সৃজনশীল ভাবনার জন্ম হচ্ছে কই?

Thursday, April 6, 2017


দেশ পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যাটিতে সুমিত মিত্র নামে একজন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। দুই বাংলা ও প্রবাসী বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের বিষয়টি ভোগাচ্ছে অনেকদিন ধরে। সুমিত মিত্র বলছেন; “একটি খাঁটি সত্যি কথা দিয়ে শুরু করি। বর্তমানে আমার পরিপার্শ্বে আমি যা সবচেয়ে ঘেন্না করতে শুরু করেছি তা হল, বাড়ির টেলিভিশন সেটটি। এমনই বিরক্তিকর হয়ে পড়েছে ওই বোকাবাক্স যে, টিভি না খুলে ক্রিকেট দেখতে শুরু করেছি ইউটিউবে। অর্থাৎ তা কেবল সজীব ছবি নয় বাসি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক খবর ও মতামত সবই আজকাল মোবাইল ফোনেই পাওয়া যায়। তার জন্য টিভির সামনে গুটিগুটি বসার প্রয়োজন নেই। শুধু কখনও-সখনও গভীর রাতে প্রিয় চ্যানেল বিবিসি খুলে দেখি— ভলিউম কম থাকে— যাতে কারও ঘুম না ভাঙে।
“বাংলা সিরিয়ালের উদ্দেশ্য হোক দর্শককে শুধু নিম্নস্তরের বিনোদনে আচ্ছন্ন করে বসিয়ে রাখা নয়, তাঁকে চিন্তা করতে সাহায্য করা।”
টিভি সম্পর্কে আমার ভীতির মূল কারণ বাংলা টেলিসিরিয়াল। পৃথিবীতে জনসমক্ষে বোকামি ও নিম্নরুচির প্রদর্শনীর অনেক মঞ্চ আছে। যেমন, মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শিহরন জাগানো টুইট অথবা জনৈকা জননেত্রীর স্বরচিত গদ্য অথবা আসন্ন বইমেলার দিকে নজর রেখে ‘নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য’ সংক্রান্ত নতুন আর-একটি বই। কিন্তু বাড়িতে বসে মনে হয়, এসব কিছুই ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলা টেলিসিরিয়াল।

আমার আপত্তির কারণ দু’টি। প্রথমটি নৈতিক। জীবনের অশুভ ও অশুচি দিকটিকে ছবি বা টেলিভিশনের পরদায় প্রদর্শন করাটা প্রযোজকের স্বাধীনতা। আমেরিকা বা ইউরোপে অনেক চ্যানেল আছে, যেখানে পুরোপুরি পর্নোগ্রাফি বা খুনজখম দেখানো হয়, যদিও তা সম্প্রচারের বিধি মেনে। হিন্দি সিরিয়ালেও অপরাধ-ঘটিত গল্প প্রচুর। কিন্তু একটি বাংলা বিনোদন চ্যানেল বেশ কিছুদিন জনপ্রিয়তার শিখর স্পর্শ করেছে শুধুমাত্র একটি পরিস্থিতিকেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখিয়ে। তা হল, কল্পিত কিছু যৌথ পরিবারের অন্দরে একগুচ্ছ খলনায়ক ও খলনায়িকার উপস্থিতি। সচরাচর খলনায়িকা ও মহীয়সী নায়িকা, দু’জনেই একই নায়কের শয্যাকক্ষে কখনও প্রবেশ করছেন প্ৰথমজন, কখনও দ্বিতীয়। শাশুড়িরা সচরাচর অত্যাচারী ও ষড়যন্ত্রকারী। ষড়যন্ত্রের ফল সুদূরপ্রসারী। হত্যা করার ‘সুপারি’ দেওয়াটাও প্রতি এপিসোডের ঘটনা। অবশ্য ‘সুপারি’কল্পিত প্ল্যান প্রতিবারই বানচাল হয়। কারণ, নায়িকা গতায়ু হলে সিরিয়াল চলবে কেমন করে! ষড়যন্ত্রের অংশীদাররা সকলেই পারিবারিক শাখাপ্রশাখার অন্তর্গত। ফন্দিটা যেন মহাভারত থেকে নেওয়া। কেউ নায়কের কাকা, যে ভাইপোকে সরিয়ে দিয়ে সম্পত্তি লোপাটের স্বপ্ন দেখছেন। কেউ পেশাদার খুনি, মূল পরিবারের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ। তবে সব কাহিনিরই হিংসা, ঘৃণা, ঈৰ্ষা ও লোভ।

আমার নৈতিক আপত্তির অপর একটি কারণ হল, দর্শকরা— বিশেষ করে মহিলা ও সারাদিন ঘরবন্দি বয়স্ক পুরুষ— সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সিরিয়ালের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন। সেদিন এক চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে শুনলাম, রোগীর ভিড় নাকি শুরু হয় রাত ন’টায় একটি সিরিয়াল শেষ হওয়ার পরক্ষণেই। এই মহিলা ও বৃদ্ধ দর্শকেরা মোটেই চিন্তিত নয় কী হল উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনে, বা কী চেহারা নেবে পণ্যপরিষেবা শুল্ক, এবংবিধ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ বিষয়ে। সেই দর্শকদের কাছে যা প্রাসঙ্গিক তা হল, খলনায়ক এবার কতটা নৃশংসতার পরিচয় দেবে বা খলনায়িকা কি এখন ধরা পড়তে চলেছে? অ-চর্চিত মনের উপর এই অযৌক্তিক ও কুৎসিত কাহিনিগুলি প্রভাব বিস্তার করতেই পারে।

পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী মহিলারা ভারতের নারীসমাজের ৭.৫ শতাংশ। কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০১২, এই চারবছরে যত গাৰ্হস্থ হিংসার ঘটনা ঘটেছে, তার ১২.৫ শতাংশ এই রাজ্যে। অর্থাৎ পারিবারিক হিংসা ও উত্তেজনা জনসংখ্যার তুলনায় দ্রুতহারে বাড়ছে।

আমার দ্বিতীয় আপত্তি সাংবিধানিক অধিকার সংক্রান্ত। সংবিধান-প্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা যেতে পারে যদি সেই মতপ্রকাশ দ্বারা লঙ্ঘিত হয় ‘শৃঙ্খলা’, ‘শোভনতা’ ও ‘নৈতিকতা’ ( ‘...public order, decency or morality...’ Article 19 (2))। কিন্তু যা হচ্ছে তা ঠিক তাই। পৃথিবীর অন্যত্র যেমন টেলিভিশনে আছে নানা চ্যানেলের বৈচিত্র, তেমনই বড় ও ছোট পরদার মাধ্যমে ইন্টারনেট ছড়িয়ে পড়েছে। তার উপর হাজির হয়েছে টুইটার, ফেসবুক প্রভৃতি সোশ্যাল মিডিয়া। এসেছে নেটফ্রিক্সের মাধ্যমে অনেক নতুন চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ। এ ছাড়া কম মূল্যে (কখনও-বা বিনামূল্যে) প্রচুর মনোগ্রাহী বই ডিজিটাল মাধ্যমে কিনে অলস বিকেলে নিজের মোবাইলে বা ট্যাবলেটে তা পড়ার আনন্দ। কমেছে টেলিভিশন নির্ভরতা।

বোকাবাক্সে আটকে যাওয়া এই রাজ্যের বেশির ভাগ মানুষ সিরিয়ালের কষ্টকল্পিত ঘটনা ও বিকৃত চিন্তাধারার মধ্যে বন্দি হয়ে হয়তো ভাবতে শুরু করেছেন যে, এটিই জীবন। তাঁরা রিমোট যন্ত্রে অন্য বোতাম টেপার স্বাধীনতাটিও বিসর্জন দিয়েছেন। এই আচলায়তন ভাঙার একমাত্র উপায়, প্রকৃত লেখকরা এগিয়ে আসুন সিরিয়ালের আঙ্গিকে সৃজনশীল গল্প নিয়ে। সিরিয়ালের উদ্দেশ্য হোক দর্শককে শুধু নিম্নস্তরের বিনোদনে আচ্ছন্ন করে বসিয়ে রাখা নয়, তাঁকে চিন্তা করতে সাহায্য করা।”
Share /

No comments

Post a Comment

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz