অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বঙ্কিমসাহিত্যের প্রতিক্রিয়া সমকাল ও উত্তরকাল বইটি চমৎকার একটি কাজ। নানান বই-পত্র, পত্রিকা থেকে তিনি দুষ্প্রাপ্য সব সমালোচনা সংগ্রহ করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আটলান্টায় বিশ্ব বাংলা সাহিত্য সমাবেশের আয়োজক উত্তর আমেরিকা বাংলা সাহিত্য পরিষদের কল্যাণে দেখা হয়েছিল অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে। বইটি খুলে ভূমিকা, নিবেদন পেরিয়ে সূচিপত্রে চোখ পড়লো যে লেখাটিতে সেটি হলো বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য: বাংলার মুসলমান সমাজের প্রতিক্রিয়া। কারন আমার নিজের একটি মত আছে, দেখার ইচ্ছে হলো যে অনিন্দিতাদির সাথে আমি কতটা একমত। তাঁর লেখার কিছু অংশে যাবার আগে আসুন দেখি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে কি বলেছেন। শ্রীচন্দ্র মজুমদারকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানাচ্ছেন, "বঙ্কিমবাবু ঊনবিংশ শতাব্দীর পােষ্যপুত্র আধুনিক বাঙালির কথা যেখানে বলেছেন সেখানে কৃতকার্য হয়েছেন, কিন্তু যেখানে পুরাতন বাঙালির কথা বলতে গিয়েছেন সেখানে তাঁকে অনেক বানাতে হয়েছে; চন্দ্রশেখর প্রতাপ প্রভৃতি কতকগুলি বড়াে বড়াে মানুষ এঁকেছেন (অর্থাৎ তারা সকল-দেশীয় সকল-জাতীয় লোকই হতে পারতেন), তাঁদের মধ্যে জাতি এবং দেশকালের বিশেষ চিহ্ন নেই। কিন্তু বাঙালি আঁকতে পারেন নি"। এবার আসুন অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত লেখাটি থেকে কিছু অংশ পড়ি;

বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য: বাংলার মুসলমান সমাজের প্রতিক্রিয়া (অংশবিশেষ)

বাংলা সাহিত্যজগতে (কথাসাহিত্যে) বঙ্কিমচন্দ্রের আবির্ভাবকালে বাঙালি মুসলমান সমাজ, বাংলাচর্চায় ছিলেন একেবারেই অনাগ্রহী। যে কারণে বাংলায় কে কি লিখছেন তা নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা ছিল না। বাংলাকে তারা মনে করতেন হিন্দুর ভাষা এবং সেই কারণে এই ভাষাচর্চায় তাদের কোন আগ্রহ ছিলনা। আরবী ফারসী এবং উর্দুর চর্চা করতেন তারা। বাংলা ভাষাচর্চায় তাদের অনাগ্রহের পেছনে আরও দুটি কারণ ছিল। প্রথমত বাংলা ভাষা শিক্ষার জন্য যে সব বই পড়ানো হত তার সঙ্গে মুসলমান সমাজের চেনা মহলের কোন মিল ছিলনা। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা চাইতেন না তাদের সন্তান সরস্বতীবন্দনা, শিবস্তোত্র পড়ুক—যা তাদের বিশ্বাসের পরিপন্থী। দ্বিতীয়ত—এই সময়ে মুসলমান সমাজের নেতা ও চিন্তাবিদরা মনে করতেন ভদ্র, শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত মুসলমানদের উর্দুচর্চা করা উচিত। নিম্নবর্গের লোক বাংলাচর্চা করবে, কিন্তু সে বাংলাও প্রচলিত বাংলা নয়, তাতে মেশানো থাকবে প্রচুর আরবী ফারসী শব্দ যার নাম মুসলমানি বাংলা। মুসলমানি বাংলায় লেখা বেশ কিছু বই-এর উল্লেখ লং সাহেব তার ক্যাটালগ (১৮৫৫)-এ করে গেছেন। এই সব কারণে সর্বজনবোধ্য বাংলা ভাষার চর্চা থেকে বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রায় সবাই দূরে থাকতেন। কিন্তু উনিশ শতকের সত্তরের বছরগুলির মাঝামাঝি সময় থেকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা চেতনায় পরিবর্তনের সূচনা হল। মীর মশাররফ হোসেন হুগলি কলেজের কিছু ছাত্রের সহযোগিতায় প্রকাশ করলেন আজীজন্‌নাহার (১৮৭৪) নামে একটি পত্রিকা। এই পত্রিকায় তিনি ঘোষণা করলেন যে, এই দেশ তাদের মাতৃভূমি এবং বাংলা ভাষা তাদের মাতৃভাষা। মুসলমান সম্পাদিত একটি পত্রিকায় এই ঘোষণা দেখে ভূদেব মুখোপাধ্যায় তাঁর কাগজে এক বিশাল সম্পাদকীয় লিখলেন ‘এদেশের মুসলমানরাও বাঙালি’ নামে। এই সময় থেকে শুরু হল বাঙালি মুসলমান সমাজের ঘরে ফেরার পালা। ইতিমধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের ৫/৬টি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে, কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে মুসলমান সমাজের তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া জানা যায় না। কিন্তু উনিশ শতকের সত্তর ও আশির বছরগুলি থেকে বাঙালি মুসলমানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে থাকল একের পর এক পত্রিকা।

যে সময়ে মুসলমান সমাজের একাংশ বাংলা ভাষা-সাহিত্যচর্চায় আগ্রহ বোধ করতে শুরু করছেন, ঠিক সেই সময়েই আমাদের দেশে জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার সূত্রপাত। সমকালের জাতীয়তাবাদী চিন্তাচেতনায় আচ্ছন্ন বাঙালি কবি, সাহিত্যিক, চিন্তাবিদদের অধিকাংশই এই সময়ে হিন্দু গৌরবের স্বপ্নে বিভোর। মুসলমান সমাজও যে তাদের প্রবল অস্তিত্ব নিয়ে পাশাপাশি বিরাজ করছেন এটা বুঝতে পারলেন না তাঁরা। ফলে বাংলার জাতীয়তাবাদের প্রথম পর্ব বিকশিত হল হিন্দুগৌরবের পথ ধরে। বাঙালি মুসলমান সমাজ ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন বাংলাভাষার চর্চা না করে তারা ভুল করেছেন ঠিকই, কিন্তু আরও বেশি ভুল করেছেন ইংরেজি ভাষাশিক্ষায় অবহেলা করে। ক্ষোভে, অভিমানে রাজত্ব হারানোর বেদনায় নতুন শাসকদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা এবং ইংরেজি ভাষাচর্চায় অবহেলা করার সুযোগ নিয়েছেন তাঁদের প্রতিবেশী হিন্দুরা। শিক্ষা দীক্ষা চাকরিবাকরি মান মর্যাদায় তারা মুসলমানদের চেয়ে অনেকটাই এগিয়ে গেছেন। নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্য সচেতন হয়ে বাঙালি মুসলমান সমাজ সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবি দাওয়া পেশ করতে শুরু করলেন। তাঁদের সন্তানদের পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে লাগলেন—শিক্ষা এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার দাবি করলেন। ১৮৮৫-তে যখন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হল তখন তারা একে ‘হিন্দু কংগ্রেস’ নামে অভিহিত করে তা থেকে দূরে সরে থাকলেন। সচেতন হয়ে ওঠার পর মুসলমান সমাজের চিন্তাশীল ব্যক্তিরা উভয় সম্প্রদায়ের বৈষম্যের দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। হিন্দুরা তাদের কতখানি অবজ্ঞা এমন কি ঘৃণার চোখে দেখেন তা তাদের নজরে পড়তে লাগল। এর এক সাংঘাতিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিল বাঙালি মুসলমান সমাজে। যত দিন যেতে লাগল অবস্থা হয়ে উঠতে লাগল তত জটিল। বিশ শতকের সূচনাকাল থেকে তা রীতিমতো বিস্ফোরক চেহারা নিল। মুসলমানদের স্বার্থ বিশেষভাবে দেখার জন্য প্রতিষ্ঠিত হল মুসলিম লিগ (১৯০৬)। সাহিত্যক্ষেত্রে বিভিন্ন হিন্দু ও ব্রাহ্ম লেখকের মুসলমান বিদ্বেষের প্রতিক্রিয়া শুরু হল, বিশেষ করে যেসব পত্রিকা ধর্মের প্রতি একটু বেশি আগ্রহী, তাতে তার প্রকাশ ঘটল অত্যন্ত উগ্রভাবে।

হিন্দু লেখকদের মুসলমান চরিত্রকে কালিমালিপ্ত করার বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশিত হতে শুরু করল উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে। বঙ্কিমচন্দ্র, নবীনচন্দ্র, রঙ্গলাল, হেমচন্দ্র, হারানচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রভৃতির রচনা থেকে বিভিন্ন অংশ তুলে দেখানো হতে লাগল তারা সচেতনভাবে কি পরিমাণ মুসলমান বিদ্বেষ প্রচার করেছেন। মুসলমান সমাজের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ যে মানুষটির বিরুদ্ধে প্রকাশ পেল তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।


বিস্তারিতঃ
বঙ্কিমসাহিত্যের প্রতিক্রিয়া
সমকাল ও উত্তরকাল
অনিন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায়
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz