ম্যাক্সিম গোর্কি

Wednesday, July 26, 2017

ম্যাক্সিম গোর্কিকে লেখা বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও মনীষী রম্যা রঁলার একটি চিঠির অংশবিশেষ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

‘...এক শীতের ভাটার টানে আপনার আবির্ভাব, যখন মহাবিষুবের লক্ষ্যে সবে বসন্তের মৃদু পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এই কাকতালীয় ঘটনাটি আপনার জীবনে গভীর অর্থবহ কারণ জীর্ণ-পুরাতন পৃথিবীতে জন্মেও নতুন বিশ্বের সঙ্কেত-ঝড়ে আপনি ক্রমবর্ধমান হয়েছেন। অতীত ও বর্তমান—দুই পৃথিবীর যোগসূত্রে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন দীর্ঘ এক সেতুর মতো। আমি সেতুটিকে অভিনন্দন জানাই। এ সেতু আকাশচুম্বী। আমাদের নতুন প্রজন্ম যুগে যুগে শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ে এই সেতুর দিকে তাকিয়ে থাকবে...।’

১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে নিঝনি-নভোগদের শ্রমিক আলেক্সি পেশকভ যখন ম্যাক্সিম গোর্কি ছদ্মনামে প্রথম গল্প লেখেন, তাঁর বয়স মাত্র চব্বিশ। ইতিমধ্যেই বিচিত্র জীবন ও জীবিকার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর পাঠশালায় যে রুক্ষ, তিক্ত ও সুগভীর অভিজ্ঞতা তিনি অর্জন করেছিলেন, বিশ্বের খুব কম লেখকের ভাগ্যেই তা ঘটে। ম্যাক্সিম গোর্কির জীবন অগণিত পাঠকের কাছে সুবিদিত। শুধু একটি বিশেষ ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যা গভীর তাৎপর্যবহ। উনিশ বছর বয়সে, গোর্কি যখন কাজানে এক রুটি কারখানার শ্রমিক, লেনিনের নেতৃত্বে সেখানে এক ছাত্র-বিদ্রোহ ঘটে। এই বিদ্রোহ দমন করতে, ছাত্রদের ওপর আসুরিক বলে চড়াও হয় কাজানের রুটি-শ্রমিকরা, গোর্কি যাদের গভীর আস্থা নিয়ে বোঝাতেন সমাজ পরিবর্তনের কথা। গোর্কির আস্থাভাজন এই শ্রমিকরা যখন এই ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হয়, দুঃখে বেদনায় গোর্কি কাজাঙ্কা নদীর তীরে নিজের বুকে গুলি চালিয়ে আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেন। সুখের বিষয়, গুলি তার ফুসফুস বিদ্ধ করতে পারে না এবং গোর্কিকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করলে, ঐ শ্রমিকরাই গভীর ভালোবাসা ও মমতা নিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ায়। ঐসব শ্রমিকের মুখে গোর্কি লক্ষ করেন আগামী দিনের ইতিহাস। দেখতে পান সামাজিক পরিস্থিতি কেমনভাবে মানুষকে পশুত্বে পরিণত করে। সুতরাং জীবন-ধারার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। এ অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুন কর্মে নিয়োজিত করে, জীবনের এই বিপুল অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি স্থির থাকতে পারেন না, বাধ্য হন কলম ধরতে।
শুরুতে তিনি প্রধানত ভলগা অঞ্চলের কাগজপত্রেই লিখতেন এবং ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে গোর্কির প্রথম গল্পগ্রন্থ Sketches and Stones যখন প্রকাশিত হয়, রাতারাতি সারা দেশের পাঠক নতুন প্রতিভায় চমকে যায়। এরপর উপন্যাস Foma Gordeyev, The Three এবং নাটক The Lower Depth প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তার খ্যাতি দেশ-কালের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্ব সাহিত্যের আঙ্গিনায় পৌঁছে যায়। গোর্কির Foma Gordeyev, টলস্টয়ের Resurrection-এর মতোই সমানভাবে রুশদেশে আলোড়ন ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

গোর্কির এই প্রথম পর্বের লেখায় একদিকে আমরা পাই সরল মানবিকতা, শ্রমিক, ভবধুরে, পতিতা—রাশিয়ার জনসাধারণের এক বৃহৎ অংশের দুঃখ-যন্ত্রণা, বঞ্চনা, হতাশা ও শোষণের ছবি, অন্যদিকে মালিক, ব্যবসায়ী, বিত্তবানদের স্থূল, লোভী ও সর্বগ্রাসী লুঠ ও ক্ষমতার চিত্র। এই চরিত্রগুলো গোর্কি এত গভীর ও আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, নাটক, উপন্যাস ও গল্পে তা জীবন্ত হয়ে উঠলো। My Travelling Companion, Twentysix Men and a Girl, Konovalov, Kolusha প্রভৃতি প্রথম পর্বের গল্পে এ ছবিগুলোই সুস্পষ্ট।

বিংশ শতাব্দীর সূচনায়, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে, The Three উপন্যাসের মধ্য দিয়েই গোর্কির নতুন জীবন-দর্শন ও সাহিত্যের সূচনা লক্ষ করা হয়। তাঁর প্রথম পর্বের গল্প Old Izergil-এর রূপকাহিনীই বাস্তব পৃথিবীতে The Three-এর মধ্যে সঞ্চারিত হলো। নতুন পৃথিবীর অস্পষ্ট আভাস পাওয়া গেল এই উপন্যাসের মধ্যে। এরই স্পষ্ট, চূড়ান্ত রূপ হিসেবে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে আবির্ভূত হলো Mother। Mother উপন্যাসের ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা এখানে থাক, পৃথিবীর আর কোনো উপন্যাস এভাবে সমাজকে আলোড়িত করেনি। দেশে দেশে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে অত্যাবশ্যক হয়ে ওঠেনি।

প্রথম পর্বে গোর্কি শ্রমিকশ্রেণীর শোষণ-বঞ্চনা সুষ্ঠুভাবে চিত্রিত করলেও, শ্রেণী হিসেবে শ্রমিকদের ক্ষমতা ও আগামী দুনিয়ার নিয়ন্তা হিসেবে, জনগণের বিবেকের প্রহরী হিসেবে, শ্রমিকদের লুক্কায়িত শক্তির সন্ধান পাননি। সে জন্যই গোর্কির সাহিত্য-জীবনে Mother বিশিষ্ট স্থান অর্জন করে আছে। সরল মানবিকতা থেকে গোর্কি উত্তীর্ণ হন শ্রেণী-মানবিকতায়। যখন মা সোচ্চারে বলার ক্ষমতা অর্জন করেন—‘They can’t kill may spirit—my living spirit’।

গোর্কির দৃষ্টিভঙ্গির এই গভীরতা ও নবরূপ আনয়নে রাশিয়ায় ১৯০৫-এর অসমাপ্ত বিপ্লব অন্বিত হয়ে যায়। এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গোর্কির বিশ্ব-দৃষ্টি ও নান্দনিক বোধের দুটো সুস্পষ্ট মতামত আমরা পাই। তিনি বিশ্বাস করেন বিপ্লবী পরিস্থিতির মধ্যে জনগণের সঙ্গে একাত্ম হলেই আত্মার পুনর্জাগরণ ঘটবে, বিপরীতে সামাজিক ও ঐতিহাসিক ঝড়-ঝঞ্ঝা উপেক্ষা করে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকলে মানুষের মধ্যে জন্ম নেয় ‘বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিত্ববাদ’। Mother উপন্যাস প্রথম ধারার ফসল, দ্বিতীয় ধারায় তিনি সৃষ্টি করেন বিশ্ব-সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস Life of Klim Samghin। চার খণ্ডে লিখিত এই উপন্যাসে গোর্কি দেখিয়েছেন ‘সামদ্বিন-বাদ’ কিভাবে মানুষের আত্মিক মুক্তি ও পুনর্জাগরণে বাধা সৃষ্টি করে।

এই শ্রেণী-মানবতাবাদই পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার জন্ম দেয়। সাহিত্যধারার এই দ্বিতীয় পর্বে গোর্কির অন্যতম উল্লেখযোগ্য গল্প A Man is Born, The Creepy Crawlies, First Love; উপন্যাস The Artamonovs, আত্মজীবনীমূলক Trilogy উপন্যাস এবং নাটক।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে, বিপ্লবের পর, লেনিনের উপদেশে গোর্কি ইতালিতে বিশ্রাম করতে যান। ক্ষত ফুসফুস তার স্বাস্থ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছিল। এই পর্বেই সৃষ্টি হয় Tales of Italy। গোর্কির স্বাস্থ্যের ক্রমঅবনতি ঘটতে থাকে কিন্তু নতুন সোভিয়েত গঠনে তার পরিশ্রম চতুর্গুণ বেড়ে যায়। শুধু গল্প উপন্যাস নয়, সাংবাদিকতা থেকে শুরু করে নতুন লেখক সৃষ্টির দায়িত্ব, লেখকসংঘ গঠন, সোভিয়েতে নানা জাতির সাহিত্য-বিকাশে গোর্কি অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। ১৯২৮-এর পর স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি ঘটলে প্রতিবছর ইতালির আবহাওয়ায় কিছু দিন কাটিয়ে আসতে যান কিন্তু ১৯৩৩-এর পর পাকাপাকি সোভিয়েতেই বসবাস শুরু করেন। ইতিমধ্যে জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের অভ্যুদয়ে গোর্কি বিশ্বের শান্তিপ্রিয় ও সুস্থ বিবেকসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর ভগ্নস্বাস্থ্যের কোনো উন্নতির লক্ষণ দেখা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে গোর্কি মৃত্যুমুখে পতিত হন। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে তাঁর শেষ কথা উচ্চারিত হয়েছিল ‘There’ll be wars.… We must be prepared!...’ Old Izergil-এর Donko চরিত্রটির মতোই তিনি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন।

ভূমিকাঃ ম্যাক্সিম গোর্কির ছোটগল্প

ম্যাক্সিম গোর্কির কিছু বাংলা বইয়ের লিঙ্ক। 
Share /

No comments

Post a Comment

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz