তিমিরযাত্রা মোজাফ্‌ফরের স্বরগ্রামে প্রকাশিত তাঁর জীবনবোধ আর তাঁর স্বদেশ, সমাজ ও সমকাল চিন্তা।

Saturday, March 7, 2020



তিমিরযাত্রা পড়তে পড়তে রাগে গলা শুকিয়ে আসছিল, মুখের মধ্যে একধরনের তেঁতোভাব। একশ ১৪৫ পাতার উপন্যাসটি পড়তে পড়তে কয়েকবার নামিয়ে রাখতে হয়ছে। উপন্যাসটির লেখক মোজাফ্‌ফর হোসেন মনে হলো আমাদের সাহিত্যজগতে একটা গ্রেনেড ছুঁড়ে মারলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সমাজব্যবস্থার সবগুলো কালো অধ্যায়ে সার্চলাইটের আলো ফেলেছেন। মিশেল ফুকোর একটা কথা আছে, "[Book]...I would like them to self-destruct after use, like fireworks". তিমিরযাত্রা তেমনই একটা উপন্যাস যা পড়ে আপনার খুব রাগ হবে, মনে হবে আপনার বুকের মধ্যে যেকোন সময় গ্রেনেডটা ফেটে যাবে।

আমার মতো অনেকে হয়ত সিনেমা দেখার সময় মনে প্রাণে চান যে অমুক দৃশটা যেন না হয়, অনেকে আমরা চোখ ঢাকি, আবার দু-আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টাও করি যে আসলেই হলো কি না। তিমিরযাত্রা উপন্যাস পড়ার সময় আমি চিৎকার করে বলেছি মিলি যাসনে ওঘরে। সুরুজ সব ফুটোয় চোখ রাখতে নেই। সত্য সবসময় সুখকর নয়, তবু মোজাফ্‌ফর সার্জনদের মতো জোর করে সত্যটি আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছে। আমরা দেখতে-শুনতে না চাইলেও আমরা বাধ্য হই, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বা শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে আমাদের ভাবতে বাধ্য করবে যে এমন বাংলাদেশ কি আমরা চেয়েছিলাম?

আমার ইচ্ছে করছে সম্পূর্ণ উপন্যাসটির চ্যাপ্টার টু চ্যাপ্টার তুলে এনে আলোচনা করি কিন্তু তাতে পাঠক মূল গল্পটি উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হবেন। উপন্যাসটি শুরু হয়েছে একজন প্রবীণ বাবা অন্ধকারে সময় কাটান সেই দৃশ্য দিয়ে। বৃদ্ধ একজন মানুষ এক আধটু অন্ধকারে থাকতে চাইবেন সেটাই স্বাভাবিক, কিন্তু ঘরের বাল্বগুলো খুলে রেখে তিমির যাপন এটা অস্বাভাবিক। এটুকু পড়েই পাঠকের কৌতুহল জাগবে এবং পাঠক পাতা উল্টাতে বাধ্য। এই যে পাঠক হিসেবে আমাকে পাতা উল্টানোয় বাধ্য করা সেটি সকল লেখক পারেন না।

যৌনতা এই গল্পে এক নতুনভাবে আবর্তিত হয়েছে, এমনটা খুব চোখে পড়ে না। এই গল্পের যৌনতা অস্বস্তিদায়ক, কিন্তু নির্মম সত্য। মুক্তিযদ্ধের ইতিহাস থেকে অর্জিত নৈতিক চিন্তার নানা বিষয়ের সঙ্গে সমসাময়িক কালের স্বাস্থ্য, বিবাহ সম্পর্ক, সমকামিতা এসব বিষয়ের মধ্যদিয়ে মোজাফ্‌ফর একটি প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা চালিয়েছেন নানান চরিত্রের মাধ্যমে। আমাদের প্রজন্ম এসব বিষয়ে কি ভাবছে সেটা বোঝা যায় তিমিরযাত্রায়। আমাকে যদি কেউ বলে তিমিরযাত্রা কেমন উপন্যাস তাহলে বলবো যদি না পড়ে থাকেন তবে ঠকবেন। উপন্যাসের প্রথম ও শেষ অন্বিষ্ট নায়ক সুরুজ, তার জীবন। সেই সুরুজ আমি আপনি যে কেউ হতে পারে। তিমিরযাত্রা মোজাফ্‌ফরের স্বরগ্রামে প্রকাশিত তাঁর জীবনবোধ আর তাঁর স্বদেশ, সমাজ ও সমকাল চিন্তা।

আমি তিমিরযাত্রার সমালোচনা বা আলোচনায় বসিনি, আমি কোন আলোচক নই। ভাষা, বাক্যগঠন, উপন্যাসের ব্যাকরণ এসব নিয়ে আমি ভাবি নি। আমার ভাবনা গল্পে। গল্পটি আমার কেমন লেগেছে সেটিই বলার চেষ্টা করছি মাত্র। উপন্যাসটির কিছু ব্যাপার আমার ভালো লাগেনি, খটকা লেগেছে, বিরক্ত হয়েছি, এবার এমন কিছু কথা বলতে চাই।

উপন্যাসটিতে একজন ডাক্তার চরিত্র আছে, তাঁকে ডাক্তারের চাইতে দার্শনিক মনে হয়েছে বেশি, একজন হিজড়ে চরিত্র আছে তাঁর মনস্তাত্বিক ব্যাপারটা বিস্তারিত হয় নি। নায়ক সুরুজ একজন ঔপন্যাসিক। সে কানাডায় থাকে এবং মার্গারেট এটউডের প্রসঙ্গটি মনে হয়েছে সুরুজের না, মোজাফ্‌ফরের নিজের। দেশভাগ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, তার পরবর্তি রাজাকারদের উত্থান, অভিজিৎ রায়, ব্লগার হত্যা, বাউল, মাজার, কিছু মানুষের পাকিস্তান প্রেম, এমনকি মোদীও এসেছে। এই যে এত এত বিষয় এগুলো ডেভেলোপের জন্য লেখক সময় দেন নি। প্রথম উপন্যাস হিসেবে মোজাফ্‌ফরের এত তাড়াহুড়ো কেন?

আসলে এত কম পাতায় সেই সুযোগও নেই। আমার মনে হয় এত কিছু না আসলেও পারতো। চরিত্রগুলো ডেভেলপ করার সময়টুকু দেওয়া হয় নি। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র গুলো মনে হয়েছে চরিত্র নিজে নয় মোজাফফর কথা বলছে। কিছু প্যারাগ্রাফ পড়ে মনে হয়েছে প্রবন্ধ পড়ছি, উপন্যাস নয়। মোজাফফর কি ভেবেছে যে পাঠক হয়ত গল্পটির মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপারটি বুঝতে পারবে না। তাই কি এত ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ল। মোজাফফর পাঠককে ভাবতে দেয়নি সব খোলাসা করে দিয়েছে। এত ব্যাখ্যার প্রয়োজন ছিল না। পাঠককেও কিছু স্বাধীনতা দিতে হয়।

আমি মোজাফ্‌ফরের লেখা তাঁর লেখালেখির শুরু থেকেই পড়ছি, ভালোলাগে এবং সকলকে পড়তেও বলি। আমার বিশ্বাস মোজাফ্‌ফর এগুলোকে বর্ধনশীলভাবেই দেখবে। উপন্যাসের মূল সুরটি ছিল সেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা, একজন মুক্তিযোদ্ধা কেন যুদ্ধে গিয়েছিল? তার উত্তর নেই, এমন প্রশ্নের উত্তর থাকে না।
Share /

No comments

Post a Comment

About me

I am a big fan of Books and internet security. I am passionate about educating people to stay safe online and how to be a better book reader.
If you are interested then you can add me to your Social Media. You will also see the occasional post about a variety of subjects.

Contact

Name

Email *

Message *

Instagram

© Riton's Notes
riton.xyz