রাধাকৃষ্ণণ

Wednesday, October 12, 2016

মাদ্রাজের (অধুনা তামিলনাড়ু ) টিকুটানি নামে এক ছোট্ট শহরে রাধাকৃষ্ণণ ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করেন। টিরুটানি একটি তীর্থস্থানও বটে। র্তার পিতামাতা সাধারণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থ ছিলেন ।
গোড়া হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও রাধাকৃষ্ণণের শিক্ষা বরাবরই খ্ৰীষ্টান মিশনারিদের বিদ্যালয়ে হয়। দক্ষিণ ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষায় মিশনারি বিদ্যালয়গুলির বিশেষ স্বনাম ছিল। যতদূর বোঝা যায়, রাধাকৃষ্ণণকে ভালভাবে শিক্ষিত করবার আশায় নিষ্ঠাবান হিন্দু হয়েও তার পিতা-মাতা তাকে মিশনারিদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন । ভেলোরের আমেরিকান মিশন বিদ্যালয় হতে ১৯০৩ সালে প্রবেশিকা ও ১৯০৫ সালে এফ. এ. পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন। ঐ কলেজ থেকেই ১৯০৭ সালে বি. এ. এবং ১৯০৯ সালে এম. এ. পরীক্ষায়ও সম্মানের সঙ্গে তিনি উত্তীর্ণ হন। লেখাপড়াতে রাধাকৃষ্ণণ বরাবরই মোটামুটি ভাল ছিলেন। তবে তার সহাধ্যায়ীরা মিষ্ট স্বভাবের জন্যই তাকে বেশী ভালবাসত। তিনি ছিলেন লাজুক ও শাস্ত প্রকৃতির মানুষ ।

খ্ৰীষ্টান মিশনারি বিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ হওয়ায় তাদের ধর্ম ও ধ্যানধারণার প্রভাব যে রাধাকৃষ্ণণের জীবনে যথেষ্ট প্রভাব রাখবে সে বিষয়ে সন্দেহ করবার কোন কারণ নেই। প্রচলিত হিন্দুধর্মের নানা কুসংস্কার ও আবর্জনা হতে মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তাশীলতার সাহায্যে রাধাকৃষ্ণণ যে প্রকৃত হিন্দুরূপে নিজেকে গড়ে তুলতে সমর্থ হন, মনে হয় সেটা মিশনারি বিদ্যালয়ে শিক্ষারই ফল।

এম এ, পাশ করে সে বছরই রাধাকৃষ্ণণ মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনশাস্ত্রের সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। ঐ কলেজের কার্যকাল হতেই অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণের খ্যাতি বিদ্বজনমহলে ছড়িয়ে পড়ে। তাই দেখা যায় যে, ১৯১৮ সালে মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষর তাকে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দর্শনাধ্যাপকের পদে নিয়োগ করেন।
মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবার দুবছর পরে, অর্থাৎ ১৯২০ সালে, স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দর্শনাধ্যাপকের পদের জন্য উপযুক্ত লোকের সন্ধান করছিলেন। ঐ পদ অলংকৃত করেছিলেন ডঃ ব্রজেন্দ্রনাথ শীল। ড: শীল মহীশূর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলারের পদ পেলে তার শূন্যপদে স্যার আশুতোষের উদ্যোগে রাধাকৃষ্ণণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দর্শনাধ্যাপক পদে নিযুক্ত হন। ইতিমধ্যে অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ ইংলণ্ড ও আমেরিকার দার্শনিক পত্র-পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে ও দর্শনশাস্ত্র সম্পর্কে একখানি উৎকৃষ্ট পুস্তক প্রকাশ করে খ্যাতিলাভ করেছিলেন।
অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন তখন তার বয়স বত্ৰিশ । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনাকালে র্তার “ভারতীয় দর্শন” প্রকাশিত হয়। রাধাকৃষ্ণণের খ্যাতিও চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে Empire Universities Congress-এর যে অধিবেশন হয় তাতে অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন। ইংলণ্ডে বহুস্থান হতে বক্তৃতা দেবার নিমন্ত্রণও তিনি পান। এর মধ্যে অক্সফোর্ডের ম্যাঞ্চেস্টার কলেজে প্রদত্ত Upton Lectures সবিশেষ প্রসিদ্ধ । এই বক্তৃতাগুলি পরবর্তীকালে The Hindu View of Life নামক পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়।
ঐ বছর সেপ্টেম্বর মাসে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে International Congress of Philosophyর ষষ্ঠ অধিবেশনে রাধাকৃষ্ণণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন। আমেরিকাতেও তার অসাধারণ পাণ্ডিত্য, বাগিতা প্রভৃতিতে সকলেই মুগ্ধ ও চমৎকৃত হন।
অধ্যাপক রাধাকৃষ্ণণ ইংলণ্ড ও আমেরিকায় অসাধারণ খ্যাতি লাভ করেন। ফলে দেখা যায় ষে তিনি উন্নতির সোপানপরম্পরায় ক্রমশঃই অগ্রসর হয়েছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, ইংলণ্ডে হিবার্ট লেকচার প্রদান, Encyclopaedia Britannicaতে প্রবন্ধ লিখন, আন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলার হিসাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠন, লীগ অব নেশন্সের সদস্যপদ লাভ, এই ধরনের নানা পদে রাধাকৃষ্ণণ যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৩১ সালে গভর্নমেণ্ট তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাকে স্যার উপাধিতে ভূষিত করেন।
শুধু অধ্যাপক, হিন্দুজীবনবেদব্যাখাত, অসাধারণ বাগ্মী হিসাবে নয়, পরবর্তী জীবনে রাধাকৃষ্ণণ মস্কোতে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হিসাবেও অসাধারণ সাফল্য লাভ করেন। ভারতবর্ষের প্রেসিডেন্ট হিসাবেও তিনি বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
নানাক্ষেত্রে প্রতিভা ও কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেলেও রাধাকৃষ্ণণ ‘দার্শনিক’ হিসাবেই বিশেষভাবে সর্বত্র পরিচিত। দার্শনিক হিসাবেই তিনি দেশবিদেশের সশ্রদ্ধ অভিনন্দনও পেয়েছেন। স্যার ফ্রানসিস ইয়ংহাজব্যান্ড তার একটি গ্রন্থে লিখেছেন : “রবীন্দ্রনাথ যেমন নবীন ভারতের কবি তেমনি রাধাকৃষ্ণণও নবীন ভারতের দার্শনিক।”
রাধাকৃষ্ণণের বাগ্মিতাও ছিল অসাধারণ । অনেক ইংরেজ অধ্যাপকও মন্তব্য করেছেন যে, এ ধরনের বাগ্মিতা তাদেরও ঈর্ষা, প্রশংসা ও আত্মগ্লানির বিষয়। কোন রকম লিখিত টীকাটিপ্পনীর সাহায্য না নিয়ে রাধাকৃষ্ণণ এমন নিখুঁত কাব্যধর্মী ভাষায় অনর্গল বক্তৃতা দিতেন যে ভারতীয়দের মধ্যে তো নয়ই, ইংরেজদের মধ্যেও এমন বাগ্মিতা ছিল বিরল।
দার্শনিকেরা সকলেই যে প্রসন্নগম্ভীর লেখা লিখতে পারেন তা নয়। প্লেটো, হিউম, রাসেল, বের্গসঁ, শংকর প্রভৃতির মতো লেখক দার্শনিকমহলে খুব বেশী নেই। কিন্তু রাধাকৃষ্ণণের রচনাশৈলী ছিল অননুকরণীয়।. তার ভাষার সৌন্দর্য, অপরূপ ছন্দোময় ইংরাজি এমনই মনোহারী ছিল যে, বহু বিদেশী মণীষী অকুণ্ঠচিত্তে রাধাকৃষ্ণণের রচনাশৈলীর প্রশংসা করেছেন।
রাধাকৃষ্ণণ প্রধানত “ভারতীয় দর্শন" ( দুই খণ্ড ) রচয়িতা হিসাবে পরিচিত হলেও অন্যান্য দার্শনিক ও ধর্মমূলক গ্রন্থও তিনি লিখেছেন। যৌবনে তিনি The Reign of Religion in contemporary Philosophy -নামক পাশ্চাত্য দার্শনিকদের সমালোচনামূলক গ্রন্থ রচনা করে হন। তার “ভারতীয় দর্শন" দেশবিদেশে ভারতীয় দার্শনিক চিন্তাধারার সম্যক পরিচয় দিয়ে তাকে আন্তর্জাতিক-খ্যাতিসম্পন্ন করে তোলে।
এছাড়া Kalki or the Future Civilisation, The Hindu View of Life, An Idealist View of Life, Religion and Society, The Philosophy of Rabindranath Tagore, Recovery of Faith, Precdom and Culture, India and China প্রভৃতি গ্রন্থ বহুলপরিচিত। রাধাকৃষ্ণণ ভগবদগীত, ব্রহ্মপুত্র, ধৰ্ম্মপদ-এর ইংরাজি । অনুবাদ টীকসহ প্রকাশ করেছেন। মহাত্মা গান্ধীর উপর লিখিত প্রবন্ধাবলীর সংকলন প্রকাশ করেছেন মুখবন্ধ সহ। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর উপর মূল্যবান আলোচনা করেছেন। তার বক্তৃতা ও ভাষণ সংকলিত হলে বেশ কয়েক খণ্ড হবে বলেই মনে হয় ।
রাধাকৃষ্ণণ পাশ্চাত্য ও প্রাচ্য উভয় দর্শনেই পারংগম ছিলেন। বিশেষ করে ইংলণ্ডের নব্য-হেগেলপন্থী স্টারলিং, কেয়ার্ড, গ্রীন ব্ৰডলে, বোসাংকে প্রভৃতি দার্শনিকদের চিন্তাধারার সঙ্গে তার ছিল অন্তরঙ্গ পরিচয় । হিন্দু ষড়দর্শনের মধ্যে রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন শংকর-বেদান্তের ভক্ত। রাধাকৃষ্ণ নিজে কোন সমগ্র, সুসংহত দর্শনপ্রস্থান প্রতিপন্ন করেন নি। তবে পূর্বপক্ষ খণ্ডন এবং বিভিন্ন দর্শনব্যাখ্যা প্রসঙ্গে তার একটা সুস্পষ্ট জীবনবেদ ফুটে উঠেছে, যে জীবনবেদে একদিকে রয়েছে শংকরের প্রভাব, অন্যদিকে ব্র্যাডলের ।
হিন্দু কুপমণ্ডুকতা পরিহার করে, মাদ্রজী গোড়া ব্রাহ্মণসমাজের কুসংস্কারের বন্ধন ছিন্ন করে রাধাকৃষ্ণণ এক উদার সর্বজনীন হিন্দুধর্মের সন্ধানে বেরিয়ে বেদান্ত-দর্শনে উপনীত হন। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনের মর্মবাণী তিনি যেমন একদিকে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে তেমনি emergent evolution-এর মূল তত্ত্বও তার চিন্তাধারায় প্রভাব বিস্তার করেছে। বিজ্ঞান, কাব্য, ধর্মশাস্ত্র ও মরমী সাধকদের কাহিনী ঘেঁটে রাধাকৃষ্ণণ গড়ে তুলেছেন এক ‘গতিশীল ব্রহ্মবাদ’। এর আকর্ষণ এক যুগে যে ছিল তা অস্বীকার করা যায় না।
একথা সত্য যে রাধাকৃষ্ণণ কোন সম্পূর্ণ মৌলিক দর্শনপ্রস্থান স্মৃষ্টি করেন নি। তবুও ষে ইউরোপের ও আমেরিকার জ্ঞানীগুণী মহলে তিনি সশ্রদ্ধ অভিনন্দন পেয়েছেন তার কারণ জীবনের সমস্তাকে তিনি বুঝতে চেয়েছেন এক অসাম্প্রদায়িক, ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গী থেকে। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, জাতিতে জাতিতে সমন্বয়ের তত্ত্বকথা তিনি প্রচার করেছেন এবং প্রবহমান জীবনকে অস্বীকার করে শুধুই আকাশ-কুসুম রচনা করেন নি।

বিস্তারিত অন্যকোন সময়ে দেওয়া যাবে।
উপরের লেখাটি চতুরঙ্গ পত্রিকা থেকে নেওয়া।
Share /

No comments

Post a Comment

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz