসবে, এমন কি ধমীয় অনুষ্ঠানেও অনায়াসে যোগ দিয়েছে, মন্দিরের ঘণ্টা মিশে গেছে আজানের ধ্বনির সাথে, কোনো গোলযোগ বাধে নি। কিন্তু বিপদ ঘটলো তখনই যখন ধর্ম চলে এলো রাজনীতিতে, অর্থাৎ যুক্ত হয়ে গেলো ক্ষমতার জন্য রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দ্বন্দ্ব ইত্যাদির সঙ্গে। যে-লড়াইটা হবার কথা ছিল বাঙালী হিন্দু-মুসলমানের সঙ্গে ঔপনিবেশিক ইংরেজের, সে লড়াইয়ের ভেতরে প্রবেশ করলো ভ্রাতৃঘাতী হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষ।
১৮১৭ সালে যখন হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন সে-কলেজে মুসলমানের যে প্রবেশাধিকার থাকবে না। এটা ধরেই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা নিয়ে মুসলমান সম্প্রদায়ের কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। কেননা ওই সম্পপ্রদায়ের ছেলেরা তখনো পড়তে আসবার মতো সামৰ্থ্য অর্জন করে নি। কিন্তু পরে ১৮৫৪ সালে হিন্দু কলেজ যখন সরকারী কলেজ হয়েছে, নাম নিয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের তখন সেই কলেজে যদি মুসলমান ছাত্রদের জন্য নিষিদ্ধ থাকতাে তাহলে সমস্যার সৃষ্টি হতো, কেননা ততদিনে মুসলমান ছাত্ররা কলকাতায় আনাগোনা শুরু করে দিয়েছে।
বাংলায় মুসলমানরা যে সংখ্যায় অধিক এ সত্যও প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু কেবল সংখ্যায় অধিক হবার ব্যাপার নয়, তারা যে শিক্ষিত এবং আত্মসচেতন হয়ে উঠতে থাকলো তাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠিত মধ্যবিত্ত এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের উঠতি মধ্যবিত্তের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হবে এমনটা বােঝা গেলো। আশঙ্কা করা গেলো যে, হিন্দু ও মুসলমান এই নাম বিশেষ্য থাকবে না, পরিণত হবে বিশেষণে; দুই সম্প্রদায়ই নিজ নিজ ক্ষমতা প্রকাশে আগ্রহী ও তৎপর হয়ে উঠবে। ১৯০৫এর পরে সেই দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। তাতে শাসক ইংরেজ তার নিজের স্বার্থেই উস্কানি দিয়েছে, সোৎসাহে।
স্বদেশী আন্দোলনের সাফল্য যদি বলি বঙ্গভঙ্গ রদ করায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে এটাও মানতে হবে যে, ওই আন্দোলনের ব্যর্থতা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার অগ্রযাত্রার পথকে প্রশস্ত করে দেওয়ায়। আমরা ১৯০৫ সালের কথা ভাবছি। স্মরণ করা বোধ করি অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, ওই বছরই রাশিয়াতে লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লবী অভু্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে, যে-চেষ্টাকে বলা হয় ১৯১৭ সালের বিপ্লবের চূড়ান্ত মহড়া। সেই বিপ্লবী প্রচেষ্টার ঢেউ পরের কথা, তেমন একটা খবরও স্বদেশী আন্দোলনের লোকদের কাছে পরিষ্কারভাবে এসেছিল কিনা সন্দেহ। ভারতে তখন বরঞ্চ এই তথ্য নিয়ে এক ধরনের সন্তুষ্টি ছিল যে ওই বছরই যুদ্ধে জাপানের কাছে রুশ বাহিনীর পরাজয় ঘটেছে।
রুশদের পরাজয়কে কেউ কেউ প্রাচ্যের কাছে পশ্চিমের পরাজয় হিসেবে দেখেছেন। রুশ দেশের সঙ্গে ভারতীয় পরিস্থিতির অবশ্য মৌলিক পার্থক্য ছিল। এক, রুশ দেশ ছিল স্বাধীন, ভারত পরাধীন। দুই, রুশদের কাছে জ্বারতন্ত্র স্বৈরাচারী ছিল ঠিকই, কিন্তু ওই শাসক ভারতীয় শাসকদের মতো শক্ত ও সুকৌশলী ছিল না। আর সবচেয়ে বড় সত্য যেটা সেটা হলো রুশ বিপ্লবীদের সামনে ছিল শ্রেণীর প্রশ্ন, ভারতীয়দের সামনে প্রধান হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার প্রশ্ন। স্বাধীনতার প্রশ্নের মীমাংসা না করে অর্থাৎ ঔপনিবেশিক শাসকদেরকে না হটিয়ে শ্রেণী সংগ্রামকে অর্থাৎ সামাজিক বিপ্লবের বিষয়টিকে সামনে আনা সম্ভব ছিল না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ঘটনা এই যে, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সংগ্ৰাম করার ক্ষেত্রেই ভারতীয়দের জন্য সাম্প্রদায়িক বিভাজনটি হয়ে দাঁড়িয়েছিল মস্ত বড় এক অন্তরায়। স্বদেশী আন্দোলনের মতো সাম্প্রদায়িকতাও বাংলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে নি, ছড়িয়ে পড়েছে সারা ভারতে, ইতি এবং নেতি ভ্ৰমণ করেছে এক সঙ্গেই।”
বইটি পড়তে পড়তে যতই এগুচ্ছি ততই ভাবছি দেশের ঐতিহ্য কিংবা ইতিহাস খোঁজার আরেক প্রচেষ্টা হতে পারে নিজের শেকড়ের সন্ধানে অনুসন্ধান।
Share /

No comments

Post a Comment

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz