অন্ধের স্পর্শের মতো
সম্প্রচারের ভাষা
প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা ২০০৭
শঙ্খ ঘোষ



'ভালো করে কথা ভাবা এখন কঠিন'

শুরু করা যাক রবীন্দ্রনাথ দিয়ে, "কৃত্রিমতাই মনুষ্যের সর্বপ্রধান গৌরব।....গাছকে আপনার পল্লব প্রস্তুত করিতে হয় না, আকাশকে আপনার নীলিমা নির্মাণ করিতে হয় না , ময়ূরের পুচ্ছ প্রকৃতি স্বহস্তে চিত্রিত করিয়া দেন। কেবল মানুষকেই বিধাতা আপন সৃজন-কার্যের অ্যাপ্রেন্টিস করিয়া দিয়াছেন, তাহার প্রতি ছোটোখাটো সৃষ্টির ভার দিয়াছেন।" কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এই সৃষ্টির ভার আমিত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখেন। আজ যেখানেই যাই আমি, আমি শুধু আমি। আমরা কথাটা আমাদের আর আসে না। একারণেরই আজ আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আজ আমরা যতই কাছে আসি না কেন, বন্ধুও হইনা কেন, তবুও যেন আমরা সংযোগবিহীন টুকরো টুকরো একেকটি দ্বীপ। মাঝে মাঝে এই দ্বীপেও মিলে যায় মনের মনন, চিন্তার বন্ধুত্ব। সম্প্রতি বন্ধু এমদাদ রহমান একটি ভাষণের খোঁজ দেন। ভাষণটি দিয়েছিলেন  শঙ্খ ঘোষ। এক যুগের বেশি হলেও এখনও প্রাসঙ্গিক। এখনও শরীরে উত্তাপ ধরিয়ে দেয়। 'পাওয়ার অব দি মোমেন্টের' সংযোগ তৈরি করে। ঐ যে বলছিলাম মানুষ হয়ে যাচ্ছে একেকটি দ্বীপ, কিন্তু এরই মাঝে কিছু মানুষ আছেন যারা এখনো এই সংযোগ চান। এই সংযোগের জন্যই আমার যত ভালোবাসা। 

কৃতজ্ঞতা জানাই প্রণবেশ সেন স্মারক সমিতিকে, বিশেষ করে গাঙচিলের প্রকাশক অণিমা বিশ্বাসকে কারণ তাঁর কল্যাণেই এই ভাষণটি বই হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। 
আজ আপনাদের কাছে এই ভাষণটি পড়ার জন্য পৌছে দিচ্ছি, আশা করছি আপনাদের ভালো লাগবে। 
-রিটন খান

*** কিছু বানান ভুল হলে জানাবেন ঠিক করে দেবো। 

অভ্যাগত সবাইকে আমার নমস্কার জানাই। প্রণবেশ সেনের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাই।

এখানে যে বলা হলাে, এ বছরের স্মারক বক্তৃতা দিতে আমি রাজি হয়েছি, তা ঠিক। কিন্তু সাত দিন আগে পর্যন্তও চেষ্টা করেছিলাম যে, যদি কোনােরকমে এটা বন্ধ করে দেওয়া যায়।

এগুলাে আমি এমনিতেই পারি না। আর তাছাড়া, এই সময়টা! এমন একটা সময়ে এসে পৌছেছি আমরা— জীবনানন্দের কবিতার লাইন মনে পড়ে, ‘ভালাে করে কথা ভাবা এখন কঠিন’!

কিন্তু বলতে তবু হবে। তার কারণ ইতিমধ্যেই আমার শেষ মিনতি জানাবার আগেই ছাপা চিঠি নানা জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছেন ভবেশ।

তাঁকে তখন জানাতেও পারিনি যে কী বিষয়ে বলব। এখন যেটা বলা হলাে (‘সংযােগের ভাষা’) দিনতিনেক আগে কাউকে বলেছি এ-রকম একটা নাম। নাম না, বিষয়। ঘণ্টাখানেক আগে আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করছিলেন, কী বিষয়ে বলব। লিখে এনেছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাকে যে বিষয়টা বলতে পেরেছি, তা নয়। একথাগুলাে বলে নিচ্ছি এইজন্যে যে একটু এলােমেলাে কথা হয়তাে থাকবে, লিখে আনা সত্ত্বেও।

ভবেশ আরাে আমাকে বলেছেন যে, এক ঘণ্টা বলতে হবে। সেটা আমার পক্ষে একটু শক্ত হলেও ওটা নিয়ে ভাবছি না, ভাবছি আপনাদের কথা। এই সময়টা আপনাদের একটু সহ্য করতে হবে।

এই লেখার প্রথম দিকের কয়েকটা লাইন, পাঁচছটা লাইন, ছেড়ে দিলে, এর আছে পাঁচটা অংশ। অংশগুলি আপনারা বুঝতে পারবেন, সেটা আমি বলে দেব। লেখার একটা নাম আছে। নাম: ‘অন্ধের স্পর্শের মতাে’।

জীবনের শেষ কয়েকটা বছর চোখে দেখতে পেতেন না আমার বাবা। বই পড়তে ভালােবাসতেন, কিন্তু পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ভালােবাসতেন কথা বলতে। কিন্তু কথাও কিছুটা থমকে গেল। অভ্যাগতেরা কেউ দরজায় এসে দাঁড়ালে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করতেন: ‘কে?’ নাম শুনে কই, হাতটা দেখি’ বলে বাড়িয়ে দিতেন হাত। তারপর সেই অভ্যাগতের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন চুপ করে। কথা কখনাে হতাে, কখনাে হতাে না। কিন্তু হাতের ওই জড়িয়ে-থাকাটুকু ছিলই।

০১.

কারাে সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, আমরা চাই যে সেই কথাটা সে বুঝুক; আমার ভাবনাটা বা দৃষ্টিভঙ্গিটা তার কাছে গিয়ে পৌছক। এইরকমই হবার কথা। কিন্তু সবসময়েই কি সে-রকম চাই আমরা? বা, প্রশ্নটাকে অন্যভাবেও সাজানাে যায়: জ্ঞাতসারে তেমনটা চাইলেও, অজ্ঞাতেও কি সেইরকমই চাই সবসময়ে ? সে বুঝুক, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এটা অবশ্য চাই। কিন্তু কী বুঝুক? আমার কথাটা? ভাবনাটা? না কি অনেকসময়ে এইটে: আমি-যে ভাবতে পারি, সেই ক্ষমতাটা? কিংবা অনেকসময়ে, তারও চেয়ে একটু এগিয়ে, ভাবতে পারি বা না পারি, আমি যে আমি, সেই অবস্থানটা? কথা বলা একটা সংযােগ। কিন্তু ওইসব সময়ে, ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় কেবলমাত্র অ-যােগ নয়— সেটা সমূহ বি-যােগেও গিয়ে পৌছতে পারে।

এসব নিয়ে অল্পসময়ের জন্য একটু ভাবতে হয়েছিল একবার, প্রায় চল্লিশ বছর আগে, আকাশবাণী-গত একটা অভিজ্ঞতার ফলে। সেখান থেকে একটা ডাক এসেছিল অলােকরঞ্জন দাশগুপ্তের আর আমার, বলবার মতাে একটা কাজ পাওয়া গিয়েছিল কয়েক সপ্তাহের জন্য। সন্ধেবেলায়, সংবাদ আর স্থানীয় সংবাদের মধ্যবর্তী পাঁচ মিনিটের বিরতিপর্বে, একটা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হয়েছিল ‘সমীক্ষা’ নামে। সেই সমীক্ষায় আমাদের উপর দায়িত্ব বর্তেছিল সাহিত্যসংস্কৃতি নিয়ে কিছু বলবার। সংবাদ-স্থানীয়সংবাদের মাঝখানে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাহিত্যের কোনাে প্রসঙ্গে কী করে কথা বলব, কী কথাই-বা বলব, অল্পবয়সের উত্তেজনায় সেসব দুরূহ সমস্যা নিয়ে কিছু ভাবিইনি আমরা। সাগ্রহেই, সপ্তাহে একদিন করে, বলেছিলাম কিছু কথা।

কিন্তু শ্রোতাদের কেমন লাগছিল সেটা? নিকটবন্ধুদের প্রশ্রয়ে আমরা অবশ্য তৃপ্তই ছিলাম, কিন্তু সে-তৃপ্তিতে ধ্বস নামল একদিন। অলােকরঞ্জনের মা, আমাদের মাসিমা, দুঃখের স্বরে একদিন বললেন আমাকে: অলােক বলে শক্ত শক্ত শব্দ আর তুমি সহজ সহজ, কিন্তু তােমাদের কারাে কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ! চমক লাগল শুনে। বুঝতে পারে না? তাহলে বলছি কেন? এ-প্রশ্নের পরেই মনে হলাে: কারা বুঝতে পারে না? মাসিমার কাছে কারা এই অভিযােগ জানিয়েছে? খেয়াল হলাে তখন: সংবাদ আর স্থানীয় সংবাদ শােনেন যে অসংখ্য মানুষজন, সাহিত্য-বিষয়ে যাঁদের মধ্যে অনেকেরই কোনাে স্বতন্ত্র আকাঙক্ষা বা অধিকার নেই, তাদের আকাঙক্ষা জাগাবার মতাে কোনাে ভাষা বা রীতি কি আমরা ব্যবহার করতে পারছি? সাহিত্য-বিষয়ে অভিজ্ঞ যারা এবং সে-বিষয়ে যাঁরা অনভিজ্ঞ, একইসঙ্গে এই দু-রকমের শ্রোতার কাছে পৌছবার কোনাে পথের কথা কি আমরা ভেবে নিয়েছি? অর্থাৎ এ-লেখার সূচনায় যে-প্রশ্নগুলি তুলেছিলাম, তার সঙ্গে এখানে জুড়ে যায় আরাে কিছু প্রশ্ন: ভেবেছি কি কার সঙ্গে কথা বলছি আমরা, বা কাদের সঙ্গে? কথাটা পৌছে দিতে চাইছি ঠিক কাদের কাছে?

না, শুধু এইটুকুই নয়, প্রশ্ন ওঠে আরাে। শ্রোতাচরিত্রের কথা ছেড়ে দিলেও, যিনি বলছেন, তার অবস্থানটা ঠিক কী? তিনি কি সামনাসামনি একজনের সঙ্গে কথা বলছেন? তিনি কি সামনাসামনি অনেকের সঙ্গে কথা বলছেন? তিনি কি মঞ্চগত দূরত্ব থেকে বলছেন? কিংবা, শ্রোতা বা দর্শক যেখানে অদৃশ্য, সেই দূরদর্শনে বলছেন নিজে দৃশ্যমান থেকে? না কি রাজা নাটকের রাজার মতাে স্বরমাত্র হয়ে ভেসে থাকছেন আকাশবাণীতে? এর প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রোতা আর বক্তার সম্পর্কের মধ্যে একটা বদল ঘটে যায়, আর সেই অনুযায়ী স্থির করে নিতে হয় ভাষা। এমনকী, কখনাে কখনাে হয়তাে, সেই অনুযায়ী স্থির করে নিতে হয়। বিষয়ও। এসব কথা সেদিন আমরা অন্তত আমি ভেবে নিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে না। অত্যুৎসাহে আমরা কেবল আমাদের জানা-বােঝাটাকেই প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম সেইভাবে, যেভাবে আমরা লিখি, যে-লেখার সামনে কোনাে শ্রোতা নেই, আছে পাঠক। পাঠকের জন্য উদ্দিষ্ট লেখা শ্রোতারও কাছে পৌছবে কীভাবে, সেটা তেমন করে ভাবিনি বলেই মাসিমাকে সকাতরে বলতে হয়: তােমাদের কারাে কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ!

ধরা যাক আমি কথা বলছি কবিতা আর সমসময়ের সম্পর্ক নিয়ে। কোনাে আনুমানিক ব্যাপার নয় এটা, একদিনের সমীক্ষার বিষয় হিসেবে এটাই ছিল একবার আমার নির্বাচন। পাঁচ মিনিটের অবকাশে সেদিনকার কথিকায় শেষ অনুচ্ছেদটি এবং তার পূর্ববর্তী একটি বাক্য ছিল এইরকম:

কেবল ঐতিহ্য নয়, তখন তিনি [কবি] চান প্রবহমান বিশ্বকালকে তার মধ্যে বহন করতে, আর এ-দুয়ের নিরন্তর সংঘর্ষ থেকে দেখা দিতে থাকে আজকের দিনের আধুনিকতা।

এইটেই মনে ছিল, যখন জীবনানন্দ বলেছিলেন, কবিতার অস্থির মধ্যে চাই ইতিহাসচেতনা আর তার মর্মে চাই পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান। এই জ্ঞানেই উজ্জয়িনীর সময় মিশে যায় মিশর বা গ্রীসের সঙ্গে, এই চেতনাতেই একনিশ্বাসে বাঁধা পড়ে উর্বশী আর আর্টেমিস। কিন্তু কবি কখনােই ভুলে যান না যে এক হাতে এই দেশনিহিত কাল আর অন্য হাতে দেশােত্তর কাল ধারণ করবার মুহূর্তেও তিনি পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন অস্থির সমসময়ের সংকটের ওপর। সময়ের এই জটিল প্রত্যাঘাতই কবিতাকে এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্তে সঞ্চারিত করে নেয়। 


কথাগুলি লিখবার সময়ে সেদিন নিশ্চয় মনেই রাখিনি যে এটা যারা শুনছেন তাদের অনেকেরই কাছে এর কয়েকটি শব্দ প্রায় ধাঁধার মতাে লাগবে, কেননা তারা অনেকেই আধুনিক কবিতার জগৎটাকে ঠিকমতাে জানেন না। তাই উজ্জয়িনীর সঙ্গে মিশর বা উর্বশীর সঙ্গে আর্টেমিস একসঙ্গে বাঁধা পড়বার কথা কেন এখানে উঠে এল হঠাৎ, জীবনানন্দ বা বিষ্ণু দে-র কবিতা নিয়ে সামান্য একটু বিস্তারে না বললে অনেকেরই কাছে পৌঁছবে না এর কোনাে তাৎপর্য। ফলে গােটা অনুচ্ছেদটাই সেই শ্রোতার কাছে থেকে যাবে অনধিগম্য, প্রায় অর্থহীন। কথাগুলি যদি কেউ পড়েন, তাহলে হয়তাে-বা তিনি সময় পেতে পারেন বুঝে নেবার, বিশ্লেষণ করে নেবার, কিন্তু সেই সময়টা তাে শ্রোতার আয়ত্তে নেই। আমাদের বােঝা উচিত ছিল যে অলক্ষ্য এবং অসংখ্য সেইসব শ্রোতার জন্য চাই ভিন্ন একটা ভাষা। ব্যক্তিগত জানার অভিমানে সেকথাটা সর্বতােভাবে আমরা ভাবিনি সেদিন।

কিন্তু আরাে একটা প্রশ্ন আছে এখানে, মাসিমা যখন দুঃখটা জানিয়েছিলেন, তখন কি পুরােপুরি ব্যর্থতারই বােধ জেগেছিল মনে? না কি সেইসঙ্গে গােপন একটা অহমিকাও লালিত হচ্ছিল সেখানে? এই অহমিকা, যে, আমি এমন-কিছু বলছি যা অন্যের আয়ত্তের বাইরে। অর্থাৎ, এইখানে আমি পৃথক, এইখানে আমি খানিকটা উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। আর, সেই পৃথক অধিষ্ঠানকে সম্ভ্রম করছে অন্য লােকে। না-বুঝবার সম্ভ্রম । আমার বুঝবার বা জানবার ক্ষমতার প্রতি অন্যের অক্ষমতার সম্ভ্রম । আর এইটেকেই আমি আমার স্বতন্ত্রতা বলে ভাবছি, ভেবে তৃপ্ত হচ্ছি।

কিছুদিন আগেকার একটি সংলাপে নােঅম চম্‌স্কি একবার বলেছিলেন, কারাে কাছে চার সিলেবলের কোনাে শব্দ শুনলেও তিনি বুঝে নিতে চান ওটা এক সিলেবলে বলা সম্ভব ছিল কি না। বলেছিলেন যে, বক্তা অনেকসময়ে ভাবেন তার সব কথা যদি বুঝেই ফেলল সবাই তাহলে তিনি আর বিশিষ্ট কিসে? অনেক চেষ্টায় অনেক কষ্টে একটা জিনিস বুঝতে হয়েছে তাকে, অধিগত করতে হয়েছে, আর অন্যেরা সেটা বুঝতে পারছে না, ‘and then that becomes the basis for your privilege and your power’। আমরাও কি সেইদিকেই চলে যাচ্ছিলাম? কিংবা, যাচ্ছি আজও?

অনেকেই যে যাচ্ছি, তাতে সন্দেহ নেই। মনীষার নিয়মিত প্রকাশ থাকে, এই শহরেরই এমন একটি পত্রিকায় তার দু-একটি লেখা বুঝতে না পেরে যখন নিজের বােধবুদ্ধির সীমা ভেবে অবসন্ন হয়ে পড়ছি, তখন একদিন হঠাৎ তার ধীসম্পন্ন অভিজ্ঞ সম্পাদকের একটি মন্তব্য পাওয়া গেল। তিনি বিলাপ করছিলেন এই বলে যে সম্প্রতি এমন লেখাও তাকে ছাপতে হচ্ছে যার সবটা তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। তখন নিশ্চয় এই প্রশ্ন ওঠে, ওঠা উচিত, যে, তাঁর মতাে ধীমানও যদি বুঝতে না পারেন তাহলে সেটা পৌছচ্ছে কোথায় ? কোন্ দু-চারজনের বৃত্তে আবদ্ধ থেকে আবর্তিত হচ্ছে সেটা? এ-সমস্যাটা যে কেবল এই শহরের তা নয়, পৃথিবীজোড়া এই সমস্যা। চস্কির যে সংলাপের কথা একটু আগেই ছিল, বিশ্বগত এই দুর্লক্ষণটার কথা সেখানে তিনি তুলেছিলেন এইভাবে:

...it's not necessarily a criticism to say that something doesn't make sense: there are subjects that it's hard to talk sensibly about. But if I read, say, Russell, or analytic philosophy, or Wittgenstein and so on, I think I can come to understand what they're saying, and I can see why I think it's wrong, as I often do. But when I read, you know, Derrida, or Lacan, or Althusser,

It's like words passing in front of my eyes: I can't follow the arguments, I don't see the arguments, anything that looks like a description of a fact looks wrong to me. So may be I'm missing a gene or something, its possible. But my honest opinion is, I think it's all fraud. 


চমস্কির এই শেষ লাইনটির সঙ্গে আমরা অনেকেই নিশ্চয় একমত হব না, এমনকী তিনিও হয়তাে এতটা বলে বসেছেন কোনাে সাময়িক উত্তেজনাবশে।(১) কিন্তু এখান থেকে উঠে আসা এই প্রশ্নটা তবু জরুরি যে কীভাবে, কতটা সহজে, কোনাে ভাবনাকে আমরা পৌছে দিতে পারি শ্রোতার কাছে, বা পাঠকের কাছে।

এটা বুঝে নেওয়া খুব জরুরি যে আমরা কী চাই। আমরা-যে জানি, সেই খবরটাই কি জানাতে চাই? না কি আমরা যা বুঝি, সেই বােঝাটাকে বােঝাতে চাই? দ্বিতীয়টাই হবার কথা, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে অনেকসময়েই ঘটে ওঠে না সেটা।

০২.

আমাদের কৈশাের বা যৌবনে যেসব মাস্টারমশাইয়ের কাছে আমরা পড়েছি, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকেই মনে হয় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবার যােগ্য। তাদের মধ্যে বিশেষ একজনের কথা প্রায় প্রতিদিনই মনে পড়ে: তিনি গােপীনাথ ভট্টাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। চালচলনে কথায়বার্তায় ছিল স্থির একটা সমাহিত ভাব। ধীর পায়ে ক্লাসে এসে, নাম ডাকবার পর খাতাখানা বন্ধ করে, টেবিলের ওপর চক দিয়ে আলতাে করে লিখতেন দু-একটা কথা, লিখে মুছে দিতেন, তারপর তাকাতেন আমাদের দিকে, শুরু করতেন পড়ানো। মধ্যবর্তী ওই নিঃশব্দ সময়টায়, আমরা বুঝতে পারতাম, আত্মস্থ হয়ে নিচ্ছেন তিনি, নিজেকে অভিমুখী করে তুলছেন বিশেষ এই ক্লাসটির জন্য।

কেমন ছিল তার পড়াবার ধরণ ? খুব শান্ত আর নীচু গলায় কথা বলে যেতেন তিনি। সে-বলার মধ্যে কোনাে বাগ্মিতা থাকত না, কিন্তু একটা জোর থাকত, প্রবাহ থাকত, আর থাকত সরল একটা কথােপকথনের ভঙ্গি।

কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন একদিন। খাতায় নােট নিচ্ছিল যে ছেলেমেয়েরা, একটু অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকিয়েছিল তারা। অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাদের দিকে চোখ রেখে স্মিতভাবে বলেছিলেন তিনি: ‘তাহলে আমি কথা বলব কার সঙ্গে? বােঝাব কাকে যদি তােমাদের চোখ থাকে খাতায়? বুঝব কেমন করে যে কথাগুলি পৌছচ্ছে কোথাও? বিষয়টা তাে তােমাদের আমি বােঝাতেই চাইছি? বুঝে নাও যদি, মাথা ঝুঁকিয়ে নােট নেবার তাে আর দরকারই হয় না তবে।’

ছেলেমেয়েরা কতটা মানত তার এই নির্দেশ, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু ওই-যে তিনি সকলের চোখে চোখে তাকিয়ে কথা বলতে চাইতেন, তার মধ্যে ছিল একটা সহজ সংযােগের ব্যাকুলতা। শুকনাে ক্লাসপড়ানাে নয়। যেন সেটা, সে যেন কোনাে-একটা সঞ্চারের সময়। আর এই সঞ্চারটা তিনি ঘটাতে চাইতেন একটা মৃদুতার মধ্য দিয়ে, একটা নিরুত্তেজ শান্ত স্বরের মধ্য দিয়ে। কথা বলবার মতাে করে।

এখানে ওই মাত্রাবােধের সূত্রে। ‘তাঁর শাস্তি, তাঁর সত্য, তাঁর পবিত্র মূর্তিখানি নিয়ে সেই মাস্টারমশাই তার ছাত্রের জীবনের মাঝখানটিতে তার নিজের জীবনের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যিনি না ভয় করেন নিন্দাকে, না ক্ষতিকে, না মৃত্যুকে’, যিনি তাঁর ‘অন্তর্যামীকে দেখতে পেয়েছেন, সেইজন্যে আর কিছুতে ওঁকে ভােলাতে পারে না’, ঘরে-বাইরে উপন্যাসের সেই চন্দ্রনাথবাবু তার স্বাভাবিক স্থৈর্যের সঞ্চার করে দিয়েছিলেন ছাত্র নিখিলেশের দৈনন্দিনে। চন্দ্রনাথবাবু ছিলেন, তাই আমি কল্যাণকে এমন সত্য করে এমন প্রত্যক্ষ করে পেয়েছি’ বলেছিল নিখিলেশ। শান্তিনিকেতন-ভাষণের ওই ‘একটু চুপ করাে, একটু স্থির হও’ কথাকটিই যেন বারে বারে রূপায়িত হতে থাকে চন্দ্রনাথবাবুরও কথায় বা নিখিলেশের আচরণে। স্বদেশী আন্দোলনের উত্তেজনার। পক্ষে যখন চড়া ভাষায় সওয়াল করে সন্দীপ, তখন চন্দ্রনাথবাবু একটু হেসে বলেন: ছটফট করতে চান করুন, কিন্তু সেইটেকেই বীরত্ব কিংবা কৃতিত্ব মনে করে নিজেকে বাহবা দেবেন না। পৃথিবীতে যে জাত আপনার জাতকে বাঁচিয়েছে তারা ছটফট করে নি, তার কাজ। করেছে।

এতটা যে তাকে মনে পড়ে সে কেবল এজন্য নয় যে পঠিতব্য বিষয়টাকে খুব ভালােমতাে বােঝাতে পারতেন তিনি। মনে পড়ে এইজন্য যে তার ওই ব্যক্তিত্বের মধ্যে, ব্যক্তিত্বপ্রকাশের প্রকরণের মধ্যে, শান্ত স্থির একটা প্রত্যয়ের বিচ্ছুরণ হতাে। বলা যায়, তার ভিতরকার প্রত্যয়টাই সে-প্রত্যয়ের শক্তিটাই এতটা শান্ত রাখতে পারত তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন ভাষণমালার এক জায়গায় আছে:“আমরা সমস্ত দিন কতরকম করে যে শক্তির অপব্যয় করে চলি তার ঠিকানা নেই— কত বাজে কথায়, কত বাজে কাজে। নিষ্ঠা হঠাৎ স্মরণ করিয়ে দেয়, এই যে-জিনিসটা এমন করে ফেলাছড়া করছ এটার যে খুব প্রয়ােজন আছে। একটু চুপ করাে, একটু স্থির হও, অত বাড়িয়ে বলাে না, অমন মাত্রা ছাড়িয়ে চলাে না।” সেখানে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ: ‘সিদ্ধিলাভের কাছাকাছি গেলে প্রেমের সহজ প্রাজ্ঞতা লাভ হয়, তখন মাত্রাবােধ আপনি ঘটে।’ আমাদের ওই মাস্টারমশাইয়ের কাছে সবচেয়ে বড়াে শিক্ষণীয় যা ছিল, তা এই মাত্রাবােধ। স্বরের, বাচনের, এবং নীরবতার মাত্রা।

জীবন থেকে নেওয়া নয়, সাহিত্য থেকে নেওয়া ভিন্ন আরেক মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে দেশবােধের বা দেশের কাজের এই ভিন্ন দুটো পথের প্রতিস্পর্ধিতা নিয়ে ঘরে-বাইরে উপন্যাস: এই ছটফট করা আর কাজ করা। বা, বলা যায়, ছটফট করে কাজ করা আর স্থিরভাবে কাজ করা। সন্দীপ আর নিখিলেশ। আপাতশক্তি আর নিহিতশক্তি। আপাতশক্তির আস্ফালনে সন্দীপ দ্রুত একটা সংযােগ তৈরি করতে পারবে বলে ভাবে, প্রভাবিত করতে পারবে, সে-প্রভাবের দ্রুত ফল দেখতে পাবে। আর নিহিতশক্তির সঞ্চারে নিখিলেশ চায় কিছু গড়ে তুলতে, যদিও সে জানে যে এ-সংযােগের কোনাে ফল হাতেহাতে মেলে না, এর জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয় অনেকদিন পর্যন্ত।

এই অপেক্ষা করে থাকাকে কারাে মনে হতে পারে সংকল্পের অভাব বা পৌরুষের অভাব নিখিলেশের হালচাল দেখে বিমলার যেমন মনে হয়েছিল। মনে হতে পারে যে বার্তাটা কোথাও পৌছচ্ছে না, কারাে সঙ্গেই সংযােগ ঘটছে না কোথাও। রেগেমেগে হঠাৎ কিছু করায় যে সংকোচ বোধ করে নিখিলেশ, স্বভাবের সেই মৃদুতাকে অশ্রদ্ধা করতে শিখছে বিমলা। এ-মৃদুতাই যে এনে দেয় ভিতরকার জোর, আর তাও যে কোথাও সঞ্চারিত হতে পারে, বিমলার মতাে আমাদেরও অনেকসময়ে সেটা বিশ্বাস করতে বাধে।

কিন্তু এই মৃদুতা মানে কি সবকিছুকে নির্বিচারে মেনে নেওয়া ? তর্ক থেকে, যুক্তি থেকে, পিছিয়ে আসা? শান্ত ভঙ্গি নিয়েও ঘরে-বাইরে উপন্যাসে একাধিকবার আমরা তর্কে রত দেখেছি নিখিলেশকে, দেখেছি মৃদুতার সঙ্গে তেজের সংযােগ। আগে বিমলা কোনােদিন তার স্বামীকে বাইরের লােকের সঙ্গে তর্ক করতে শােনেনি, সন্দীপের সঙ্গে তার একদিনকার বাগবিনিময় শুনে মনে হলাে ‘আজ দেখলুম তার অস্ত্রচালনা’। অথচ, এর কয়েকটা মাত্র লাইন পরেই আছে: ‘আমার স্বামীর অন্তরের একটি গভীর বেদনা তার মুখের ওপর ছায়া ফেলে চলে গেল। তিনি খুব মৃদু স্বরে বললেন...' ইত্যাদি। বিমলা দেখতে পায়, আর সেইসঙ্গে আমরাও, যে, অস্ত্ৰচালনা আর মৃদুস্বর হাত-ধরাধরি করে চলতে পারে কীভাবে।

আমাদের যে মাস্টারমশাইয়ের কথা বলছিলাম, যাঁর শান্ত আত্মস্থ প্রত্যয় একটা আভা ছড়িয়ে দিত আমাদের মনে, তিনিও কিন্তু তর্ক করতেই শিখিয়েছিলেন তার ছাত্রছাত্রীদের। ক্লাসের মধ্যে কোনাে তর্কণীয় বিষয়ের উত্থাপন করে তিনি চাইতেন সমানে সমানে একটা কথা হােক। ব্যক্তিত্বের নমনীয়তা আর যুক্তির দৃঢ়তা একসঙ্গেই জড়ানাে থাকত তাতে। তিনি শিক্ষক, এই উচ্চপদবলে কখনাে তিনি মাঝপথে থামিয়ে দেননি ছাত্রকে, তর্ক এগিয়ে যেতে দিয়েছেন অবাধে, যাতে নিজেরই বিচারবােধের জাগরণে যথার্থ একটা লক্ষ্যে এসে পৌছতে পারে তার্কিক।

এই তর্কসৌন্দর্যের আরেক বিকাশ আমরা দেখেছি আবু সয়ীদ আইয়ুবের লেখায়, কিংবা তার সঙ্গে নানাজনের ব্যক্তিগত আলাপনে। কথায় বা লেখায় স্বরগ্রাম কখনাে উঁচু হতাে না তাঁর, বিপরীত পথকে বুঝতে চাইতেন এবং বােঝাতে চাইতেন প্রসারিত এক স্থৈর্য নিয়ে, লাবণ্যময় দৃঢ়তায় ভরপুর থাকত তার কথা। প্রকাশ্য একটি বিতর্কের প্রসঙ্গে একপক্ষ যখন একবার চিঠিতে তাকে জানিয়েছিল কোনাে-এক, সাধারণ পাঠকের এই মন্তব্য যে দুজনের ওই তর্কে আইয়ুবই জিতেছেন, তার উত্তরে আইয়ুব লিখেছিলেন একটা স্মরণীয় কথা: ‘আমাদের লেখাগুলিকে যাঁরা তর্কের হারজিতের খেলারূপে দেখেছেন তারা ভুল করেছেন; তাদের কথা গণ্য করবার মতাে নয়।’

কেন লিখেছিলেন কথাটা? কেননা যথার্থ তর্ক যাঁরা করেন তারা তাে কোনাে-একটা বিষয়ের সত্যকে বুঝতে চান, বােঝাতে চান। সত্যানুসন্ধানটাই সেখানে বড়াে কথা। আর, দুজনে মিলে কথা বলতে বলতেই পৌছনো যায় - পৌছনাের চেষ্টা করা যায় সেই সত্যে। সে-সত্যে পৌছলে তার্কিকদের মধ্যে কোনাে এক পক্ষ যে জিতে যায় তা নয়, জিতে যায় শুধু সত্য, সত্যের বােধ। তা যদি না ভাবি, তাহলে, তখন, বিষয়ের চেয়ে বিষয়ী হয়ে ওঠে বড়াে, সত্যের চেয়ে বড়াে হয়ে ওঠে অহং। আমিকে রেখেও কীভাবে সেই আমিটিকে মুছে নিতে হয়, তার কিছু নজির আমরা দেখেছিলাম গােপীনাথবাবুর অধ্যাপনায়, আইয়ুবের বিচারণায়, চন্দ্রনাথবাবুর দীক্ষাদানে, নিখিলেশের আচরণে। অন্যদের কাছে এঁরা যা প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করেছেন, অন্যদের যা বােঝাতে চেয়েছেন, তা এঁদের আমিটাকে নয়, এঁদের অনুভূত সামগ্রিক এক সত্যকে। আমি দিয়ে প্রকাশের আর আমিকে মুছে নিয়ে প্রকাশের এই দুই ভঙ্গিতে বােধেরও ঘটে যায় অনেকখানি প্রভেদ।

০৩.

অনেকদিন আগে একজন চিকিৎসক এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে, রােগী দেখবার জন্য। প্রাথমিক পরীক্ষা করে নেবার পর যখন তিনি বিধান লিখতে যাবেন, তখন বললেন আমাকে: ‘এই ওষুধটা দিয়ে দুদিন। আমরা দেখব। এতে যদি ফল না হয় তাহলে আমাদের আরেকম করে ভাবতে হবে। তার কথা শুনে অবাক হচ্ছিলাম। চিকিৎসা তাে করবেন উনি, তাহলে আমরা দেখব’ ‘আমাদের ভাবতে হবে’ এভাবে কেন বলছেন? বলার তাে কথা আমি দেখব’ ‘আমাকে অন্যরকম ভাবতে হবে’? সেটাই তাে হতাে সত্য কথা? সত্যি হতাে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও ঠিক যে ওই একটিমাত্র সত্যিকে মিথ্যে করে দিয়ে, ওই একটিমাত্র শব্দবদলে, ‘আমি’র থেকে ‘আমরায় পৌছে দিয়ে, ডাক্তারবাবু তার রােগীটির সঙ্গে সঙ্গে রােগীর পরিজনদেরও অনেকখানি শুশ্রুষা করে নিলেন। সেই মুহূর্তে আশ্বস্ত মন বলছিল, উনি আমাদের পারিবারিক লােক, আপনজন। রােগীর এই সমস্যাটাকে কেবল ওঁর জীবিকার দিক থেকে দেখছেন না, দেখছেন ব্যক্তিগতভাবে।

একটু আগে বললাম সত্যিকে মিথ্যে করে দিয়ে। কিন্তু মিথ্যেই কি ওটা? এটা নিশ্চয় শুধু পদ্ধতি হিসেবেই নয়, সত্য করেই তুলতে চেয়েছিলেন সেই ডাক্তারবাবু। অন্তত পরবর্তী কিছুদিনের আনাগােনায় আর। উদ্‌বেগকাতরতায়, নিরাময়ের পর তাঁর অনাবিল আনন্দপ্রকাশে, সত্যই হয়ে উঠেছিল সেটা। একটামাত্র ওই শব্দব্যবহারের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমাদের পারস্পরিক ধারাবাহিক এক সখ্য।

‘আমি’কে ‘আমরা’ করে তােলার ভিন্ন একটা বিবরণ পড়েছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখায়। কমলকুমার মজুমদার একটি উপন্যাস লিখছেন কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য, অল্পে অল্পে এগােচ্ছে সেটা, তাড়া দিচ্ছেন সুনীল। সেইরকম একটা সময়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মােড়ে দাঁড়িয়ে কমলকুমার বলছেন: “শােনাে, এই-যে আমরা উপন্যাসটা লিখছি—', বাধা দিয়ে সুনীল বলেন: ‘আমরা বলছেন কেন কমলদা, লিখছেন তাে আপনি! কমলকুমার বললেন: “আঃ, থামাে তাে, আমি তাে লিখছি না, ঠাকুর আমাকে দিয়ে লেখাচ্ছেন মাত্র। সেটা আমি না হয়ে তুমিও হতে পারতে, বা অন্য কেউ। আমরা সবাই মিলেই লিখছি।”

এই বলার মধ্যে যে নিছক একটা বিনয় আছে তা নয়, আছে একটা বিশ্বাস। বিশ্বাসটা এই যে, আমার আমিটা খুব বড় কথা নয়, ওটা একটা উপলক্ষ মাত্র। চারদিকের অভিজ্ঞতা একইসঙ্গে নানা ব্যক্তির মধ্যে সঞ্চিত হচ্ছে, কিন্তু তার প্রকাশ হচ্ছে হয়তাে-বা একজন-দুজনের মধ্য দিয়ে। সেই প্রকাশের মুহূর্তে কেউ কখনাে জোর দিয়েই বলতে পারেন যে এটা ‘আমি’ বলছি, বললে ভুল হয় না। আবার সেইটেকেই কেউ বলতে পারেন আমরা বলছি, আমরা ভাবছি। কমলকুমার একেবারে নিজের উপন্যাস লেখার প্রসঙ্গে ওই বহুবচনটির ব্যবহার কয়েছেন বলে স্বভাবতই চমক লেগেছিল সুনীলের, কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে আমাদের লেখায় বা বলায় ও-রকম প্রয়ােগ তাে হামেশাই ঘটে। ঘটে না কি? ধরা যাক অমিয় চক্রবর্তীর পালাবদল বইটির আলােচনায় বুদ্ধদেব বসু যখন লেখেন:

....এর রাত্রি’ কবিতার হঠাৎ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোত্সা,/ দেখি তুমি নেই’—আমাদের মনে
পড়িয়ে দেয় “লিপিকা’র ‘পরির পরিচয়'.. 


তখন নিশ্চয় সেটা একক বুদ্ধদেব বসুরই মনে পড়া, এটা বলা যায় না যে অনিবার্যভাবে সব পাঠকেরই ওখানে লিপিকার কথা মনে পড়বে। কিংবা,

তিনটি যাত্রার কবিতা অক্ষয়ভাবে মুদ্রিত আছে আমাদের মনে: বােদলেয়রের ভ্রমণ’, রাবাের মাতাল তরণী', ও রবীন্দ্রনাথের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’... 

বা, এইরকম আরাে আরাে অনেক উত্তমপুরুষ বহুবচনের ব্যবহারে বােঝা যায় যে ওটা লেখকের নিজস্ব বক্তব্য, নিজস্ব বিবেচনা, একেবারেই তার। বড়াে জোর তিনি চাইছেন যে, এটা সকলের হয়ে উঠুক। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে উদ্ধৃত ওই বাক্যগুলির বহুবচনকে একবচন করে দিলে কথাটা একই থাকে, শুধু মেজাজটা যায় পালটে। এই ধরনটি তার পরবর্তী রচনার মধ্যে যদি ফিরে আসতে থাকে তাহলে আমরা বলতে পারবাে যে বাংলা কবিতার জন্য নতুন একটি প্রদেশ তিনি জয় করলেন’- এই কথাটার ‘আমরা’কে যদি ‘আমি’ করে দেওয়া যায়, সেই আমি-টা তবে বড়াে প্রত্যক্ষ হয়ে বড়াে স্পর্ধিতভাবে ধাক্কা দিতে পারে কোনাে শ্রোতাকে বা পাঠককে, আমরা বলে তাই হয়তাে একটু নরম করে নিতে চাই তাকে।

অবশ্য, এমন ‘আমরা’র ব্যবহারও সম্ভব, যেখানে ‘আমি’টাই নেই। আমি’র বাইরে অন্য সবকিছু নিয়ে, বা প্রতিপক্ষ নিয়ে, আমরা চেকোস্লোভাকিয়ার কবি মিরােস্লাভ হােলুবের কবিতার প্রশস্তি করতে গিয়ে যদি কেউ লেখেন যে এ-কবিতা পাঠকদের ধাক্কা দেবে, কেননা: আমাদের কুসংস্কারগুলিকে আমরা বড়াে বেশি ভালােবাসি, সেগুলি কেউ ভাঙতে এলে সেই পরিত্রাতাকেই কুৎসিত ভাষায় গাল পাড়ি আমরা, অন্ধকার হতে জ্যোতিতে উত্তীর্ণ হতে আদৌ আমাদের আগ্রহ নেই’, তখন বুঝতে পারি যে এই ‘আমরা’র মধ্যে বক্তার ‘আমি’টি নেই, কেননা তিনি তাে আর কুৎসিত ভাষায় পরিত্রাতাকে গাল দিতে চাইছেন না, প্রশস্তি করতেই তাে চাইছেন তিনি। কিংবা, সমর সেন বিষয়ে শ্রদ্ধা জানাতে কেউ যদি লেখেন যে ‘তার কথা ভেবে আমাদের আর লাভ কী, আমরা কলেজে-কি-অফিসে যাবাে, পান চিবােবাে, একে ওকে খােশামােদ করে বাড়তি দু-পয়সার ব্যবস্থা করবাে, আখেরে সুবিধে হলে দু-তিনটে শৌখিন বক্তৃতা দেবাে, রাত্রিতে আমাদের ঘুম খুব নিটোল হবে, পড়ে মরুক গে সমর সেন’ তখন, স্বভাবতই এই হীন আমরা-গুলির মধ্যে আমি নেই, কেননা সে-আমিই তাে সমর সেনের কথা এত করে বলছেন।

ফিরে যাই আবার পুরােনাে কথায়। ‘আমি’কে ‘আমরা’য় পালটে নেবার কথা বলছিলাম আগে। এমনও কখনাে হতে পারে যে ‘আমরা’ই পালটে গেল ‘আমি’তে। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়ের একটি বইয়ের নাম অনেকেরই মনে পড়বে: আমরা ও তাঁহারা। গােটা বইটি দুইপক্ষের সংলাপ দিয়ে সাজানাে। একপক্ষে তাহারা। আর অন্যপক্ষে? যে-বইয়ের নামের মধ্যে আছে ‘আমরা’, সে-বইয়ের পাঠের মধ্যে কিন্তু সবসময়েই ‘আমি’। ভূমিকায় ধূর্জটিপ্রসাদ বলে নিয়েছেন: ‘আমরা ও তাঁহারা-তে একদিকের বক্তা আমি, অন্যদিকের বক্তা তাহারা। নামে তাহলে আমরা কেন? লেখকের কৈফিয়ত: ‘নিজের মধ্যে তথাকথিত উচ্চশিক্ষিতের দোষগুলাে লক্ষ্য করেছি বলেই একবচন ব্যবহার করেছি। অর্থাৎ আমি এখানে আমরা-র প্রতিভূ।

সবসময়ে সেটা হয়ে উঠতে পেরেছে কি না, সে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। আমার মুখ দিয়ে ব্যক্ত মতামতগুলাে ঠিক আমার নয়, আমার দলের’ একথাটা তিনি মনে রাখতে বলেন পাঠকদের, কিন্তু সেই দল’ অর্থাৎ তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত’দের সাধারণ গােত্র থেকে সরে এসে একেবারে ব্যক্তিগত ধূর্জটিপ্রসাদ হিসেবেই কথাগুলি তিনি উচ্চারণ করেন অনেকসময়ে। সে-প্রসঙ্গটা আপাতত বিবেচ্য নয়। আপাতত যেটা বলতে চাই তা এই যে, ধূর্জটিপ্রসাদের অভীষ্ট আমরা এখানে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডি তৈরি করে নিচ্ছে। শহুরে উচ্চশিক্ষিতের গণ্ডি। অন্যদিকে আছেন কারা? সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষ আবার নির্বাচিত। কেননা, ঘােষণা করেই বলেন ধূর্জটিপ্রসাদ: উচ্চশিক্ষিত এবং মুখের সঙ্গে কোন প্রকার কথােপকথন কি ভাবের বিনিময় সম্ভব নয়। সেইজন্যে শিক্ষাভিমানী বুদ্ধিজীবীকে এবং শহরের অন্য শ্রেণীর বন্ধুদেরকে প্রতীক হিসেবে নিতে হয়েছে। এই তাহারা-র প্রকল্পে তাহলে গ্রামীণ মানুষ নেই, মূখ মানুষ নেই, অন্ত্যজ মানুষ নেই।

সেটা তত বিস্ময়ের কথা নয়। বিস্ময়ের কথা এই ঘােষণা যে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে কোনাে ভাবের বিনিময় বা কোনাে কথােপকথনই সম্ভব নয় বলে ভাবছেন একজন সমাজতত্ত্ববিদ। তাহলে নির্দিষ্ট এই ‘আমরা’ ও ‘তাহারা’-র বাইরেও যে বিরাট একটা ওরা-র অস্তিত্ব আছে, তাদের সঙ্গে আমাদের সংযােগ হবে কোথায় ? বা, কীভাবে হবে সেটা?

আমরা যেখানে সত্যিই আমরা, আমরা যেখানে আমি, আমরা যেখানে আমিটাই নেই, আমিই যেখানে। আমরা, আর আমরা যেখানে বৃত্তায়িত একটা গােষ্ঠী এই নানারকমের প্রয়ােগের কথা যে ভাবছি, তার সঙ্গে আমাদের জনসংযােগ বা সংযােগহীনতার একটা সম্পর্ক আছে। ধূর্জটিপ্রসাদ ‘আমরা’ শব্দে যে-শ্রেণীটির কল্পনা করে নিয়েছেন, সে হলাে একরকমের বিভাজন। নানাসময়ে নানাপ্রসঙ্গে, এই বিভাজনটাকে আমরা ভিন্ন নানা জায়গায় পৌছে দিতে পারি। আমরা বিদ্বান ওরা অবিদ্বান, আমরা শহুরে ওরা গেঁয়াে, আমরা শাদা ওরা কালাে, আমরা মুসলমান ওরা হিন্দু, আমরা মেয়ে ওরা পুরুষ, আমরা সি পি এম ওরা কংগ্রেস এবং এ-রকম আরাে আরাে অনেক। কোনাে কোনাে বিবরণের জন্য এ-রকম বিভাজন দেখানাের দরকার হয়ে পড়ে। কিন্তু যেসব সময়ে এই সমস্তটাকে জড়িয়ে নিয়ে ভাবনা করবার কথা, তখন ‘আমরা’ শব্দের এমন বিভাজিত প্রয়ােগ হয়তাে স্থায়ী কোনাে সংকট তৈরি করে তুলতে পারে, আমাদের বােঝায় অনেক ভুল ঘটে যেতে পারে। ধরা যাক, কোনাে সরকার যখন আমরা উচ্চারণে কোনাে কথা বলেন, তখন সে-আমরা থেকে বিরােধী কোনাে রাজনৈতিক পক্ষ বর্জিত থাকতে পারে বটে, কিন্তু তার অন্তর্গত করে নেবার কথা দেশের সমস্ত সাধারণ মানুষকে। অর্থাৎ, বক্তাকে বুঝতে হবে যে তার সেই ‘আমরা’র পরিসর যত ছােটো হয়ে আসবে, তার দেশও হয়ে উঠবে ততটাই খণ্ডিত। কথাটা এ নয় যে ‘ওদের’ ‘আমরা’ করে তুলতে হবে, বরং এই হবার কথা ছিল যে ওরা আমরাই’। সেটা লক্ষ না করে, আমরাওরার যে বিভাজনটা দূর করবারই দায়িত্ব ছিল আমাদের, একটা শব্দব্যবহারের মধ্য দিয়ে সেটাকে হয়তাে-বা বাড়িয়েই চলেছি আমরা।

বলা যায়, শব্দব্যবহারটা স্বতন্ত্র কোনাে সমস্যা নয়। শব্দব্যবহার মানসিকতারই বাইরের একটা প্রকাশ মাত্র। ঠিক। কিন্তু এও ঠিক যে মানসিকতা থেকে জাত শব্দটাই আবার সেই মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে থাকে। গণ্ডিবদ্ধ ‘আমরা বলতে বলতে আরাে বেশি করে একটা দলীয় ‘আমরা’র গণ্ডির মধ্যে ঢুকে পড়তে চায় মন, আত্মবিস্মৃত মন।

আর, বাচনের এই ‘আমরা’ যদি কখনাে হয়ে ওঠে ‘আমি’? প্রভুত্বের ওজনটা তখন আরাে বেশি সামনে চলে আসে, আমাদের পেয়ে বসে। যে-কোনাে একটা জায়গায় অল্পবিস্তর স্তরবিন্যাস থাকেই কর্মীদের মধ্যে। সেখানে প্রধান দায়িত্বে যিনি থাকেন, তিনি যদি কেবলই বলতে শুরু করেন ‘আমার বিভাগ’ ‘আমার কর্মী ‘আমার লক্ষ্য', তাহলে তার মধ্য দিয়েই একটা বিপদের সূত্রপাত হয়। আমাদের যে ডাক্তারবাবুর কথা বলছিলাম আগে, তিনি একার করা কাজটা নিয়েই বলতেন ‘আমাদের কাজ’। আর আমরা অনেকসময়েই সকলের করা কাজটাকে বলতে শুরু করি আমার কাজ। ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত এই ‘আমি’ তখন হয়ে ওঠে এক ঘােষণা-শব্দ, চিৎকারশব্দ, যার মধ্য দিয়ে এগােতে থাকে অবারণ একটা জোর দিয়ে বলবার প্রতাপভঙ্গি। আর সেই চোরাপথে এগিয়ে আসে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ আমাদের স্বভাবের একটা অনিয়ন্ত্রিত চিৎকার।

০৪.

একশাে চব্বিশ বছর আগে ভারতী পত্রিকায় একটি লেখা ছাপা হয়েছিল, তার নাম ‘চেঁচিয়ে বলা’। সেলেখায় যে-সাধুভাষার ব্যবহার ছিল, তাকে চলিতের রূপে পালটে নিলে, মনে হতে পারে যেন একেবারে আজকের এই সময়টা নিয়ে, এর সমস্যাটা নিয়ে, কথা বলতে চাইছেন কেউ। সে-লেখার ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে বেশকয়েকটি লাইন এখানে একবার শুনে নেব আমরা:

১. আজকাল সকলেই সকল বিষয়েই চেঁচিয়ে কথা কয়। আস্তে বলা একেবারে উঠিয়া গিয়াছে।...সেকরা গাড়ি যত না চলে, ততােধিক শব্দ করে; তাহার চাকা ঝনঝন করে, তাহার জানলা ঝরঝর করে, তাহার গাড়ােয়ান গাল পাড়িতে থাকে, তাহার চাবুকের শব্দে অস্থির হইতে হয়। বঙ্গসমাজও আজকাল সেই চালে চলিতেছে, তাহার প্রত্যেক ইঞ্চি হইতে শব্দ বাহির হইতেছে।

২. কানটাই আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হইয়াছে। দেখােনা, বাংলা খবরের কাগজগুলি কেবল শব্দের। প্রভাবেই পাঠকদের কান দখল করিয়া বসিয়া আছে। কী যে বলিতেছে তাহা বড়াে একটা ভাবিয়া দেখে না, কেবল গলা খাটো না হইলেই হইল। একটা কথা উঠিলে হয়, অমনি বাংলা খবরের কাগজে মহা চেঁচামেচি পড়িয়া যায়। কথাটা হয়তাে বােঝাই হয় নাই। ভালাে করিয়া শােনাই হয় নাই, হয়তাে সে বিষয়ে কিছু জানাই নাই কিন্তু আবশ্যক কী ? বিষয়টা যত কম বােঝা যায়, বােধ করি, ততই হাে হাে করিয়া চেঁচাইবার সুবিধা হয়। 


লেখাটা, হয়তাে না-বললেও চলে, রবীন্দ্রনাথের। লিখেছিলেন, যখন তার বাইশ বছর বয়স। ‘গলা খাটো না হইলেই হইল’— একথা অবশ্য এই সােয়াশাে বছরে ভিন্ন একটা মাত্রা পেয়ে গেছে, কেননা খবরের কাগজের বাইরে এখন আরাে আছে আকাশবাণী বা দূরদর্শন। সেখানে, আলংকারিক অর্থে নয়, বাস্তবতই গলা খাটো করবার একটা যেন প্রতিযােগিতাই চলে। সভাস্থলের বক্তৃতা বিষয়ে ‘চেঁচিয়ে বলা’ প্রবন্ধে একটা কথা আছে এইরকম: ‘বক্তা যখন বক্তৃতা দিতে উঠেন, তখন সে এক অতি কষ্টকর দৃশ্য উপস্থিত হয়। গ্রহণী রােগীর ন্যায় তাহার হাতে পায়ে আক্ষেপ ধরিতে থাকে, গলার শির। ফুলিয়া ওঠে, চোখ দুটো বাহির হইয়া আসিতে চায়। কেবল সভাস্থলে নয়, এ-রকম দৃশ্য অনেকসময়েই আজকাল দেখতে হয় আমাদের, নানা জায়গাতেই।

দেখতে হয়, কেননা, শুধু এ-মাধ্যমে ও-মাধ্যমে নয়, দুরদর্শনের এ-খাতে ও-খাতেও ঘাের একটা প্রতিযােগিতা চলতে থাকে, স্কুপ বা এক্সক্লসিভ বা বাইটজাতীয় নেশার তাড়নায় উত্তেজনার ঝোঁকটা বেড়ে যায়, খবরদেনেওয়ালারা অথবা তার্কিকেরা ভাবতে থাকেন যে স্বরগ্রাম উঁচু থেকে উঁচুতে তুলতে পারলেই সত্য আরাে বেশি করে জোর পাবে। কথাটা যাঁরা শুনছেন তাদের বােধ বা বিবেচনার উপর কোনাে আস্থা থাকে না বলেই এমনটা ঘটে, না কি বক্তা নিজের কথার উপর ততটা ভরসা রাখতে পারেন না বলেই এটা করেন? হয়তাে দুটোই সত্যি। প্রাণের সঙ্গে যখন কোনাে কথা বলি, তখন যাহা বলি তাহারই একটা বল থাকে— যখন প্রাণে বাজে নাই অথচ মুখে বলিতে হইবে, তখন চেঁচাইয়া বলিতে হয়, বিস্তর বলিতে হয়। লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

চেঁচিয়ে বলার সঙ্গে এখানে যুক্ত হলাে তবে বাড়িয়ে বলা, অত্যুক্তি। আর সেই বাড়িয়ে বলা সহজেই পৌছে যায় বানিয়ে বলায়, মিথ্যাচারে। বুঝিয়ে বলার চেয়ে বক্তার তখন দরকার হয় ঘাের লাগানাে, নেশা ধরানাে, হিনটিজম। এই তাে ‘হিপনটিজম’ বলেছিল সন্দীপ। এই শক্তিই পৃথিবী জয় করবার শক্তি। কোনাে উপায় নয়, উপকরণ নয়, এই সম্মােহন। কে বলে সত্যমেব জয়তে? জয় হবে মােহের। বলেছিল সে। অত্যুক্তি সইতে পারত না নিখিলেশ, আর সন্দীপের অস্ত্রই হলাে অত্যুক্তি। তাই সন্দীপের প্রসঙ্গ এলেই উপন্যাসে আমাদের শুনতে হয় ‘ঝড়ের দমকা হাওয়া’র কথা, বজ্রের উপর বজ্রের গর্জন, বিদ্যুতের উপর বিদ্যুতের চমকানি’র কথা। তার দলবলের চিৎকারে ‘আকাশটা যেন ফেটে টুকরাে টুকরাে হয়ে ছিড়ে পড়ে, তার স্বপ্ন জনসমুদ্রের ঢেউয়ের উপর’ দুলতে থাকা, যার চারিদিকে গর্জন আর ফেনা। তর্কের জোর বােঝাতে মেঝের উপর লাথি মারে সে, কার্পেট থেকে অনেকখানি নিদ্রিত ধুলাে চম্‌কে উপরে উঠে পড়ে। ভিতরকার শক্তিতে যত দীনতা, বাইরে ততটাই বেড়ে ওঠে আস্ফালন, তাই এত ঠুকতে হয়, এত শব্দ করতে হয়। সত্যকে সে চায় না, সত্যকে সে বানিয়ে তােলে।

বানিয়ে তােলার এই আস্ফালনে এই চিৎকারে চারপাশে গড়ে তােলা যায় নেশায়-পাওয়া দল, যেখানে আত্মব্যক্তিত্বের কোনাে দরকার হয় না আর, দরকার হয় না নিজের প্রতি বা সত্যের প্রতি কোনাে বিশ্বাসের বা অভিমুখিতার। তখন যে-সংযােগ ঘটে, সেটা কোনাে বােধের সঙ্গে বােধের নয়, যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের। সে-রকম সংযােগের— না কি অসংযােগের কথা ভেবেই চার অধ্যায়-এর উত্তপ্ত অন্তু বলেছিল দিশেহারা এলাকে: ‘আপন শক্তির পরে বিশ্বাসকে গােড়াতেই এমনি করে ঘুচিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সবাই সরকারি পুতুলের ছাঁচে নিজেকে ঢালাই করতে দিতে স্পর্ধা করেই রাজি হল।’ শুধু চার অধ্যায় বা ঘরে-বাইরের ঘটনাকালে নয়, যে-কোনাে রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনের বড়াে বড়াে মুহূর্তে এই কথাগুলির সত্যতা আমরা বারে বারেই দেখতে পাই। দেখতে পাই যে, পারস্পরিক সংযােগের কোনাে সুঠাম পথে আমাদের সন্ধান থাকে কম, দ্রুত সিদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ব্যক্তির বা দলীয়তার জোর খাটানােটাই হয়ে ওঠে বড়াে। জোর যে শুধু আস্ফালনে নয়, নেশাটাই যে ফলপ্রদ শক্তি নয়, সত্যের সঙ্গে খাটে না কোনাে জোর-জবরদস্তি,-- নিখিলেশের মতাে সেইসব আত্মস্থ বিশ্বাসে আর ভরসা রাখতে পারি না আমরা।

বলছি না যে এ কেবল আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক সমস্যা। ঘরে-বাইরে যেমন একইসঙ্গে রাজনৈতিক আর গৃহনৈতিক, আমাদের সমস্ত সমস্যাই প্রায় সেইরকম, একাধিক তলে একইসঙ্গে তার চলাচল। ঘরে কিংবা বাইরে, কাজে কিংবা খেলায়, একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্ক রচনায় এই প্রভুত্ব বা জোরটাই আমাদের চালাতে থাকে পদে পদে, সংযােগের অর্থ তখন দাঁড়ায় শুধু প্রচ্ছন্ন সংযােগহীনতা। হাতের থেকে একটু দূরেই থেকে যায় হাত। মাঝখানে জেগে থাকে শুধু আস্ফালনের কথা, অহংগণ্ডির কথা, মহানগরের ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে-থাকা অলস উৎক্ষিপ্ত নিষ্ফল বিবর্ণ কিছু কথা। মনে পড়ে, আর্তুরাে উই’তে ব্রেখট্‌ একবার লিখেছিলেন: ‘কথা বলবার বদলে যদি শুধু একটু কাজ করতে পারতাম আমরা!’

০৫.

ঘরে-বাইরের নিখিলেশ তর্ক করেছে অনেকসময়ে, সন্দীপের সঙ্গে বিমলার সঙ্গে, কিন্তু অনেক অনেক বলবার-মতাে মুহূর্তে সে বলেওনি কোনাে কথা। আস্তে আস্তে তার উঠে চলে যাওয়ার কিংবা আস্তে আস্তে অল্প কয়েকটা কথা বলার ছবি ধরা আছে বিমলার মনে। একবার যেমন: মনে হল আমার স্বামীর কিছু বলবার আছে, কিন্তু তিনি বললেন না, আস্তে আস্তে চলে গেলেন। এই চলে-যাওয়াও কিছু বলে না কি? দীর্ঘ তপ্ত বাগ্মিতায় সন্দীপ যখন দেশের মেয়েদের অন্যায় শক্তির স্তুতি করছে, আবেগভরে কবিতা শােনাচ্ছে, গর্জে উঠে বলছে আমাদের সকলকে নষ্ট হবার দুর্জয় তেজ দাও', নিখিলেশ তখন তার গায়ে হাত রেখে আস্তে আস্তে বলছে: সন্দীপ, চন্দ্রনাথবাবু এসেছেন। সবকিছুর ওপর নম্রতার একটা প্রলেপ এসে পড়ল।

এই ধীরতার কোনাে সুদূর ফলও কি নেই? এত-যে উদ্ভ্রান্ত অবুঝ বিমলা, সেও কিন্তু কখনাে শরীরের নীরব ভাষায় দেখতে পায়: ‘আমার স্বামীর অন্তরের একটি গভীর বেদনা তার মুখের উপর ছায়া ফেলে চলে গেল।’ শব্দহীনতা কিছুই যে তাকে বলেনি তা নয়। সে দেখতে পায় কীভাবে সমস্ত উত্তেজনার মধ্যে নিখিলেশকে যেন একটা বিষাদ এসে আঘাত করত। যেটা সামনে দেখা যাচ্ছে তার উপর দিয়েও তিনি যেন আর একটা-কিছুকে দেখতে পেতেন।’

একাধিকবার এ-উপন্যাসে বলা আছে যে নিখিল চুপ করে রইল। নীরবতারও একটা ভাষা আছে। সে-ভাষা পড়তে অনেকসময়ে ভুলে যাই আমরা। শুধু যে পড়তে ভুলি তা নয়, তার ব্যবহারও হয়তাে ভুলে যাই জীবনে, ভুলে যাই যে অনেকসময়ে নীরবতা একটা সামর্থ্য। ভাষার সংযােগের সঙ্গে নীরবতার সংযােগ মিলে গিয়ে যৌথভাবে গড়ে ওঠে একটা সংযােগের ভাষা। জীবনব্যবহারে সেই ভাষাটাকে বারেবারেই হারিয়ে ফেলি আমরা। আর তখনই বেড়ে ওঠে চিৎকার, তখনই বেড়ে ওঠে আমি, তখনই বেড়ে ওঠে পরস্পরের মধ্যে সেতুহীন এক দূরত্ব।

পশ্চিম জগতের একটা প্রথা আছে, সামান্যতম যে-কোনাে প্রাপ্তিতে বলতে হয় ‘ধন্যবাদ’, না-বলাটা সেখানে অপরাধ। অবশ্য এখন আর পশ্চিমজগতে’ বলবার মানে নেই, আমাদেরও এটা কৃত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই কথাটা কিন্তু এমনভাবেও উচ্চারণ করতে পারি আমরা করে থাকি অনেকসময়ে যাতে শব্দটা থাকে, ধন্যতাটা থাকে না কোথাও। উলটোপক্ষে, কোনাে শব্দের সাহায্য ছাড়াও, আমাদের সেই কৃতজ্ঞ মনােভাবটা প্রকাশ করতে পারি আমরা, আমাদের মুখের রেখায়, চোখের চাওয়ায়, আমাদের সামগ্রিক দৈহিক আভায়। রবীন্দ্রনাথের কণিকায় দুটি লাইন আছে এ-রকম:

দয়া বলে, কে গাে তুমি মুখে নাই কথা?
অশ্রুভরা আঁখি বলে, আমি কৃতজ্ঞতা। 


অশ্রুভরা আঁখিই কেবল নয়, শব্দহীন শরীর নানামুহূর্তে খুঁজে নেয় তার নানারকমের ভাষা। উচ্চারিত শব্দের বাইরেও তখন তৈরি হয়ে ওঠে ভিন্নরকম সংযােগের বােধ। আবার, শব্দের মধ্যে মেলানাে থাকতে পারে অনেক সেই অনুচ্চারণ।

‘কানটাই আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হইয়াছে’ এই আক্ষেপের কথাটা ছিল চেঁচিয়ে বলা’ প্রবন্ধে। আর, তার অনেকদিন পরে, এর একেবারে উলটোপ্রান্তে, ফাল্গুনী নাটকে, অন্ধ বাউলের সঙ্গে নবযৌবনের দলবলের একটা সংলাপ চলছিল এইরকম:

কী হে ভাই, ঠিক নিয়ে যেতে পারবে তাে?
ঠিক নিয়ে যাব।
কেমন করে।
আমি-যে পায়ের শব্দ শুনতে পাই।
কান তাে আমাদেরও আছে, কিন্তু
আমি যে সব-দিয়ে শুনি শুধু কান দিয়ে না। 


এই সব দিয়ে শােনার জন্য কখনাে কখনাে প্রস্তুত হতে হয় আমাদের। সে যে কেবল শিল্পের আস্বাদনে তা নয়, সে যে কেবল প্রণয়ের মুহূর্তে তা নয়, সে আমাদের নিছক দৈনন্দিনেও, সে আমাদের সমাজনৈতিক চর্চাতেও। সংযােগের অভিপ্রায়ে তৈরি করে তােলা আমাদের সমস্ত ভাষারই মধ্যে আমরা তাই ছড়িয়ে রাখতে চাই একটা নীরবতার পরিসর, সমস্ত চিৎকারের বাইরে, সমস্ত আমিত্বের বাইরে। আর সেইভাবে, আমাদের যে-কোনাে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই, এই এক সব-দিয়ে শােনার জন্য নিজেকে উন্মুখ রাখতে চাই আমরা। তখন, শুধু বাণী নয়, আমাদের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় অন্য কোনাে স্পর্শের জন্য, বলতে ইচ্ছে হয়: হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো।

মাসদেড়েক আগে, বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের প্রযােজনায়, একটি অভিনয় চলছিল কার্জন পার্কে। পড়তি বিকেলে, খােলা জায়গায়, ছােটো একটি বৃত্ত তৈরি করে নিয়ে সেখানে রক্তকরবীর অভিনয় করছিলেন কয়েকজন মানুষ, কেউ যাঁরা চোখে দেখতে পান না। দর্শক ছিলেন অল্প কয়েকজন। পূর্ণ অন্ধদের সেই সুঠাম অভিনয়শেষে দর্শকেরা যখন উচ্ছাস জানাচ্ছেন, আশ্চর্য একটি দৃশ্যের জন্ম হলাে তখন। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে কুশীলবেরা সবাই তাদের খােলা দুহাত বাড়িয়ে রেখেছেন প্রার্থীর মতাে। কী চান তারা? কিছু কি চান? তাঁদের মধ্যে একজন বললেন: ‘আপনারা। সবাই এসেছেন, কিন্তু আমরা তাে দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা যদি আমাদের সকলের হাতের ওপর একটু হাত ছুঁয়ে যান, আপনাদের ভালােলাগাটা আমাদের মধ্যে পৌছবে, আমাদের ভালাে লাগবে।’ দর্শকেরা একে একে সকলের হাতে হাত রাখলেন, কারাে কারাে চোখে এল জল।

আমরা যখন সত্যিকারের সংযােগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতাে একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়। পারি না হয়তাে, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।

(১) এ-প্রসঙ্গে একটু সতর্কীকরণ দরকার। বিশ্ববিদিত যে-মনীষীদের নাম এ-উল্লেখের লক্ষ্য নয়। কিংবা, কথাটা এও নয় যে দুরূহতা মাত্রেই সন্দেহযােগ্য। বিষয়ের মাত্রা অনুযায়ী বােধ্যতার মাত্রা পালটায়, শ্রোতা বা পাঠকেরও নিজেকে কিছুটা তৈরি করে নেওয়া দরকার হয়। অন্যপক্ষে, এও বােঝা চাই যে সরলতা মাত্রেই তরলতা নয়।

প্রমথ চৌধুরীর একটি উক্তির আলোকে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করছি। "সাহিত্যের তত্ত্বজ্ঞানের সাহায্যে সাহিত্য রচনা করা যায় না। আগে আসে বস্তু, তার পরে তার তত্ত্ব। শেষটি না থাকলেও চলে, কিন্তু প্রথমটি না থাকলে সাহিত্যজগত শূন্য হয়ে যায়। সাহিত্যস্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির পালা শেষ করে অতীতকালে চলে গেছেন। এবার তত্ত্ববােদ্ধা তাঁর ব্যাখ্যা করে যাবেন অনন্তকাল"।

হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস 'নন্দিত নরকে’। আর সেই প্রথম উপন্যাসই তার পথ করে দিয়েছিলো। তাকে শক্তিমান কথাশিল্পী হিশেবে চিনতে পেরেছিলেন পাঠকসমাজ। সমালোচকেরাও আশান্বিত হওয়ার মতন লক্ষণাদি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর লেখায়। অনলসভাবে লিখে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ। হতাশ করেননি তাঁর পাঠক-পাঠিকাদের।

আমাদের মনে রাখতে হবে ‘সব লেখা সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ী আসন পায় না তবে, পাঠকের ভালো লাগাতে পারাটাও কম কৃতিত্বের ব্যাপার নয়’। গল্প বলার দক্ষতা ছিল তাঁর। এ দক্ষতার কারনে পাঠক-পাঠিকাদের জয় করে নিয়ে ছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। জনপ্রিয়তা তাকে ফুলটাইম লেখক হতে বাধ্য করেছিল। পাঠকই তাকে সাহসী করে তুলেছিল বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার চাকুরিতে ইস্তফা দিতে দ্বিধা হয়নি তার। আসলে লেখকের ধর্ম যে লেখা তা প্রমাণ করলেন এই বিরল পাঠকের দেশে হুমায়ূন আহমেদ।

আমাদের সাহিত্যে তাঁর বই বেস্টসেলারের মর্যাদা পেয়েছিল, ছিল কি এখনো আছে। সুতরাং তিনিই পাঠকের মনোরঞ্জনকারী উপন্যাসের সফল নির্মাতা ছিলেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে জনপ্রিয় উপন্যাসিক বিমল মিত্রের বক্তব্য, “স্বীকার করতেই হবে যে পাঠকের জন্যে সাহিত্য নয়, বরং সাহিত্যের জন্যেই পাঠক সুতরাং আজকালকার কোনও সৎ লেখকের পক্ষে পাঠকের সম-স্তরে নেমে আসবার কোনও প্রশ্নই আসে না।” এবং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের বক্তব্যটিও প্রণিধানযোগ্য। যেমন, উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু একটা ব্যক্তি-চরিত্র থাকে তো থাকুক- তার বৃত্তটা হবে সমাজব্যাপী। কিন্তু এর ফলে কি ব্যক্তির মূল্য অস্বীকৃত হবে? সে সম্ভাবনা নিশ্চয়ই নেই। আজ পৃথিবীর সঙ্গে ব্যক্তিত্বের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হচ্ছে - ব্যক্তির সীমানা বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। অর্থনীতি সমাজনীতির সঙ্গে মনের ভৌগোলিক পরিধি বেড়ে গেছে। সেই বৃহত্তর পটভূমিই তো আজকে ব্যক্তি-মানবের স্বাধিষ্ঠানক্ষেত্র। একক মানুষের কোনো সমস্যাকেই এই পটভূমি ছাড়া সমাধান করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শরীর, মন, মনুষ্যত্ব আর সংস্কৃতির যে কোনাে ক্ষুধাই আজ এই সামগ্রিক সমাধানে নিবৃত্তি লাভ করতে পারে।

হুমায়ূন আহমেদ অভিনিবিষ্ট পাঠক চরিত্রাবলী এবং কাহিনীর বিপুলতার মধ্যে এই সবের সন্ধান পাবেন আশা করি। সংসারের মধ্যে বেঁচে থেকে মনুষ্যত্বের বিকাশ সম্ভব, আনন্দ মরীচিকা মাত্র নয়। আনন্দ তার প্রবহমানতা নিয়ে সাহিত্যে সমুপস্থিত এরই সঙ্গে যুগলক্ষণে চিহ্নিত মনস্বিতা বিরাজমান। আমাদের সমস্ত সুখদুঃখ, আশানিরাশা রূপলাভ করে চলেছিল তার রচনায় চলচ্ছবি হয়ে।

হুমায়ূন আহমেদের মা আয়শা ফয়েজ তাঁর স্মৃতিচারণে বলেছেন এই কথাগুলো,

"পাঠকের অনেকেই হয়তো জানেন, হুমায়ূন আহমেদ ওর নিজের প্রথম লেখাটাকে নিজের লেখা বলে মানতেই নারাজ। চট্টগ্রামে থাকাকালে ওর স্কুল ম্যাগাজিনে ওর প্রথম যে লেখাটি ছাপা হয়েছিল, সেটি ওদের বাবা তিন দফা সংশোধন করে দিয়েছিল। তবে, ওই ঘটনার অনেক বছর পর ওর বাবা ছেলের প্রথম উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ে আবার নিজের লেখাই ছেলেকে দিয়েছিল সংশোধন করে দেওয়ার জন্য, ছেলে সেই লেখা কেটেকুটে এমন একটা জিনিস বানাল, যা আসলে ওর বাপের লেখার থেকে অনেক দূরে চলে গেল। ওই লেখাটা ছিল একটা নাটক, যার নাম ওর বাবা রেখেছিল ‘কত তারা আকাশে’। তখন আমরা পিরোজপুরে থাকি। ঢাকা বেতারের এক প্রডিউসারের বাড়ি ছিল পিরোজপুরে। প্রডিউসারের সাথে ওর বাবার আলাপ হয় এবং তিনি আশ্বস্ত করেন যে, ভালো নাটক লিখতে পারলে তিনি সেটা বেতারে প্রচারের ব্যবস্থা করবেন। তাই সে লিখে ফেলল ‘কত তারা আকাশে’। ‘শঙ্খনীল কারাগার’ পড়ে তার মনে হলো, ছেলে যদি নাটকটা পড়ে প্রয়োজনে সংশোধন করে দেয় তাহলে দুর্দান্ত একটা কাজ হবে। ছেলেও বাবার নাটক সংশোধনের সুযোগ পেয়ে এটাকে এমন কাটাকুটি করল যে, ওইটা আর ওর বাপের নাটক থাকেনি। ছেলের সংশোধিত ওই নাটক পড়ে ওর বাবা মহাখুশি, দারুণ হয়েছে। নাটকটা বেতারে জমা দেওয়া হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ সব শেষ করে দিল। ওই নাটক আর প্রচার হয়নি এবং আমাদের কাছে নাটকটার কোনো কপি নেই। ওদের বাবার একটা উপন্যাস আছে, বগুড়ায় থাকাকালে নিজের খরচে একটা উপন্যাস প্রকাশ করেছিল, উপন্যাসের নাম ‘দীপ নেভা যার ঘরে’। আমার মনে হয়, ছেলেরা চেষ্টা করলে ওই উপন্যাসটা প্রকাশের উদ্যোগ নিতে পারে।
হুমায়ূনের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এত কথা বলে ফেললাম। সবাই জানে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’। প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে, ‘নন্দিত নরকে’ ওর দ্বিতীয় উপন্যাস, যা প্রথমে প্রকাশিত হয়েছিল। ওর প্রথম উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’। ছুটিতে পিরোজপুরে এসে একটা নীল খাতায় উপন্যাসটা লিখেছিল হুমায়ূন। এখন সে তার বাবাকে উপন্যাসটা পড়াতে চায়। উপায় কী? ওর বাবার অফিস ছিল বাসারই একটি রুমে। হুমায়ূন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিটা গোপনে ওর বাবার ফাইলপত্রের ভেতরে রেখে এল। রশিদ নামের একজন পাংখাপুলার কাজ করত তখন। রশিদের ওপর দায়িত্ব দেওয়া হলো, ওর বাবা উপন্যাসটা পড়েছেন কি না সেটা জানানো। রশিদ জানাল, ওর বাবা হুমায়ূনের উপন্যাসটা পড়েছে। ছেলের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। কারণ, দুপুরে খেতে এসে ওর বাবা নীলখাতায় পাওয়া উপন্যাস নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। আমার এখনো ওই দৃশ্যটা মনে আছে, সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজ শেষ করে ওর বাবা আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, ‘আল্লাহপাক তোমার বড় ছেলেকে লেখক বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটি শেষ হয়ে গেলে হুমায়ূন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি ফেলে বাক্সভর্তি কেমিস্ট্রির বই নিয়ে ঢাকায় ফিরে গেল। অনেক পরে বই হিসেবে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকের মনে প্রবল আলোড়ন তৈরি করেছে। সরকারি উদ্যোগে সেই বই নিয়ে সিনেমা হয়েছে, সেই সিনেমা দেশের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে। এই সব কিছু আমার ঊনিশ বছরের ছেলেটা যেমন জানত না, তেমনি জানতাম না আমরাও।"

শুভ জন্মদিন হুমায়ূন আহমেদ, বাংলা ভাষার সাথে সাথে আপনার নাম ও অবদান থাকবে অম্লান।

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz