Freedom


A speech in acceptance of the National Book Foundation Medal forDistinguished Contribution to American Letters, November 2014.
 
To the givers of this beautiful reward, my thanks, from the heart. My family, my agents, my editors, know that my being here is their doing as well as my own, and that the beautiful reward is theirs as much as mine. And I rejoice in accepting it for, and sharing it with, all the writers who’ve been excluded from literature for so long—my fellow authors of fantasy and science fiction, writers of the imagination, who for fifty years have watched the beautiful rewards go to the so-called realists.


Hard times are coming, when we’ll be wanting the voices of writers who can see alternatives to how we live now, can see through our fear-stricken society and its obsessive technologies to other ways of being, and even imagine real grounds for hope. We’ll need writers who can remember freedom—poets, visionaries—realists of a larger reality.

Right now, we need writers who know the difference between production of a market commodity and the practice of an art. Developing written material to suit sales strategies in order to maximise corporate profit and advertising revenue is not the same thing as responsible book publishing or authorship.

Hard times are coming...We’ll need writers who can remember freedom...

Yet I see sales departments given control over editorial. I see my own publishers, in a silly panic of ignorance and greed, charging public libraries for an e-book six or seven times more than they charge customers. We just saw a profiteer try to punish a publisher for disobedience, and writers threatened by corporate fatwa. And I see a lot of us, the producers, who write the books and make the books, accepting this—letting commodity profiteers sell us like deodorant, and tell us what to publish, what to write.
Books aren’t just commodities; the profit motive is often in conflict with the aims of art. We live in capitalism, its power seems inescapable—but then, so did the divine right of kings. Any human power can be resisted and changed by human beings. Resistance and change often begin in art. Very often in our art, the art of words.

I’ve had a long career as a writer, and a good one, in good company. Here at the end of it, I don’t want to watch American literature get sold down the river. We who live by writing and publishing want and should demand our fair share of the proceeds; but the name of our beautiful reward isn’t profit. Its name is freedom.

Thank you.

মদ

Sunday, April 23, 2017

‘মদ’। শুনলে বিশ বছর আগেও বাঙালি নাক কুঁচকে তাকাত। এখনও নাক কুঁচকেই তাকায়। ‘মদ’। দেখলে আগেও বাঙালির কপালে ভাজ পড়ত। এখনও পড়ে। তফাত নেই। আবার, তফাত আছেও। আগে, মদ’ অর্থে যে নিষিদ্ধ বস্তু বোঝাত, সময়ের দাঁড় আস্তে আস্তে সেই ঘেন্নার পানা সাফ করে দিয়েছে। ‘মদ” কথাটায় এখনকার বাঙালির নাক কুচকানোর কারণ, সে বুঝতে চায় তার স্টেটাস ও চায়েসের সঙ্গে পরিবেশিত পানীয় ‘ম্যাচ’ করছে কি না। কী ব্র্যান্ড, কোন ধরনের গ্লাসে, কী জাতীয় অনুপান-সহ গ্রহণ করা উচিত, সে আক্কেল দাঁত বাঙালির গজিয়েছে বইকি। কপালে যে ভাজ বাঙালি হয়তো বা ক্যালোরি ইনটেকের অঙ্কটা তলে তলে মেপে নিতে চায়। হুড়মুড়িয়ে এত যে তরল এনার্জি তরতরিয়ে পেটে চালান হল, আগামী কাল সেসব তো ঝরাতে হবে। রোজ যদি জিমে আধঘণ্টা ওয়ার্কআউট করি তো আগামী কাল বাড়তি আরও পনেরো মিনিট দিতে হবে। কুন্ঠা নেই, কুচকাওয়াজ আছে। শঙ্কা নেই, শাবাশি আছে। আর আছে দ্বিধাহীন আত্মঘোষণা: মদ খাই, কারণ মদ খেতে ভালবাসি।
মদ ও মদ্যপায়ীর প্রতি চেয়ে দেখার ধরন এই যে এতখানি বদলে গেল সেজন্য ‘বার’ এর অবদান অস্বীকার করা যাবে না। হিন্দি সিনেমাকেও কদর দিতে হবে। নয়ের দশকের শেষে যখন "সত্যা’ বা “সরফরোশ’-এর মতো মারকাটারি হিন্দি সিনেমা বাজারে আসছে, তখনও মুক্ত অর্থনীতির জোয়ার দশতলা বাড়ির উচ্চতায় উঠে সহসা ঝাঁপ দিয়ে পড়েনি মধ্যবিত্ত ভারতীয় জীবনে। ইন ফ্যাক্ট, তখনও ‘মধ্যবিত্ত’ বলে একটা শ্রেণি বিরাজ করত মহানগর ও সংলগ্ন মানেই অপরাধীদের আবাসস্থল। টাকা উড়ছে। মেয়েরা নাচছে। 'গ্লাসনস্ত’ বলে গ্লাসে গ্লাস ঠুকে অপরাধ জগতের ইয়াররা খুশি শেয়ার করছে। প্রতিটি টেবিলে, প্রতিটি চুমুকে চলকে যাচ্ছে যৌবনের উল্লাস। দর্শক অবশ্য জানে নেশা ছুটতে বেশি সময় লাগবে না। এই বুঝি এল তেড়ে বন্দুক হাতে অন্য গ্যাংয়ের ছেলেরা। নতুবা, পুলিশ। যে-অপরাধীর সন্ধান কোথাও মিলছে না, দর্শক জানে, ইনফর্মর ঠিক এসিপি-র কানে পৌছে দেবে খবর— ওই ব্যাটা রোজ সন্ধেয় কোন বারে টু মারে।
এখন যে বারে-বারে অপরাধীরা যায় না তা নয়। তবে তার চেয়েও সংখ্যায় অনেক বেশি যায় সাধারণ মানুষ। স্ট্রেস ঝেড়ে সেলিব্রেট করতে, এমনকী, চিরকালের ব্যথাতুর প্রেমের প্রতীক ‘দেবদাস’ হয়েও যায়। ভারতীয় জীবনযাত্রা মুক্ত অর্থনীতির ত্বরণ গা পেতে বরণ করেছে। “বার কাম রেস্তোরা”-য় ফ্যামিলি নিয়ে সময় কাটানোর বন্দোবস্ত যথাসম্ভব নিরুপদ্রব করার চল এসেছে। হিন্দি সিনেমা দেখাচ্ছে- ভ্রুজের বারে বাবা ও ছেলে নিঃসংকোচে ঠোঁট ছোয়াচ্ছে হার্ড ড্রিংকে। 'বার’ নিয়ে আর বাগাড়ম্বর নেই। 'কুমির তোর জলকে নেমেছি’ নেই। আলো ও আঁধার নিয়ে এ জীবনও থাকবে- মেনে নেওয়া মাথা নেড়ে।

(সাপ্তাহিক রোববার থেকে)

পথের কবি
কিশোলয় ঠাকুর

এই বই নিয়ে
ভূমিকা ? যদি হয়, তবে এটা একটা অদ্ভূত ভূমিকা। এমন ভূমিকা, যার ভূমিই নেই। না থাক, তবু দৃশ্য আছে, রৌদ্র, রূপ, গন্ধ, রস— সব আছে। বইয়ের নাম “পথের কবি” । কবির নাম বিভূতিভূষণ ।
“পথের কবি”—এই কথাটা শব্দ দিয়ে কাছাকাছিই যিনি গাঁথেন (যিনি কবি তিনিই তো সাথী, এই অর্থে), সেই রবীন্দ্ৰনাথ নিজেকে কিন্তু এই নামটা কখনও দেননি। বরং তাঁকে বারংবার নমস্কার জানিয়েছেন । আজ হঠাৎ মনে হল, সেই কবি বিভূতিভূষণও তো হতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ কোনও স্ৰষ্টাকে নিশ্চয় প্ৰণতি জানিয়েছেন, তবু যিনি আসেননি, অথচ ধ্রুব আসবেন, তাঁর প্রতি তাঁর নমস্কার কখন যেন তাঁরই অজানিতে সবে যিনি এলেন, তাঁরই প্ৰতি নিবেদিত হয়ে গেছে ।
না হয়ে উপায় ছিল না । মহৎ মহৎকেই চিহ্ন দেখে চিনে নেয় । অতএব তাঁর জীবনের ক্লান্ত ঘণ্টায় যে পাঁচালীকার এলেন, তাঁকে সুস্বাগত না জানিয়ে পিতৃপ্রতিম কবির উপায় ছিল না। কারণ নিজে সমস্ত জীবন ধরে ভাঙা পথের রাঙা ধুলো যে অবিরত উড়িয়েছেন ! স্থিত থেকেও অস্থিত। শুধু গান “নিশীথে কী কয়ে গেল মনে” ? কে কাকে কী বলে যায় ? “বলে মোরে, চলো দূরে” ।
এই চলো-চলো-চলো চলে যাই সত্যের ছন্দে, কিংবা চরৈবেতি মন্ত্রটি তাঁর নিজের জীবনে যেমন, বিভূতিভূষণের রচনা এবং পথ-পরিক্রমার মধ্যে অবশ্যই আভাসিত হয়েছে, তিনি দেখে থাকবেন । আজ এই কথা স্পষ্ট করে বলার সময় এসেছে যে, রবীন্দ্রনাথের সগোত্র, তাঁরই ধারার অনুসারী আর একটি লেখকের কথা যদি লিখিত হয়, তবে একমাত্র নামটি বিভূতিভূষণ ।
কোথায় যেন মিল । এই প্রাত্যহিকতার ধূলিমলিন জীবনের বাইরে, অনেক উপরে শিল্পকে স্থাপন করার কীর্তি (কয়েকজন কবিকে বাদ দিলে) খালি বিভূতিবাবুর। এখানে তিনি তাঁর পূর্বসূরীর সঙ্গী, এখানে রবীন্দ্রনাথ আর বিভূতিভূষণ পাশাপাশি ।

কথার ঘরবাড়ি

কথার ঘরবাড়ি । কার কথা! কেমন কথা!! কি কথা!!! উনবিংশ শতকে জন্মগ্রহনকারি বিশিষ্ট কয়েকজন মানুষ কথোপকথনের মধ্য দিয়ে বলেছেন তাদের সময়, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে নানা কথা । অত্যন্ত ঋদ্ধ। এইসব আলোচনা ও মতামত সাক্ষাৎকার হিসেবে গ্ৰহণ করেছেন লেখক, সমালোচক ও সংস্কৃতিকমী সুশীল সাহা ।
আসুন জেনে নিই কাদের সাক্ষাৎকারে সমৃদ্ধ হয়েছে বইটি। ১৮ জন বিশিষ্ট মানুষের মধ্যে রয়েছেন;
কে. জি সুব্রম্মণ্যন যিনি বিশিষ্ট ভারতীয় চিত্রকর। ২০১২ সালে তিনি পদ্মবিভূষণ পুরষ্কার লাভ করেন।
বাদল সরকার যিনি ভারতীয় নাট্যাঙ্গনের প্রভাবশালী নাট্যকার ও নির্দেশক। নাটককে প্রসেনিয়ামের বাইরে এনে তৃতীয় ধারার নাটকের সূত্রপাত করেন।
তপন রায়চৌধুরী একজন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ। আত্মজীবনী 'বাঙালনামা' তাঁর বিশেষ রচনা।
কবি মণীন্দ্র গুপ্ত, তিনি একালের একজন বিশিষ্ট কবি। অনেকের মতে স্বাধীন উত্তর বাংলায় তিনি সর্বাধিক প্রভাবশালী কবিদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর দীর্ঘ রচনার সম্ভারের মধ্যে রয়েছে "চাঁদের ওপিঠ", "অক্ষয় মালবেরী" প্রভৃতি। ২০১০ সালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমী দ্বারা ভূষিত হন, এ রাজ্যের সর্বোচ্চ সম্মান "রবীন্দ্র পুরষ্কার"-এ তার "টুংটাং শব্দ নিঃশব্দ"-(২০০৫) এর জন্য।
কবি শঙ্খ ঘোষ, লেখক সমালোচক, বুদ্ধিজীবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবেও সুপরিচিত।
কথা সাহিত্যিক জাহানারা নিওশিন যার পিতামহীর পাখি একটি বিশেষ উপন্যাস।
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত এক জন বিখ্যাত বাঙালি কবি। তাঁর ২০টিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ আছে। এর পাশাপাশি তিনি বহু বাংলা ও সাঁওতালি কবিতা ও নাটক ইংরাজি ও জার্মানে অনুবাদ করেছেন।
আনিসুজ্জামান, বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও লেখক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক।
সাইদা খানম বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী। বেগম পত্রিকার মাধ্যমে সাইদা খানম আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর ছবি ছাপা হয় দৈনিক অবজারভার, মর্নিং নিউজ, ইত্তেফাক, সংবাদ'সহ বিভিন্ন পত্রিকায়।
মনোজ মিত্র একজন বাঙালি থিয়েটার, চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন অভিনেতা এবং নাট্যকার।
হাসান আজিজুল হক ছোট গল্পকার এবং কথাসাহিত্যিক। ষাটের দশকে আবির্ভূত এই কথাসাহিত্যিক তাঁর সুঠাম গদ্য এবং মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির জন্য প্রসিদ্ধ।
জন উইলিয়াম হুড একজন অষ্ট্রেলিয় যিনি বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে চর্চা করেছেন। নিহারঞ্জন রায়কে নিয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সমালোচক হিসেবেও খ্যাতিমান।
ওস্তাদ আজিজুল ইসলাম যিনি ক্যাপ্টেন আজিজুল ইসলাম নামেও পরিচিত একজন বাংলাদেশী বংশীবাদক। তিনি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য একুশে পদকে ভূষিত হন।
পি সি সরকার ভারতবর্ষের বিখ্যাত জাদুকর। তার পুরোনাম প্রতুল চন্দ্র সরকার। তিনি অন্যতম একজন আন্তর্জাতিক জাদুকর ছিলেন যিনি ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তার জাদু দেখিয়েছেন। তার অন্যতম প্রদর্শনী ছিল ইন্দ্রজাল প্রদর্শনী।
ফেরদৌসী প্ৰিয়ভাষিনী বাংলাদেশের প্রখ্যাত ভাস্কর। তাঁর শিল্পকর্ম বেশ জনপ্রিয়। মূলত ঘর সাজানো এবং নিজেকে সাজানোর জন্য দামী জিনিসের পরিবর্তে সহজলভ্য জিনিস দিয়ে কিভাবে সাজানো যায় তার সন্ধান করা থেকেই তাঁর শিল্পচর্চার শুরু। সম্প্রতি তিনি মুক্তিযোদ্ধা (বীরাঙ্গনা) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
হানস হারডার জার্মানির হালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতবর্ষ বিষয়ক দর্শন শাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক। বর্তমানে হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ১৯৮৯ সালের দিকে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
আরও আছেন রবীন্দ্র গবেষক ব্রিটিশ কবি উইলিয়াম রাদিচে। এবং প্রখ্যাত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র পরিচালক তানভির মোকাম্মেল।
বইটিতে উঠে এসেছে এই সকল মানুষের জানা অজানা নানান তথ্য।
কথার ঘরবাড়ি
(একটি সাক্ষাৎকার সংকলন)
সাক্ষাৎকার গ্রহণ: সুশীল সাহা।
সম্পাদনা: নিশাত জাহান রানা
প্রচ্ছদ: গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশক: যুক্ত
অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭
মূল্য: ৫৫০

দেশ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যাটিতে সুমিত মিত্র নামে একজন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। দুই বাংলা ও প্রবাসী বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের বিষয়টি ভোগাচ্ছে অনেকদিন ধরে। সুমিত মিত্র বলছেন; “একটি খাঁটি সত্যি কথা দিয়ে শুরু করি। বর্তমানে আমার পরিপার্শ্বে আমি যা সবচেয়ে ঘেন্না করতে শুরু করেছি তা হল, বাড়ির টেলিভিশন সেটটি। এমনই বিরক্তিকর হয়ে পড়েছে ওই বোকাবাক্স যে, টিভি না খুলে ক্রিকেট দেখতে শুরু করেছি ইউটিউবে। অর্থাৎ তা কেবল সজীব ছবি নয় বাসি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবর ও মতামত সবই আজকাল মোবাইল ফোনেই পাওয়া যায়। তার জন্য টিভির সামনে গুটিগুটি বসার প্রয়োজন নেই। শুধু কখনও-সখনও গভীর রাতে প্রিয় চ্যানেল বিবিসি খুলে দেখি— ভলিউম কম থাকে— যাতে কারও ঘুম না ভাঙে।
“বাংলা সিরিয়ালের উদ্দেশ্য হোক দর্শককে শুধু নিম্নস্তরের বিনোদনে আচ্ছন্ন করে বসিয়ে রাখা নয়, তাঁকে চিন্তা করতে সাহায্য করা।”
টিভি সম্পর্কে আমার ভীতির মূল কারণ বাংলা টেলিসিরিয়াল। পৃথিবীতে জনসমক্ষে বোকামি ও নিম্নরুচির প্রদর্শনীর অনেক মঞ্চ আছে। যেমন, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিহরন জাগানো টুইট অথবা জনৈকা জননেত্রীর স্বরচিত গদ্য অথবা আসন্ন বইমেলার দিকে নজর রেখে ‘নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য’ সংক্রান্ত নতুন আর-একটি বই। কিন্তু বাড়িতে বসে মনে হয়, এসব কিছুই ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলা টেলিসিরিয়াল।

আমার আপত্তির কারণ দু’টি। প্রথমটি নৈতিক। জীবনের অশুভ ও অশুচি দিকটিকে ছবি বা টেলিভিশনের পরদায় প্রদর্শন করাটা প্রযোজকের স্বাধীনতা। আমেরিকা বা ইউরোপে অনেক চ্যানেল আছে, যেখানে পুরোপুরি পর্নোগ্রাফি বা খুনজখম দেখানো হয়, যদিও তা সম্প্রচারের বিধি মেনে। হিন্দি সিরিয়ালেও অপরাধ-ঘটিত গল্প প্রচুর। কিন্তু একটি বাংলা বিনোদন চ্যানেল বেশ কিছুদিন জনপ্রিয়তার শিখর স্পর্শ করেছে শুধুমাত্র একটি পরিস্থিতিকেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখিয়ে। তা হল, কল্পিত কিছু যৌথ পরিবারের অন্দরে একগুচ্ছ খলনায়ক ও খলনায়িকার উপস্থিতি। সচরাচর খলনায়িকা ও মহীয়সী নায়িকা, দু’জনেই একই নায়কের শয্যাকক্ষে কখনও প্রবেশ করছেন প্ৰথমজন, কখনও দ্বিতীয়। শাশুড়িরা সচরাচর অত্যাচারী ও ষড়যন্ত্রকারী। ষড়যন্ত্রের ফল সুদূরপ্রসারী। হত্যা করার ‘সুপারি’ দেওয়াটাও প্রতি এপিসোডের ঘটনা। অবশ্য ‘সুপারি’কল্পিত প্ল্যান প্রতিবারই বানচাল হয়। কারণ, নায়িকা গতায়ু হলে সিরিয়াল চলবে কেমন করে! ষড়যন্ত্রের অংশীদাররা সকলেই পারিবারিক শাখাপ্রশাখার অন্তর্গত। ফন্দিটা যেন মহাভারত থেকে নেওয়া। কেউ নায়কের কাকা, যে ভাইপোকে সরিয়ে দিয়ে সম্পত্তি লোপাটের স্বপ্ন দেখছেন। কেউ পেশাদার খুনি, মূল পরিবারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ। তবে সব কাহিনিরই হিংসা, ঘৃণা, ঈৰ্ষা ও লোভ।

আমার নৈতিক আপত্তির অপর একটি কারণ হল, দর্শকরা— বিশেষ করে মহিলা ও সারাদিন ঘরবন্দি বয়স্ক পুরুষ— সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সিরিয়ালের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। সেদিন এক চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে শুনলাম, রোগীর ভিড় নাকি শুরু হয় রাত ন’টায় একটি সিরিয়াল শেষ হওয়ার পরক্ষণেই। এই মহিলা ও বৃদ্ধ দর্শকেরা মোটেই চিন্তিত নয় কী হল উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে, বা কী চেহারা নেবে পণ্যপরিষেবা শুল্ক, এবংবিধ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বিষয়ে। সেই দর্শকদের কাছে যা প্রাসঙ্গিক তা হল, খলনায়ক এবার কতটা নৃশংসতার পরিচয় দেবে বা খলনায়িকা কি এখন ধরা পড়তে চলেছে? অ-চর্চিত মনের উপর এই অযৌক্তিক ও কুৎসিত কাহিনিগুলি প্রভাব বিস্তার করতেই পারে।

পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী মহিলারা ভারতের নারীসমাজের ৭.৫ শতাংশ। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০১২, এই চারবছরে যত গাৰ্হস্থ হিংসার ঘটনা ঘটেছে, তার ১২.৫ শতাংশ এই রাজ্যে। অর্থাৎ পারিবারিক হিংসা ও উত্তেজনা জনসংখ্যার তুলনায় দ্রুতহারে বাড়ছে।

আমার দ্বিতীয় আপত্তি সাংবিধানিক অধিকার সংক্রান্ত। সংবিধান-প্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা যেতে পারে যদি সেই মতপ্রকাশ দ্বারা লঙ্ঘিত হয় ‘শৃঙ্খলা’, ‘শোভনতা’ ও ‘নৈতিকতা’ ( ‘...public order, decency or morality...’ Article 19 (2))। কিন্তু যা হচ্ছে তা ঠিক তাই। পৃথিবীর অন্যত্র যেমন টেলিভিশনে আছে নানা চ্যানেলের বৈচিত্র, তেমনই বড় ও ছোট পরদার মাধ্যমে ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়েছে। তার উপর হাজির হয়েছে টুইটার, ফেসবুক প্রভৃতি সোশ্যাল মিডিয়া। এসেছে নেটফ্রিক্সের মাধ্যমে অনেক নতুন চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ। এ ছাড়া কম মূল্যে (কখনও-বা বিনামূল্যে) প্রচুর মনোগ্রাহী বই ডিজিটাল মাধ্যমে কিনে অলস বিকেলে নিজের মোবাইলে বা ট্যাবলেটে তা পড়ার আনন্দ। কমেছে টেলিভিশন নির্ভরতা।

বোকাবাক্সে আটকে যাওয়া এই রাজ্যের বেশির ভাগ মানুষ সিরিয়ালের কষ্টকল্পিত ঘটনা ও বিকৃত চিন্তাধারার মধ্যে বন্দি হয়ে হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন যে, এটিই জীবন। তাঁরা রিমোট যন্ত্রে অন্য বোতাম টেপার স্বাধীনতাটিও বিসর্জন দিয়েছেন। এই আচলায়তন ভাঙার একমাত্র উপায়, প্রকৃত লেখকরা এগিয়ে আসুন সিরিয়ালের আঙ্গিকে সৃজনশীল গল্প নিয়ে। সিরিয়ালের উদ্দেশ্য হোক দর্শককে শুধু নিম্নস্তরের বিনোদনে আচ্ছন্ন করে বসিয়ে রাখা নয়, তাঁকে চিন্তা করতে সাহায্য করা।”

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz