শামসুর রাহমান কবিচারিত্র্যে এর সার্থক রূপায়ণ

Saturday, October 29, 2016


রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশের কয়েকজন কবির রূপময় কাব্যজগতের পর আমরা বর্ণবহুল কবিতার বিস্তার দেখি শামসুর রাহমানের কবিতার জগতে। বিস্ময়কর সফলতা ছিল তাঁর।
শামসুর রাহমানের কাছে জীবন ও কবিতার মাঝখানে কোনো শূন্য স্থান ছিল না। তিনি সবকিছুকে জীবন ও কবিতায় একাকার করে দেখতে চেয়েছেন। নির্যাতিত মানুষের প্রতি তাঁর সহানুভূতি যেমন খাটি তেমনি বাস্তবতার চিৎকৃত ধ্বনি যে কবিতা নয় তা কবিজীবনের সূচনালগ্নেই তার কাছে সুস্পষ্ট ছিল। তরুণী, রূপসী জীবনের সংলগ্ন উপকরণ হিসেবে যেমন ঠিক ঠিক স্থান দখল করে নিয়েছে তেমনি মানবমুক্তির সংগ্রামী সাহসী যুবা এবং নেতৃত্বের ঋত্বিক মহৎ চরিত্র হয়ে উঠে এসেছিলেন তিনি তাঁর কবিতায় কবিতাকে বিন্দুমাত্র খর্ব না করেই।
শামসুর রাহমানের কবিতার সংখ্যার দিকে তাকালে বলতে হয়, কবিতার জন্যেই তাঁর জন্মগ্রহণ। সময় ও সংখ্যার অনুপাত কষলে আমরা দেখবাে, বাংলা ভাষার প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের পাশাপাশি তাঁর স্থান থাকবে সবসময়।
যে-সব কবিতা তাকে এই আসন দিয়েছিল সে-সবের সোনার মতো রঙ এবং হীরের মতো তাদের দীপ্তি। আসলে শামসুর রাহমান ছিলেন একই সঙ্গে কবি ও চিত্রকর। নতুন স্বপ্নের রাজ্য নির্মাণ করেছেন তিনি। শব্দ ও ছন্দের এমন মিলনকেই বুঝি বলা যায় হরিহর আত্মা। তিনি কবিতার পাঠকের মনে এই বিশ্বাস স্থাপন করতে চেয়েছিলেন যে কবিতাকে হতে হয় মহৎ, যা শুধু শব্দ ও ছন্দ দিয়ে হয় না। বিষয় দিয়ে উৎকর্ষে পৌঁছতে হয়। তিনি এও জানতেন যে কবিকে হতে হয় সত্যান্বেষী। এই বোধে প্রাজ্ঞ হওয়ার দরুন তাঁর কোনাে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অনড় আনুগত্য ছিল না। খোলা চােখ ও খোলা মন নিয়ে সব বিশ্লেষণ করে বিশ্বমানবতার শক্তিকে বলীয়ান করার কাজকে প্রাধান্য দিতেন তিনি। তবে সবার উপরে নিরন্তর কবিতা লিখে যাওয়াই তার কাছে সত্য ছিল।
শামসুর রাহমানের কবিচারিত্র্যে এর সার্থক রূপায়ণ আমাদের আশ্বস্ত করে। তার পাঠক হিসেবে আমাদের মনে হয় যে কবিকে একই সঙ্গে আদিম ও আধুনিক হতে হয়। কবিতার যে-প্রতিমা তাতে প্ৰাণের প্রতিষ্ঠা এ দাবি করে। শামসুর রাহমান তা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে গিয়েছেন। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র কবির কাজ সম্পর্কে বলতে গিয়ে 'কৃত্তিবাস”-এর প্রথম সংখ্যায় (শ্রাবণ, ১৩৬০) তাঁর প্রবন্ধে বলেছিলেন, "কাব্যের মহৎ সাধনা…. ব্যক্তি-চিত্রকল্প থেকে লোক-চিত্রকল্পের সাধারণ্যে উত্তরণ। এতে অবশ্য তৃপ্তি আত্ম-প্ৰসাদের নয়, আত্ম-ব্যাপ্তির, আত্ম-ত্যাগের”। অর্থাৎ তিনি চেয়েছেন, "ব্যক্তি-চিত্রকল্প থেকে লোকচিত্রকল্পে”র দিকে ফিরে আসুক বাংলা কবিতা অর্থাৎ কবির আত্মকেন্দ্রিকতার বদলে ঘটুক আত্মবিস্তার। আমরা এই পালাবদলও প্রত্যক্ষ করেছি শামসুর রাহমানের কবিতায়।
নতুনের পরীক্ষা নিরীক্ষায় সফলতা-ব্যর্থতা দুই-ই থাকে। শামসুর রাহমানের বেলায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে নির্দ্বিধায় বলা চলে যে সফলতার শিরোপা বেশি লাভ করেছিলেন তিনি। কবিতাকে সর্বপ্রভায় আলোকিত করার জন্যে একজন কবিব্রতীর যে নতুন পথের যাত্রিক হতে হয় সেই যাত্রাপথেরও পথিকৃতের সফল কাণ্ডারি ছিলেন শামসুর রাহমান।
১৯৭০ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত “স্বনির্বাচিত" কাব্যসংগ্রহের ‘সাংস্কৃতিক অগ্রগতিতে কবির ভূমিকা' এই প্রশ্নের উত্তরে শামসুর রাহমানের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য;
“যেহেতু সাহিত্য সংস্কৃতির প্রধানতম অঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত, তাই সাংস্কৃতিক অগ্রগতির সঙ্গে কবির ভূমিকা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বর্তমানে বিজ্ঞান ও টেকনােলজির প্রভাবে সংস্কৃতির অঙ্গনে নানা পরিবর্তন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনকে ধারণ করবে যে-কবির রচনা তাকে হতেই হবে জােগর চৈতন্যের অধিকারী। বুঝি তাই লুই ম্যাকনীস বলেন, আধুনিক কবি হবেন, ‘I would have a poet able bodied, fond of talking, a reader of the newspapers, capable of pity and laughter, informed in economics, appreciative of women, involved in personal relationships, actively interested in politics, susceptible to physical impressions’। ম্যাকনীস-বর্ণিত কবির পক্ষেই সম্ভব নিজস্ব অবদানে নব্য সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করা, সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পক্ষে সহায়ক দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা।”
২৩শে অক্টোবর ছিল এই মহান কবির জন্মবার্ষিকী। বাঙলার এই মহান কবির প্রতি রইলো সশ্রদ্ধ্য ভালোবাসা।
Share /

No comments

Post a Comment

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz